মুক্তিযুদ্ধের গল্প

Published: Wed, 29 Jul 2020 | Updated: Wed, 29 Jul 2020

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. আজিজুল হক 

আমি মো. আজিজুল হক সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের দহকুলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি ১৯৫৩ সালের ১০ অক্টোবর। আমার বাবা আজগর আলী ছিলেন একজন কৃষক এবং মা জমিলা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। আমরা দুই ভাই-বোনের মধ্যে আমি বড়। আমি ১৯৬৯ সালে মোহনপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে শাহজাদপুর কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার্থী ছিলাম ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চে ভাষণ দেন ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় জন্য প্রস্তুত থাকো’। 

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমি উদ্বুদ্ধ হই এবং তাঁর ডাকে সাড়া দেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। আমরা আমাদের দহকুলা গ্রামে একটা দল গঠন করি যুদ্ধে যেতে। সে দলে আমি ছাড়াও যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুল কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকি এবং নিজ গ্রামে প্রাথমিকভাবে ট্রেনিং নেই। আমাদের সে সময় প্রাথমিক ট্রেনিং দেন বেলাল দারোগা। সে ট্রেনিং শেষ করে আমরা ভারতে ট্রেনিং নিতে চলে যাই। 

সিরাজগঞ্জের রান্ধনীবাড়ী থেকে আমরা ভারতে যাবার জন্য নৌকায় উঠি। ১০০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা মানকাচর পৌঁছাই। আমাদের ভারত যেতে সময় লাগে দুই দিন। রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধার রিক্রুট ক্যাম্প ছিল। রৌমারী ছিল মুক্ত এলাকা। আমরা চলে যাই সেখানে। রৌমারী থানার কমান্ডার ছিল সিরাজগঞ্জ কলেজের ভিপি ইসমাইল হোসেন। সেখানেই আমরা অবস্থান করি। রৌমারীতে অবস্থান করার পরে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা ১৬০ জনের দল তুরা শহর থেকে বিমানযোগে দিল্লীতে চলে যেতে চাই। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওখানে ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়। পরে আমাদের আর যাওয়া হয় না। 

সেখানে স্থানীয় ভারত আর্মি ক্যাম্পে একদিন অবস্থান করি। সেখান থেকে আমাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মেঘলায় রিক্রুট ক্যাম্পে যেখানে কিছুদিন অবস্থান করে ট্রেনিং করতে থাকি। তারপর আমরা কার্তিক পাড়া অবস্থান করি। সেখান থেকে আমরা দেশের মধ্যে চলে আসি। তিন মাস বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং নেই আমরা। আমাদের শবে বরাত, রমজান, ঈদ সব ভারতেই কাটে। ঈদের পরে আমরা দেশের ভিতরে ঢুকি। 

আমাদের প্রথমে ময়মনসিংহ যেতে বলা হয়, কিন্তু অপরিচিত জায়গার জন্য আমরা সেখানে যেতে চাই না। অবশ্য আমাদের একটা দল ময়মনসিংহ যুদ্ধ করে। পরে আবার আমাদের সাথে যোগ দেয়। আমরা যখন দেশের ভিতরের রাস্তায় ডুকে পড়েছি, সে সময় লতিফ মির্জার নৌকার সাথে আমাদের দেখা হয়। তিনি নৌকার বহর নিয়ে ভারত যাচ্ছিলেন আর আমরা দেশের মধ্যে চলে আসছিলাম। তারপর আমরা নিজ গ্রামে চলে এসে ক্যাম্প স্থাপন করি রাজমানে। সে ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন আব্দুল ছামাদ। আর আমাদের ক্যাম্পে অন্যান্যরা যারা ছিলেন তারা হলেন তায়জাল হোসেন, ছরাফ আলী, আব্দুল রশিদ, শামসুল হক, আবুর কাশেম, মুজিবুল হক, মাজেদ আলী। আমরা ছোট ছোট অপারেশন করতে থাকি। 

উল্লাপাড়ার শ্রীফলগাঁতীতে রাজাকারের কমান্ডার ছিলেন মোসলেম উদ্দিন। তার পরিবারে ভাই, ভাতিজা, ছেলে ও ভাগ্নেসহ ২২ জন রাজাকার ছিলেন। আমরা মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি ঘেরাউ করি এবং তাকে আমরা ধরে নিয়ে আসি। সে সময় আমরা তার বাড়ি থেকে কিছু মালামালও নিয়ে আসি আমাদের ক্যাম্পের জন্য। যাতে খাওয়া-দাওয়াতে আমাদের কোনো সম্যসা না হয়। পরে তাকে মেরে ফেলা হয়। 

এরপরে আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী থানার একটি গ্রামে আরেক রাজাকারের তথ্য পাই। সাধারণ মানুষদের নানাভাবে অত্যাচার করতো তারা। যেদিন রাতে সেই রাজাকারের বাড়ির কাছাকাছি অবস্থান করি, সেদিন সাধারণ মানুষই আমাদের তার সন্ধান দেয়। কমান্ডারসহ আমি, তায়জাল মাষ্টার, শামসুল কয়েকজন মিলে রাজাকারটির বাড়ি ঘেরাউ করে আমরা তাকে হত্যা করি।

এদিকে উল্লাপাড়া থেকে মোহনপুর বাজারে কয়েকজন মিলিটারি প্রতিদিন রেললাইন দিয়ে হেঁটে আসতো। আমরা তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য শ্যামপুর ব্রিজে বাধা সৃষ্টি করি। ছোট একটা যুদ্ধ হয় সেখানে। তখন একজন মিলিটারিকে আমরা মারতে সক্ষম হই এবং তার চাইনিজ অস্ত্রটা আমরা নিয়ে আসি। অন্য মিলিটারিরা পালিয়ে চলে যায়।

রাজাকারদের দমন করার জন্য দহকুলা ব্রিজ অপারেশন করি আমরা। লতিফ মির্জার দলের সাথে পরিকল্পনা করে আমরা যুদ্ধ করি। আমরা থাকি দহকুলার হাটে আর মির্জার দল থাকে উত্তর দিকে। আমরা হাটের দিকের আগেই পজিশন করে থাকি। রাজাকাররা হাটের দিকে আমাদের দিকে আক্রমণ করে গুলি করে, কিন্তু আমরা গুলি করি না। আমরা চুপচাপ থাকি রাজাকাররা আমাদের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। আর আমাদের দিকে আসলেই আমরা রাজাকারদের ধরে ফেলি। ঘটনাস্থলে কয়েকজন রাজাকার মারাও যায়। আমরা তাদের অস্ত্র নিয়ে নেই। এভাবে চলতে থাকে আমাদের যুদ্ধ। আমি থ্রিনটথ্রি, মিলিটারিদের চাইনিজ রাইফেল, মার্ক-৪ দ্বারা যুদ্ধ করতাম।

যুদ্ধ শেষ হয়। স্বাধীন দেশে তার কয়েক দিন পরেই আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি।

(যুদ্ধ শেষে আজিজুল হক ফিরে যান কলেজে। ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে পাবনার ভাংগুড়া কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ডিগ্রিটা শেষ করা হয় না তাঁর। তারআগেই শিক্ষকতায় পেশায় যোগ দেন মোহনপুর হাইস্কুলে। ১৯৭৪ সালে মমতাজ বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে আব্দুল মালেক ও চার মেয়ে ফাতেমা, হালিমা, খাদিজা পারভীন, আরজিনা পারভীন। শিক্ষকতা থেকে তিনি ২০১৩ সালে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি তার জন্মস্থান দহগ্রামেই রয়েছেন। 

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Wed, 29 Jul 2020 | Updated: Wed, 29 Jul 2020

যুদ্ধকথা: মুক্তিযোদ্ধা মো. ময়দান আলী

আমি মো. ময়দান আলী। আমি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের চরমোহনপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করি ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল। আমার বাবা জয়নাল আবেদীন একজন কৃষক ছিলেন। মা সার্মত বানু ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাই-দুই বোনের মধ্যে আমি বড়। আমি মোহনপুর হাইস্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম ১৯৭১ সালে। পড়াশোনার সময়ই আমি যুদ্ধে যোগ দেই।

আমাদের দেশের মধ্যে পাকিস্তানি মিলিটারি বিভিন্নভাবে প্রবেশ করতে থাকে। আমাদের মোহনপুরও মিলিটারি আসতো। কারণ হলো আমাদের মোহনপুরে ট্রেনের যোগাযোগটা ভালো ছিল। পাক আর্মি মোহনপুর ইস্টিশনে নেমে মোহনপুরের আশেপাশের মানুষদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন করতো। হিন্দুদের ওপর বিশেষ করে বেশি অত্যাচার চালাতো। মুসলিমদেরও বাদ দিত না যারা জয় বাংলা বলতো। বাড়ি-ঘরও পুড়িয়ে দিত।

গ্রাম থেকে নারীদের ধরে নিয়ে এসে বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালাতো। একদিন যে নারীকে নির্যাতন করতো, অন্যদিন তাকে করতো না, নতুন এক নারীকে আবার নির্যাতন করতো। এভাবে মিলিটারিরা নির্যাতন করতেই থাকে মা বোনদের উপরে। মা-বোনদের ওপর নির্যাতন ও সাধারণ মানুষদের উপরেও নির্মম অত্যাচার দেখে আমরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি যে, আমাদের যুদ্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নাই। এদিকে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় জন্য প্রস্তুত থাকো।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে আমরা আরো উদ্বুদ্ধ হই। আমরা যুদ্ধতে যোগ দিতে চলে যাই সিরাজঞ্জের ব্রক্ষগাছাতে। সেখানে গিয়ে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যোগ দেই। যুদ্ধতে যারা যোগ দেই তারা সবাই প্রায়ই ছাত্র ছিলাম। ছাত্ররাতো অস্ত্র চালাতে জানতো না। কিন্তু এই দিকে মিলিটারিরা পাবনা দখল করে সিরাজঞ্জের দিকে গাড়ি নিয়ে আক্রমণ করতে আসতে থাকে। এতে সিরাজগঞ্জ মহকুমার জেলা প্রশাসক এই অবস্থা দেখে অস্ত্রগার খুলে দেয় এবং সিরাজগঞ্জের কলেজের ছাত্রদের যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। 

অস্ত্রগার থেকে মহিষের গাড়ির মাধ্যমে অস্ত্রগুলো সোজা নিয়ে আসা হয় কালিয়াহরিপুরের একটি বাগানে। আমাদের অস্ত্র সরবরাহ হয়ে যায়। একটি গ্রুপের মাধ্যমে দরকার এখন ট্রেনিং। তারপর পলাশডাঙ্গা যুব শিবির নামে একটি গ্রুপ করার হয়। এই গ্রুপের পরিচালক ছিলেন আব্দুল লতিফ মির্জা আর কমান্ডার ছিলেন আব্দুল সালাম। আমরা ধীরে ধীরে ট্রেনিং নিতে থাকি। ট্রেনিং শেষ করে একটা সময় আমরা পাকা শিকারি হয়ে যাই। 

প্রশিক্ষণ শেষ করে আমরা চলনবিল এলাকায় অবস্থান করি। সেই সময় আমাদের ১১টা নৌকা ছিল। আমরা ধীরে ধীরে ছোট ছোট অপারেশন চালাতে থাকি আর আমরা অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকি। আমাদের এইভাবে গ্রুপটা বড় হতে থাকে। আমরা প্লাটিনা থেকে কোম্পানি, কোম্পানি থেকে ব্যাটালিয়ান কোম্পানি হয়ে যাই। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোরে আব্দুল লতিফ মির্জার পরিচালনায় পলাশডাঙ্গা যুব শিবির বিশাল একটি গ্রুপ হয়ে যায়। আমরা প্রতাপ থেকে চলনবিলের মাঝে যাবো, এতে আমরা নৌকায় রওনা হই সেখানে যাবার জন্য। আমাদের একটাই পথ ছিল নওগাঁ দিয়ে যাওয়ার, তা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। কারণ হল আমাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে ফিলছে মিলিটারিরা। 

চলনবিলে যেতেই নৌকা ভিড়াই আমরা নওগাঁর হাটখোলায়। সেদিন ছিল ১০ নভেম্বর। আমরা জানতাম না যে, নওগাঁতে মিলিটারি আছে। আমাদের বড় একটি যুদ্ধ হয় মাজার নওগাঁতে। আমাদের গ্রুপে একটা ইমাম ছিল আমাদের কেউ মারা গেলে তাঁকে জানাজা করানোর জন্য। ইমাম সাহেব ফজরের নামাজ পড়ার জন্য নওগাঁ মাজার মসজিদে যান আজানের বেশ কিছু সময় আগেই। মাজারের ভেতরে প্রবেশ করতেই মিলিটারিরা হলফ করে। 

মিলিটারিরা বলে, ‘বল তুই কে হে?’ ইমাম বলেন, ‘আমি ইমাম হে।’ ইমামের উপস্থিত বুদ্ধিও ছিল বটে। ইমাম বলেন, ‘এই মসজিদে আমি আজান দেই। আমি আজান দিবো, তাই চলে আইছি আজানের আগেই। আরো আগে আসি আমি মসজিদে।’ ‘ঠিক হে, ঠিক হে, ইমাম সাহেব।’ ইমাম চলে যান মসজিদে। ইমাম সাহেব চিন্তা করেন যে, ‘আল্লাহ, এখান থেকে বের হই কি করে। না বেরিয়ে তো উপায় নেই। না বের হলে আমাদের লোকজন জানবে না তো মিলিটারি আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলছে। সকালবেলা গিয়ে ফায়ার করে আমাদের শেষ করে ফেলবে।’

তখন ইমাম চিন্তা করে বুদ্ধি বের করেন, বদনা নিয়ে বের হয়ে বাইরে চলে আসতে থাকে। সেই সময় মিলিটারিরা বলেন, হে ইমাম, তুই একবার যাতে গা, আবার আসতে হে, তোর মতলফ কী হে?’ তিনি বলেন, ‘না,  হুজুর পায়খানা-প্রস্রাব করবো। মাজার শরীফে পায়খানা-প্রস্রাব করতে নেই্। তাই বাইরে গিয়ে পায়খানাপ্রস্রাব করবো।’ তারপরে মিলিটারিরা বলে, ‘ঠিক হে, তারাতারি যা।’ ওখান থেকে বের হয়েই দৌড় দিয়ে এসে চিৎকার দিয়ে উঠে ইমাম। তখনও আজান দেয়নি, হয়তো তিন চার মিনিট বাকি আছে। সেই সময় আমরা সবাই জানতে পারলাম যে, চতুর্দিক থেকেই আমাদের ঘিরে ফেলছে মিলিটারি। এখন আমাদের যুদ্ধ ছাড়া কোন উপায় নাই। তাই যুদ্ধ আমাদের এখানেই করতে হবে। জানার সাথে সাথে আমরা গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে কোদাল নিয়ে বাংকার করে ফেলি। ১১ নভেম্বর ফজরের আজানের পরে যুদ্ধ শুরু হয় । 

মিলিটারিরাই  প্রথম ফায়ার করে। তারপর আমরা গুলি করতে থাকি। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে ফায়ার করতে থাকি। কারণ আমাদের গুলির সংখ্যা কম ছিল, যা ছিল তাই নিয়ে আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। তা আমাদের আগেই বলা হয়েছে। সকাল ১০টার পরে আমরা তুমুল আকারে ফায়ার করবো। যাতে করে এর মধ্যে পাকিস্তানি মিলিটারিদের গুলির সংখ্যা কমে যায়। মিলিটারিদের গুলি কমে যাওয়ার পরে আমাদের শুরু হবে ফায়ার। 

মাঝে মাঝে গ্রেনেড চার্চ করি যাতে করে মিলিটারিরা এগিয়ে আসতে না পারে। সকাল ১০টা বাজার সাথে সাথে অর্ডার এসে যায়। ব্যাটলিয়ান কমান্ডার অরুন বাবু বাঁশি দেয়ার সাথে সাথে আমাদের এসেলার গ্রুপের সাইট থেকে ফায়ার শুরু হয়ে যায়, সবাই তুমুল আকারে যুদ্ধ করতে থাকি। দুপুর পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। ১২টা কি ১টার সময় আমরা জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে উঠি। আর  চারদিক থেকে আমরা মিলিটারিদেরকে ধরতে থাকি আর মারতে থাকি। এদিকে গ্রামের লোকজনও এগিয়ে আসে জয় বাংলা বলার পরেই। মিলিটারি পালাতে থাকলে গ্রামের লোকজনও দৌড়ায়ে গিয়ে ধরতে থাকে আর মারতে থাকে। গ্রামের লোকজন প্রায় ৭-৮ জন মিলিটারিকে মেরে ফেলে। এই যুদ্ধে অনেক মিলিটারি মারা যায়। আমাদের কেউ মারা যায় না আল্লাহ রহমতে। কিন্তু হাতে-পায়ে গুলিবদ্ধ  হয়ে আহত হন অনেকেই। আমরা দু’জন মিলিটারি অফিসারকে জীবিত ধরি। কিন্তু তাদেরকে ধরে আমরা আরেক ঝামেলায় পড়ি।

আমাদের জেলহাজত নাই, ওদের রাখবো কোথায়। পরে নৌকার ডয়রায় রাখি। কিন্তু ওদের নিয়ে খুব ভয় লাগে। ওরা অফিসার মানুষ সব কিছু জানে। বিশাল বিশাল লম্বা মানুষ, তাদের নিয়ে কি আর শুয়ে থাকা যায়। পরে উপর মহলে জানানো হলো। আমরা জীবত দু’জন মিলিটারি অফিসারকেকে ধরেছি। এদের কী করবো, পরে আমাদের কাছেই রাখতে বলা হয়। কিন্তু কেউই রাখতে চায় না। সবাই বলে রাখার উপায় নেই।  

এই রকম চলতে থাকে। পরে উপর মহলকে বললাম, এদেরকে রেখে আমরা কী করবো। আমাদের অর্ডার দেন না কেন, মেরে ফেলি। পরে আমাদের অর্ডার দেওয়া হয় মারার জন্য। আমরা শীতলাই রাজবাড়ী নিয়ে গিয়ে কানের কাছে রাইফেল ঠ্যাকায়ে গুলি করে মেরে ফেলি। 

নওগাঁতে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি ওয়ার্লেসের মাধ্যমে উপর মহল পাক আর্মিদের সাথে যোগাযোগ করে ছিল। তারা বলেন, আমাদের মুক্তিবাহিনী ঘিরে ফেলছে নওগাঁতে তারাতারি সৈন্য দরকার। কিছু সৈন্য ঠিক বিমানের মাধ্যমে তারাতারি চলে আসে। তা মাজার নওগাঁতে না এসে জেলা নওগাঁতে চলে যায়। ওদের ভুলের জন্য আমাদের যুদ্ধটা সহজ হয়েছিল। এদিকে নওগাঁর যুদ্ধের সময় আমাদের পলাশডাঙ্গা যুব শিবির গ্রুপের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়। আমাদের চারদিকে মিলিটারিরা ঘিরেও ফেলছে। কী করা যায়! পরে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে লতিফ মির্জা আমাদের কিছুদিন আড়াল হয়ে থাকতে বলেন। 

তিনি আরো বলেন, গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে আমরা সবাই আবার দলবদ্ধ হবো। তারপর আমরা কিছু দিনের জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। লতিফ মির্জার সাথে অনেকে ভারতে চলে যায়। আর কিছু থেকে যায়। এরপরে আমরা কয়েকজন মিলে আরেকটি গ্রুপ করে ফেলি। আমাদের গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন আব্দুল হামিদ (বড়)। আমরা উধুনিয়া গিয়ে ক্যাম্প করি। ক্যাম্পে আমরা দিনে থাকি কিন্তু রাতে থাকি না । কারণ যেকোন সময় মিলিটারিরা আমাদের হামলা করতে পারে। 

আমরা ছোট ছোট অপারেশন চালিয়ে যেতে থাকি। দহকুলা ব্রিজ, দিলপয়সা ব্রিজ, কৈডাঙ্গাব্রিজ এই রকম বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন করে বিভিন্ন জায়গা দখল করতে থাকি। আমরা মোহনপুর দখল করি। তারপর উল্লাপাড়া, সর্বশেষ সিরাজগঞ্জও আমরা দখল করে ফেলি। এইভাবেই আমাদের দেশ শত্রু মুক্ত হতে থাকে। আমি যুদ্ধের সময় থ্রিনটথ্রি অস্ত্র ব্যবহার করি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমরা সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমস্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. এ. মনসুর আলীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি।

(যুদ্ধ শেষে ময়দান আলী ফিরে যান স্কুলে। ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করেন। তারপর শেফালী খাতুনকে বিয়ে করেন। পুত্র : সোহেল রানা, রুবেল হোসেন ও কন্যা : মুর্শিদা খাতুন ও খুশি পারভীন। তাঁর বর্তমান পেশা ব্যবসা। বর্তমান ঠিকানা চরমোহনপুর, উপজেলা : উল্লাপাড়া, জেলা : সিরাজগঞ্জ।

অনুলিখন : ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ

Published: Mon, 27 Jul 2020 | Updated: Mon, 27 Jul 2020

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমির হোসেন মিয়া’র যুদ্ধস্মৃতি

“৭- মার্চ যখন ভাষণ হয়, তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। আমাদের পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হলো। পরীক্ষা দেবো। এর ভেতরে - মার্চের যে ভাষণ, রেসকোর্স ময়দানে গেলাম। সেখানে দেখলাম, যখন ভাষণ হচ্ছিল সেখানে ওপর দিয়ে কয়েকটা প্লেস উড়ে গেলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনলাম। এবং তখন অতটুকু বোধবুদ্ধি ছিল না, বঙ্গবন্ধু কি বললো। তবে মনের ভেতর সেই কথাগুলো আমার আটকানো ছিল, আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়া মাঠে নেমে পড়ো।”

Published: Sun, 26 Jul 2020 | Updated: Sun, 26 Jul 2020

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুর রহমান আবু’র যুদ্ধস্মৃতি

আমি তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল স্কুলের ছাত্র। পাশে আমাদের সরকারি বিজ্ঞান স্কুল এন্ড কলেজ। ওখানে একটা পুকুর আছে। ওইখানে আমরা গোসল করি। গোসল করি, মাঠ আছে, খেলাধুলা করি। পাশেই আবার স্টেশন, তেজগাঁও স্টেশন। তো, তেজগাঁও স্টেশনটা বিহারী অধ্যুষিত। 

Published: Wed, 15 Jul 2020 | Updated: Wed, 15 Jul 2020

যুদ্ধকথা : উল্লাপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আ. হামিদ

আমি মো. আব্দুল হামিদ, জন্ম ১৯৫২ সালের জুন মাসের ১ তারিখে। পিতার নাম: মৃত জেনাত আলী, মাতার নাম: টুলু বেগম, গ্রাম: চরমোহনপুর, ইউনিয়ন: মোহনপুর, উপজেলা: উল্লাপাড়া, জেলা: সিরাজগঞ্জ। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। দুই ভাই তিন বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। 

আমি এসএসসি পাশ করি মোহনপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৬৯ সালে। সে বছরই ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে। আমি যে সময় সিরাজগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করি। সে সময় আমি ছাত্রলীগের সাথে সংযুক্ত ছিলাম। তখন  লতিফ মির্জা সে সময় সিরাজগঞ্জ কলেজে লেখাপড়া করতেন। তখন লতিফ মির্জা সাথে আমাদের যোগাযোগ হতেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন সিরাজগঞ্জ আসেন এবং মিটিং করেন। মিটিং করার পরে আমরা সবাই  উদ্বুদ্ধ হলাম। সে সময় ভাবলাম যে আমাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া এই দেশকে স্বাধীন করা যাবে না। তখন আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়। আলোচনার এক পর্যায়, তখন সে সময় নির্বাচন শুরু হয়ে যায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পরেও পাকিস্তানের সরকার নানা অছিলায় ক্ষমতা দেয় না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণে পড়ে আমরা সবাই আবার উদ্বুদ্ধ হই এবং আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই। কিন্তু যুদ্ধের জন্য তো দরকার ভাল ট্রেনিং। তাই ভাবলাম আামাদের ভারতে যেতে হবে। ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিতে হবে।

লতিফ মির্জার নেতৃত্বে আমরা বারবার বৈঠক করি, বিমল কুমার দাস, সোহরাব আলী, আব্দুুল হাইসহ আর অনেকে সাথে। তাদের সাথে আলোচনা করার পরে। আমি বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে এসে আমি মোহনপুর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষদের নিয়ে একটি সংগঠন করি, যে কিভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। ভারতে যেতে হবে এবং কি ভাবে ট্রেনিং গ্রহণ করা যায়। অনেকে গেল আমাদের সাথে আবার অনেকে গেল না। আমার সাথে গেল যারা তারা হল- কামারখন্দের হামিদ, চাকসার লতিফ, আব্দুল রাজ্জাক, নান্নুসহ বেশ কয়জন। অনেকে আবার নানা কারণ দেখিয়ে গেল না। আমরা ভারতে যেতে বের হই, মোহনপুর থেকে প্রথমে আমরা চাটমোহর যাই। সেখানে গিয়ে আমরা অনেককেই পাই। প্রায় আমরা ৩৫ জনের মত হলাম। আমাদের ভারতে যাওয়ার গাইডার ছিল মোজ্জামল সমাজীর ভাই। তার পরে আমরা পায়ে হেটে পদ্মা নদী পার হয়ে আমরা ওপার চলে যাই। ওপার কেচুডাঙ্গা একটা জায়গা আছে। ওখানে ইয়ুথ ক্যাম্প ছিল। ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্ব ছিলেন  গোলাম হাসনায়েন নান্নু এমপি। পরিচালনা করতেন পাবনার লালু ভাই। এখান থেকে আমি যাই উচ্চতর ট্রেনিং নিতে পানিঘাটা-শিলিগুড়ি, দার্জিলিং যাই। সেখান থেকে ট্রেনিং নিলাম গেরিলার, কিন্তু আমাদের বর্ডারে দিলেন।্ সে সময় আমাদের উল্লাপাড়া উপজেলার ১৪ জন এক গ্রুপ হয়ে গেলাম। আমি সেই গ্রুপের সহকারী কমান্ডার ছিলাম। আর হামিদ ছিল কমান্ডার। আমাদের সাথে ছিলেন যারা, আব্দুল হামিদ, শফিকুল ইসলাম শফি, আব্দুল লতিফ বকুল, রুহুল আমিন খসরু, মোজাহার আলী, আব্দুল আজিজ, আব্দুল লতিফ, আব্দুল র্জ্জাাক নান্নু, আফছার আলম, আব্দুল মান্নান, মঞ্জুরে খোদা কুন্নু, নারায়ণ চন্দ্র।

ভোলাহাট থানা থেকে যুদ্ধ করতে আসতে থাকি আমরা। আমাদের আাসা দেখে রহমপুর চলে আসে মিলিটারি। আর আমরা চলে যাই গোমস্তাপুর থানা বাজারে আলীনগর হাইস্কুলে সেটা আমাদের ছিল শেষ ক্যাম্প, পুরা বর্ডার ছিল মুক্তিবাহিনী দিয়ে ঘেরা এবং প্রতিদিন যুদ্ধ হত, একদিন আমরা আরেক দিন ওরা। দেশে ভিতরে আসার আগে তিন মাস যুদ্ধ করি রংপুরের বর্ডারে। তার পরে আমাদের দেশে পাঠানো হয়। মানকাচর হয়ে হয়ে আসি। এই দিকে আরেক হামিদের সাথে দেখা যমুনা নদীতে সে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়ত সেই হিসাবে পরিচিতি। যমুনার নদীতে দুই- তিনদিন থাকি। তার পরে হামিদ ভাইকে বললাম ভাই আমরা আর থাকবো না। কারণ হলো আমি খোঁজ পেলাম যে, আমার পরিবার ও প্রতিবেশীদের মোট ঊনিশ জন তার মধ্যে একজন হিন্দু ছিলেন তাদেরকে মিলিটারি পাকশী ধরে নিয়ে গেছে, তাই আর থাকবো না। কিন্তু এই দিকে মোহনপুর দুই জন বিহারী ছিলেন তারা কিভাবে যেন তাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। তারপরে আমরা মোহনপুর এসেছে পৌঁছাই। তারপরে আমরা পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যোগ দেয়ার জন্য উধুনিয়া গিয়ে লতিফ মির্জার নৌকা খুঁজতে থাকি ৭-৮ দিন যাবত।

লতিফ মির্জাকে পেলাম আমরা মাজার নওগাঁতে, পহেলা অক্টোবরে। পরে আমরা পলাশডাঙ্গা যুব শিবির যোগ দেই। আামাকে সেকশন কমান্ডার পদে নিযুক্ত করেন। ১১ নভেম্বর নওগাঁতে বিশাল একটা যুদ্ধ হয়। নওগাঁতে যখন যুদ্ধ শুরু হয় সে সময়ের আগে লতিফ মির্জা বলেন যে, যত সম্ভব মাজারে মিলিটারি ঢুকছে। মির্জা বললেন, ‘আমি একটু একটু সংবাদ পেয়েছি। মিলিটারি নাকি মাজারেই আছে। আপনারা কেউ যান একটু দেখে আসেন।’ তখন সেই সময় আমিসহ আব্দুল হামিদ, আজিজ, মাখন ভাই, আব্দুল আজিজ, আমরা ৪ জন চারদিকে দেখতে থাকি। দেখতে দেখতে দেখি মিলিটারি। তখন আমরা চিন্তা করতে থাকি- যদি আামরা ফায়ার না করি, ওরা যদি সামনে গিয়ে দেখে মুক্তিবাহিনী প্যারেড করতেছে- নৌকাতে গিয়ে যদি বলে ‘হ্যান্ডসআপ’, এদিকে চারদিকে পানি। এতে তো কোন উপায় থাকবে না। আর মির্জা সাহেব তো আগেই একটু শুনেছে। তখন আমরা আর কিছু না ভেবে  সরাসরি ফায়ার করি। ফায়ার ওপেন হওয়াতেই তুমুল আকারে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে  লতিফ মির্জার সাথে সকলে যুদ্ধতে যোগ দেয়। সেই যুদ্ধে মিলিটারিরা ২০০-২৫০ জন মারা যায়। কিন্তুু আমাদের সহযোদ্ধারা কেউ মারা যায় না, তবে আহত হয়ে ছলো অনেকে। আমরা স্টেনগান, এসএললার, এলএমজি, থ্রিনটথ্রি রাইফেল ব্যবহার করি যুদ্ধের সময়। নওগাঁতে যুদ্ধ শেষ করে নৌকার মাধ্যমে আমরা সবাই শীতলাই চলে যাই। 
লতিফ মির্জা বললো যে, ‘আমাদের তো চারদিক থেকে মিলিটারিরা তো ঘিরে ফেলতেছে। যুদ্ধ করে তো অস্ত্র, গোলাবারুদের সংখ্যা কমে গেছে। তাই যার যার মত কিছু দিন আত্মগোপন করেন তারপরে আবার অস্ত্র, গোলাবারুদ সংগ্রহ করে আবার একটা গ্রুপ সৃষ্টি করা হবে।’

তার পরে লতিফ মির্জা তার দল বল নিয়ে ভারতে চলে যান। যেহেতু আমাদের গ্রুপ ভারত থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত এই ক্ষেত্রে আমরা উধুনিয়া এসেছে ক্যাম্প করি। এদিকে আমাদের গ্রুপে লতিফ মির্জা দলের কিছু চলে আসে আবার আমাদের গ্রুপের কিছু লতিফ মির্জা সাথে চলে যায়। আমরা উধুনিয়া থেকে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করতে থাকি, দেশ স¦াধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত। আমরা ৭-১০ দিন পর পর দুই তিন জন গ্রামে গ্রামে গিয়ে আমাদের জন্য জমা রাখা মুষ্টি চাল তুলে নিয়ে আসতাম । এই ভাবে  চাউল তুলে আমরা খেতাম। 

আমাদের উধুনিয়া থেকে আমরা হান্ডিয়াল একটা অপারেশন করি। দিলপাশার ব্রিজ, বংকিরাট ব্রিজ, দহকুলার ব্রিজে রাজাকার পাহাড়া দিত। আর গ্রামে গ্রামে গিয়ে লুটপাটসহ অত্যাচার করতো। দিলপাশার ব্রিজ, বংকিরাট ব্রিজ রাজাকারদের রাতে অপারেশন চালিয়ে ধরে ফেলি। তারপরে বাদ থাকে দহকুলার ব্রিজ। আমাদের দেশকে তো স্বাধীন করতেই হবে। সব চেয়ে বড় শত্রু রাজাকার তাই তাদের আগে শেষ করতে হবে। তখন লতিফ মির্জা তো ভারতে চলে গেছে। সেই সময় সাধারণ মানুষেরা বলতো,  ‘মুক্তিযোদ্ধা ভাগ গিয়া।’ লতিফ মির্জা নাই তাই মুক্তিযোদ্ধা নাই- সাধারণ মানুষ এমন ভাবতো। এই রকম পরিবেশ দেখে শফি, হামিদ আমি মানে  গ্রুপের সবাই আলোচনা করি। সাধারণ মানুষদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাস গড়ে তুলতে হবে। তাই দহকুলা ব্রিজের রাজাকারদের রাতে ধরা হবে না, তাদেরকে দিনে ধরতে হবে এবং হাটের দিন। যাতে মানুষ বুঝতে পারে মুক্তিযোদ্ধারা আছে। উধুনিয়া ক্যাম্পে বসে এই পরিকল্পনা করি। বুধবার বিকাল ২টায় আক্রমণ করবো। আজাদের নেতৃত্ব আমরা অপারেশন চালাই। 

এক গ্রুপ আসবে বংকিরাট হয়ে, আরেক গ্রুপ আসবে উত্তর দিক থেকে, আরেকটা গ্রুপ বুনাইনগর ফরিদপুর থেকে আসবে দহকুলা গ্রাম হয়ে, আর আমরা নেতৃত¦ দিবো মোহনপুর দিক থেকে। চারদিকে ঘিরে ফেলবো আর রেললাইনটা ফাঁকা রাখবো। ওরা যেন দৌড়াতে পারে। যেহেতু আমি মোহনপুর এলাকার ছেলে, আমি আগে থেকেই জনগণকে বলে রাখি- যেন রাজাকাদের তারা ধরে ফেলে। রাজাকারদের জনগণ ধরবে এবং কোন সমস্যা হবে না। আমরা তো আসি এ কথাও বলি। এই প্ল্যান মত আসলাম এবং তিন দিক থেকে আমরা আট্যাক করি রাজাকারদের। এই দিকে তো খোলা রাখলাম রেললাইন। দহকুলা ও মোহনপুরের সাধারণ মানুষদের সহযোগিতায় তারা ১৪ জন রাজাকাদের ধরে এবং মার দিয়ে আমাদের হাতে তুলে দেয়। সাধারণ মানুষ মনে করতো- দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। দহকুলার হাটের সাধারণ মানুষের আনন্দিত ও উৎফুল্ল  হলো । আসলে সব জায়গাতেই ভাল-মন্দ মানুষ আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ চেয়েছিলো দেশটা স্বাধীন হক। কিন্তু আমাদের এর মধ্যে যারা উচ্চবিলাসী তারা পাকিস্তানিদের পক্ষ নিত বা স্বার্থ দেখতো। আমরা রাজাকারদের ধরে নিয়ে আমরা উধুনিয়াতে যাই। তার দুই দিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। তারপরে আমরা জেলা-মহকুমার কাছে অস্ত্র জমা দেই। অনেকে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে।
অনেকে আবার অস্ত্র ঢাকা জমা দেয়। কিন্তু সবাই অস্ত্র জমা দিলেও আমি অনেক পরে দেই। কারণ হলো আমার সুরক্ষার জন্য। পরে অবশ্য জেলা-মহকুমার কাছেই আমার অস্ত্র স্টেনগান জমা দেই।

[মুক্তিযুদ্ধ শেষে পড়াশোনায় ফিরে যান মো. আ. হামিদ। ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। তারপরে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। কিন্তু সংসারে অবস্থা ভাল না থাকায় তার আর পড়াশোনা করা হয়ে উঠেনি। ফরিদা চৌধুরীকে বিয়ে করেন ১৯৭২ সালে। প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন মাসুদা খাতুনকে। চার সন্তানদের জনক এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সন্তানেরা হলেন- ফয়জুল আরাফাত, ফারুক ইয়াসির, ফিরোজ, ফেরদৌস ও ফরিদা পারভীন। পেশা- ব্যবসা ও রাজনীতি। দীর্ঘদিন যাবত তিনি উল্লাপাড়া উপজেলার আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক কমান্ডার এবং  মোহনপুর ইউনিয়ানের আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। বর্তমান ঠিকানা- লাহিড়ীপাড়া, মোহনপুর, উপজেলা: উল্লাপাড়া, জেলা: সিরাজগঞ্জ।- অনুলেখক]
 

অনুলিখন : ইমরান হোসাইন

ও/এসএ/

Published: Mon, 13 Jul 2020 | Updated: Mon, 13 Jul 2020

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা একেএম হেদায়েতুল আলম

মুক্তিযুদ্ধের আগে পরিবারের একজন যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন ‘আগের হাল যেদিকে যায়, পরের হালও সেদিকে হাঁটে’ গ্রাম বাংলার এ প্রবাদ অনুযায়ী পরিবারের অন্যরা এমনকি গোষ্ঠীর সদস্যরাও সে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তো। আমিও তেমনি এক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া পরিবারের সন্তান। এমন পরিবারে জন্ম নিয়ে এবং আমাদের একই পরিবারের তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পেরে আমি গর্বিত। 

আমি একেএম হেদায়েতুল আলম, জন্ম: ১৯৫০ সালের ১৩ মার্চ। পিতার নাম: কাজী ইসমাইল হোসেন, বিবাহ রেজিষ্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাতা: সালেহা বেগম গৃহিনী। গ্রাম: তেলকুপি, ইউনিয়ন: বহুলী, সদর থানা, মহুকুমা: সিরাজগঞ্জ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। ১৯৬৫ সালে আমি ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি এবং সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই। তারও আগে আমার বড় ভাই মোঃ আলাউদ্দিন শেখ সিরাজগঞ্জ বিএ কলেজে ভর্তি হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে যুক্ত হয়ে পড়েন। ফলে আমাদের পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ে ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে। 

বড় ভাই আলাউদ্দিন শেখ এক সময় সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে বিএ পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি যখন ছুটিতে এলাকায় আসতেন তখন নিয়মিত এলাকর বিভিন্ন কর্মসূচিতে এলাকা থেকে লোকজন নিয়ে যেতেন। তার অনুপস্থিতিতে আমাদের দুই ভাইকে এ সংগঠনিক কাজটি করতে হতো। এ জন্য আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী, শহীদুল ইসলাম তালুকদারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। যোগাযোগ রাখতে হতো তৎকালীন ছাত্রনেতা আমির হোসেন ভুলু, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, ইসমাইল হোসেন [দোয়াতবাড়ি], আব্দুল লতিফ মির্জা, এমএ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, গোলাম কিবরিয়া, ইসহাক আলী, আজিুজুল হক বকুল, আমির হোসেন খান, সোহরাব আলী সরকার প্রমুখ ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে। 

উনসত্তুরের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে কোনঠাঁসা হয়ে পড়ে পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লিগ, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব বাড়তে থাকে ছাত্রদের তথা আওয়ামী লীগের। এ আন্দোলনের ফলে আয়ুব খানের পতন এবং নতুন সামরিক শাসন এলেও আওয়ামী লীগের প্রধানতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠেন, বাঙালিদের নেতা হিসেবে তাঁর একটি ভাবমূর্তি গঠে দেশবাসীর মধ্যে। পাশাপাশি আমরা ছাত্ররা গ্রামে গ্রামে তৎপর থাকি আওয়ামী লীগের পক্ষে। ফলে জনগণের মধ্যে দলটির জনসমর্থণ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান কিছু দাবিদাওয়া মেনে নেয়। যে সব দাবিদাওয়া মেনে নেয় তারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব ও পশ্চিশ পাকিস্তানের দুই ইউনিট বাতিল করে জনসংখ্যা অনুযায়ী আসন বন্টন করা হয়। এতে আমরা সংখ্যা অনুপাতে পাকিস্তান জাতীয় সংসদের ১শ’ ৬০টি আসন পাই, আর পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ পায় ১ শ’ ৪০ আসন। পাশাপাশি ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যান্য নেতাদের পিছনে ফেলে একক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন, আর আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে একক রাজনৈতিক দল।  

পাকিস্তানে নতুন নির্বাচন ঘোষনা করা হয়। সিরাজগঞ্জে আমাদের আসনে জাতীয় সংসদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয় মোতাহার হোসেন তালুকদারকে এবং প্রাদেশিক পরিষদের মনোনয়ন পান সৈয়দ হায়দার আলী। আমরা ছাত্ররা নিজ দায়িত্বে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ঘুরে জনগণের দোরগোরায় গিয়ে ভোট প্রার্থণা করি। তখন আমাদের অর্থাৎ নৌকা মার্কার পক্ষে জোয়ার আসে। আমাদের এলাকার প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। জাতীয় সংসদে ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ দুটি ছাড়া সবগুলো আসনে বিজয়ী হন আওয়ামী প্রার্থীরা। এর ফলে সমগ্র পাকিস্তানে নির্বাচনের মাধ্যমে সংগরিষ্ঠের দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। জনগণও ভাবতে শুরু করে যে, দীর্ঘদিন পর এবার বাঙালিদের দল আওয়ামী পাকিস্তানকে শাসন করবে। নির্বাচনের ফলাফলে ভীষণ খুশি হয় সাধারণ মানুষ। 

কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষনা দেয় ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার। এটাকে বাঙালিরা তাদের হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র বলে মনে করে। এ ঘোষনা রেডিওতে প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগ প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। সারাদেশেই মিছিলে শ্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ তাতে দলমত নিবিশেষে যোগ দেয় সাধারণ মানুষ। আমিও সিরাজগঞ্জ শহরের সে মিছিলে অংশ নেই। পরদিন ঢাকায় ছাত্রসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়। হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে সে পতাকা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ’ গড়ে তুলে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা’ করার আহ্বান জানান। এটাকেই সিরাজগঞ্জবাসী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা বলে সর্বাত্বক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ মহুকুমার এসডিও একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্করসহ সবাই নেমে আসেন জনতার কাতারে। এ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে চলে আসেন আমার বড় ভাই আলাউদ্দিন শেখ। 

বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ। আলাউদ্দিন ভাই সহ বেশ কয়েক জন মিলে বহুলী হাটখোলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন স্থানীয় তরুণদের জন্য। ডামি রাইফেল আনা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে। প্রশিক্ষণ দেন স্থানীয় ময়দান ডাক্তার, আনসার সদস্য আব্দুল আজিজ ও আব্দুস সামাদ। এই প্রশিক্ষণে এলাকার বেশ কিছু তরুণের সঙ্গে আমিও অংশ নেই। এই প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল মূলত শরীর চর্চায়। তবুও নিয়মিত প্রশিক্ষণে যেতাম, এলাকার মানুষ ভীড় করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সে প্রশিক্ষণে উৎসাহ দিত। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কয়েক দিন পর বহুলী থেকে আমি সহ কয়েক জন তরুণকে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। সেখানে অস্ত্রের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশলও শেখানো হয়। প্রশিক্ষণ দেন সেনা সদস্য লুৎফর রহমান অরুণ, রবিউলসহ আরো কয়েক জন। এখানে প্রশিক্ষণ শেষে চাঁনমারীও করানো হয়। ইতিমধ্যেই ২৫ মার্চ রাতে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেড়িয়ে এসে গণহত্যা শুরু করে পাকবাহিনী। হামলা চালানো হয় ইপিআর ক্যাম্প ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। এ খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এদিকে, পুলিশের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার বার্তাও চলে আসে সিরাজগঞ্জে। আর সিরাজগঞ্জে কোনও ক্যান্টনমেন্ট বা সেনা ক্যাম্প না থাকা এবং মহুকুমা প্রশাসনের সবাই স্বাধীনতার পক্ষে থাকায় সহজেই স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ হয়ে পড়ে এ অঞ্চল। কিছু তরুণকে পাঠানো হয় বাঘাবাড়িতে পাকসেনাদের ঠেকানোর জন্য, আর কিছু তরুণকে রাখা হয় শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে। আমি বাঘাবাড়িতে যেতে চাইলেও আমাকেসহ পুলিশ, আনসার সদস্য এবং আমাদের মতো কিছু তরুণকে শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার গ্রুপের সঙ্গে রাখা হয়।

ঢাকা থেকে বের হয়ে পাকসেনারা আমাদের মুক্ত এলাকাগুলো দখলে নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জেও গুজব ছড়িয়ে পড়ে পাকসেনা আসার। শহর ছাড়তে শুরু করে সিরাজগঞ্জবাসী। ২৬ এপ্রিল শহর ছেড়ে যান সিরাজগঞ্জের মহুকুমা প্রশাসক একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর। তার আগে মাইকে ঘোষনা করা হয় সাধারণ মানুষজনকেও শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য। আমি এলাকার অন্যদের সঙ্গে শহর ছেড়ে চলে আসি নিজের গ্রামে। আমরা তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময় ছোট বোন আর মাকে রেখে গিয়েছিলাম বাড়িতে। বাড়িতে এসে দেখলাম, তারা চলে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। আমি মামাদের বাড়ি ধীতপুরে চলে যাই, কিন্তু সে গ্রামের বাসিন্দাদের অনেকেই ততক্ষণে চলে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। 

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে ট্রেনে করে সিরাজগঞ্জ চলে আসে পাকসেনারা। দশ/এগারোটার দিকে চান্দাইকোনা-সিরাজগঞ্জ রোড হয়ে পাকসেনাদের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় সিরাজগঞ্জ। পরে আবারো বিকেল তিনটের দিকে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকসেনাদের একটি গ্রুপ আসে আমাদের গ্রামে। তারা আমাদের বাড়ি থেকে আগুন দেওয়া শুরু করে, এ সময় আগুন দেওয়া হয় গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে। গ্রামের যারা তখনো সরে যায়নি তাদের দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করা হয়। কিছু মানুষকে ধরে এনে নদীর পাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে অনেকেই শহর থেকে আমাদের গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদেরও হত্যা করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে নিজের এলাকায় আত্মগোপন করে থাকি আর নিজের বাবা-মা, ভাইবোন ও সহযোদ্ধাদের খুঁজতে থাকি। এ সময় আমার সঙ্গে যুক্ত হন আমার মামাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক জামিল। খবর পাই যে, আলাউদ্দিন ভাই আমার চাচাতো ভাই আনোয়ারের মামার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার কোনও খবর জোগাড় করতে পারি না। কিন্তু জানতে পারি যে, তার সঙ্গে থাকা পাঁচটি থ্রিনটথ্রি রাইফেল ও কিছু গুলি লুকিয়ে রাখা হয়েছে ওই বাড়িতে। অস্ত্রগুলো আলাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে এসেছিলেন বাঘাবাড়ি থেকে। সেখানেই ভাসা ভাসা খবর পাওয়া যায় যে, আলাউদ্দিন ভাই ভারতে চলে গেছেন, আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি এলাকায়ই আছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি দল গঠনের চেষ্টা করছেন। 

ইতিমধ্যেই খবর পাওয়া যায় যে, ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটে সোহরাব আলী সরকারের মামার বাড়িতে আছেন। সেখানে ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী সংগঠিত হয়েছেন, গঠন করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের দল। যোগাযোগ করে আমি আর আব্দুর রাজ্জাক জামিল আরো কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাই ভদ্রঘাটে। সঙ্গে নিয়ে যাই আলাউদ্দিন ভাইয়ের রাখা পাঁচটি থ্রিনটথ্রি রাইফেলও। অস্ত্রগুলো আব্দুল লতিফ মির্জার কাছে জমা দিয়ে আমরা কয়েকজন যুক্ত হই পলাশডাঙ্গায়। নিজের কাছে রেখে দেই থ্রিনটথ্রি রাইফেলের কিছু গুলি আর একটি গ্রেনেড। সে দিনই বাবার খোঁজে তাড়াশ যেতে হবে বলে কয়েক দিন ছুটি চেয়ে নেই লতিফ মির্জার কাছে থেকে। আমি আর আমার মামাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাক জামিল রওনা হই তাড়াশের দিকে। পথে কয়েক জন কলেজ ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়। তারা আগে থেকেই আমার পরিচিত। তাদের সঙ্গে আলোচনা ওঠে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তাদের বলি যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছি। তারা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে, পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে কখনোই বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়, তাই পাকিস্তানকে মেনে নেওয়াই ভালো। হাজার বছর যুদ্ধ করলেও বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা ওদের কথা মানতে নারাজ। আমরা ওদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেই, কিন্তু এক সময় ভয়ও পেয়ে যাই যে, ওরা স্বাধীনতা বিরোধীদের দলে যুক্ত হয়ে থাকতে পারে। এ নিয়ে তর্কও হয় ওদের সাথে। এক সময় দুপক্ষই রণে ভঙ্গ দিয়ে ওরা চলে যায়, আমরাও দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে অন্য পথ ধরে চলে যাই তাড়াশে।

তাড়াশ কাজী অফিসে বিয়ে রেজিষ্ট্রার হিসেবে চাকরি করতেন আমার বাবা, থাকতেন সেখানেই। কিন্তু হতাশ হতে হলো সেখানে গিয়ে। আশপাশের লোকজনের কাছে জানা গেল যে, তিনি কয়েক দিন হয় এলাকায় চলে গেছেন তিনি। সে সময়ে অন্য কোথাও যাওয়ার চেয়ে সেখানে থাকাই নিরাপদ মনে হয়। কেউ কেউ অভয় দেন যে, সেখানে থাকা কোনও সমস্যা নয়। আমি আর জামিল আমাদের কাছে থাকা গুলি আর গ্রেনেড সিলিংয়ের উপর রেখে ওখানেই থেকে যাই। কিন্তু দু’একদিন যেতে না যেতেই মনে হয়, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে, যে কেউ থানায় বলে দিলে নির্ঘাত আমাদের ধরা পড়ে যেতে হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সেখান থেকে বের হয়ে পড়ি সেখান থেকে। কিছু দূর আসার পর মনে হয় গুলি আর গ্রেনেডের কথা। ফিরে রওনা হই গুলি আর গ্রেনেড আনার জন্য। গুলি আর গ্রেনেড নিয়ে কিছু দূর আসার পরই দেখতে পাই যে, কাজী অফিসে হানা দিয়েছে পাকসেনারা। অল্পের জন্য পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়া থেকে বেঁচে যাই। তাড়াশ থেকে রওনা হই ভদ্রঘাটের দিকে। পথে খবর পাই যে, ভদ্রঘাটে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছিল পাকসেনারা। সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে লতিফ মির্জা সহ মুক্তিযোদ্ধারা। এ খবর পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ি, কী করবো বুঝে উঠতে না পেরে দুজন চলে আসি নিজ এলাকায়। 

এলাকায় এসে বাবা-মা ভাইবোনদের কে কোথায় আছেন তার খবর সংগ্রহ করা চেষ্টা করি, কিন্তু খুঁজে পাই না। তবে অনেকেই জানান যে, আলাউদ্দিন ভাই চলে গেছেন ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে। পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা তাড়াশ এলাকায় কয়েকটি নৌকা নিয়ে চলনবিল এলাকায় । তখন পলাশডাঙ্গাকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। আমি আর জামিল রওনা হই নলকা হয়ে তাড়াশের দিকে। নলকায় এক আত্মীয় বাড়িতে রাত কাটানোর জন্য অবস্থান নেই, সেখানেই জানতে পারি যে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা নৌকায় করে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুযোগ পেলেই হামলা চালাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীদের বাড়িতে অথবা কোনও রাজাকার ক্যাম্পে, থানা পুলিশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বা থানায়। তাদের নৌকা মাঝেমধ্যেই আসে ফুলজোড় নদীতে। কেউ কেউ পরামর্শ দেন ফুলজোড় আর ইছামতীর তীরে নলকা এলাকাতে অবস্থান করলেই কয়েক দিনের মধ্যে এখানেই পাওয়া যাবে তাদের। আমরাও চিন্তা করি, চলনবিলের কোথায় গিয়ে খুঁজবো, তার চেয়ে এখানে অবস্থান করাই ভালো। নলকা গ্রামটির যোগাযোগ ব্যবস্থা পাকসেনাদের অনুকুলে নয়। তাই সেখানে আত্মীয় বাড়িতে থাকতে শুরু করি আমরা। আমরা সারাদিনই নলকা নদীর পারে অবস্থান করতে থাকি আর রাতে আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাই। একদিন পলাশডাঙ্গার বেশ কয়েকটি নৌকা পেয়ে নলকার ফুলজোড় নদীতে, উঠে পড়ি সে নৌকায়। 
পলাশডাঙ্গার নিয়মানুযায়ী আমাদের দুজনকেই প্রথমে হেড কোয়ার্টারে রাখা হয়, পরে জামিলকে একটি কোম্পানিতে অন্তভূক্ত করা হয়। আর আমাকে পলাশডাঙ্গার হিসাব বিভাগে রাখা হয়। আমি হিসাব বিভাগের দায়িত্বে থাকা আব্দল হাই তালুকদার ও সলপের ইকতিয়ার পান্নাকে সহযোগিতা করতে থাকি। নিয়মানুযায়ী আমাদের প্রত্যেককেই সকালে হাজিরা, শরীর চর্চা এবং অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে হতো। বিভিন্ন যুদ্ধেও অংশ নিতে হতো। সারাদিন একটি গ্রামে যার যার নৌকায় অবস্থান নিয়ে থাকতাম আমরা। এমন অনেকগুলে নৌকা ছিল পলাশডাঙ্গার। সকালেই গ্রামে কোনও মাঠে বা নদীর পারে আমাদের প্রশিক্ষণ হতো। আমরা সরাসরি পরিচালকের কাছে জবাবদিহি করতাম। কালেকশনের দায়িত্ব থাকা ব্যাক্তিগণ তাদের তোলা চাল-ডাল, অর্থ আমাদের কাছে জমা দিতেন। নিয়মানুযায়ী আমরা রেশন ও হাত খরচের টাকা প্লাটুন, সেকশনকে বিতরণ করতাম। সেকশন বা প্লাটুন কমান্ডার কাছাকাছি হাটবাজার থেকে তাদের জিনিষপত্র সংগ্রহ করে নিতো। 
১১ নভেম্বর তাড়াশের হান্ডিয়াল নওগাঁয় অবস্থান নেই আমরা। সেদিন ভোর রাতে আমাদের ওপর হামলা চালায় পাকবাহিনী ও তার সহযোগিরা। আমাদের অবস্থান ছিল সুবিধাজনক, প্রকৃতি পক্ষে, সবচেয়ে বড় কথা জনগণ ছিল আমাদের পক্ষে। ফলে প্রায় বারো ঘন্টা যুদ্ধ করে আমরা তাদের পরাস্থ করতে সক্ষম হই। সেদিন তাড়াশের কঠিন কাদামাটিও ছিল পাকবাহিনীর বিপক্ষে। পাকসেনাদের আনুমানিক এক কোম্পানি সেন্য আমাদের হাতে নিহত হয়, রাজাকার মারা যায় প্রায় ২ শ’। ধরা পড়ে একজন ক্যাপ্টেন সহ ১২ জন সৈন্য। এলএমজি সহ বেশ কিছু ভারি অস্ত্রও চলে আসে আমাদের হাতে। জনগণও অনেক পাকসেনা ও রাজাকারকে তাদের ঘষির মাঁচা থেকে ধরে এনে আমাদের হাতে সোপর্দ করে। কিন্তু আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয় সামান্যই। হান্ডিয়াল নওগাঁ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আমাদের কমান্ডারেরা কৌশল পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ বর্ষা শেষে বিস্তৃত চলনবিলের পানি কমে এসেছে। আমাদের চলাচলের এলাকা হয়ে এসেছে অনেক কম। ফলে সহজেই আমাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারছিল শত্রুরা। তাই নৌকা ছেড়ে দিয়ে ডাঙ্গায় নামার সিদ্ধান্ত নেন কমান্ডারেরা। তাছাড়াও এ যুদ্ধের ফলে আমাদের হাতে নতুন অস্ত্র এলেও গুলির সংকট তীব্র হয়ে দেখা দেয়। তারপরেও কয়েক দিন চলনবিল এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পাকসেনা ও তার সহযোগিরা আমাদের অবস্থানকে মোটামুটি চিহ্নিত করে ফেলায় চলনবিলের চার পাশের গ্রামগুলোতে ব্যাপক লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও গণহত্যা শুরু করে। পরে নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে পলাশডাঙ্গার কমান্ডার ও পরিচালকবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন, প্রয়োজনীয় গুলি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মুক্ত এলাকা রৌমারীতে যাওয়ার। এ জন্য আমরা পলাশডাঙ্গার সবাই রওনা হই রতনকান্দি কাজীপুরের দিকে।

কষ্ট লাগে বড় ভাই আলাউদ্দিন বা অন্যদের সঙ্গে দেখা হলো না। ব্রহ্মগাছা-রতনকান্দির কাছে এক গ্রামে অবস্থান নেই আমরা। পরের দিনই লতিফ ভাই বলেন, তোর ভাই আলাউদ্দিনের সাথে দেখা করবি? - গত আট মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আর তার দেখা পাই নি, বাবামা, ভাইবোনকেও হারিয়ে ফেলেছি। এখন কোথায় পাবো আলাউদ্দিন ভাইকে? বললাম আমি। লতিফ ভাই এবার বলেন- চল যাই, আলাউদ্দিন আছে পাশের গ্রামে। দুজন চলে যাই চক ডাকাতিয়া গ্রামে। সেখানে আলাউদ্দিন ভাই অবস্থান করছিলেন তার তার গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। সেখানে এক বাড়িতে গিয়ে দেখা করি বড় ভাইয়ের সঙ্গে। আলাউদ্দিন ভাই বাঘাবাড়ি থেকে ফিরে চলে গিয়েছিলেন ভারতে। বিএলএফের দ্বিতীয় ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকায় ফিরেছেন। তারপর বিএলএফের নিয়ম অনুযায়ী স্থানীয় ভাবে রিক্রুট করে দল গড়ে তুলেছেন। লতিফ ভাই বিএলএফের নেতৃবৃন্দের খোঁজ খবর নেন। এক সময় আমি আর লতিফ ভাই ফিরে আসি আমাদের অবস্থানে। এর পর কয়েক দিনের প্রস্তুতি নিয়ে শুভগাছার টেংলাহাটা যমুনার ঘাট থেকে নৌকায় উঠে আমরা রওনা হই কুড়িগ্রাম মহুকুমার রৌমারীর উদ্দেশ্যে।

পথে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, বিমান হামলা এড়িয়ে তিন দিনে, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা পৌঁছে যাই রৌমারী ইয়থ ক্যাম্পে, ততদিনে সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ রিক্রুট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সে ক্যাম্পেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। দীর্ঘদিন পর শত্রুকে নিয়ে কোনও উত্তেজনা নেই, আক্রমন করার কোনও পরিকল্পনাও নেই। কিন্ত পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দের বিশ্রাম নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই, তারা কেউ ছুটলেন কোলকাতায় প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, কেউ গেলেন বিএলএফ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করতে। আর রৌমারীতে বসে বসে অলস সময় কাটতে লাগলো আমাদের।
এদিকে, ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করলো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী [মুক্তিবাহিনী] ও ভারতীয় সেনাবাহিনী [মিত্র বাহিনী]র সমন্বয়ে গঠন করা হলো যৌথ বাহিনী। পাকসেনা বাহিনী ভারতকে আক্রমন করে বসে ভারতীয় ভূখ-ে। ভারত তার পাল্টা জবাব দেয়। পাল্টা আক্রমন করে। এ যুদ্ধ চলছিল পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে। যৌথ বাহিনী একের পর এক পাকবাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে থাকে, মুক্ত হতে থাকে বাংলাদেশ। ভুটান, নেপাল ও ভারত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সহজেই বোঝা যায় যে, স্বাধীনতা এখন সময়ের ব্যাপার। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকবাহিনীর পূর্বঞ্চলীয় কমান্ড। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যেই পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ ফিরে আসেন রৌমারীতে। ১৭ ডিসেম্বরেই আমরা বেশ কয়েকটি নৌকায় উঠে রওনা হই সিরাজগঞ্জের দিকে। এক/দুই দিনের মধ্যেই আমরা ব্রহ্মপুত্র যমুনা হয়ে আমরা ফিরে আসি মুক্ত সিরাজগঞ্জে। পুরান জেলখানার ঘাটে নামার পর আমাদের বিপুল সংবর্ধনা দেয় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা জনতা। সেদিন আমরা পুরো শহরে বিজয় মিছিল করি। আমাদের প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজে। তারপর ক্যাম্প হয় মোক্তার পাড়ার মোড়ে সাহারা হোটেলে। 

১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের স্থপতি পাকিস্তান কারাগার থেকে ফিরে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেন। এর কয়েক দিন পরেই সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলীর কাছে আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্ত্র সমর্পণ করি, শেষ হয় আমার মুক্তিযোদ্ধা জীবন। [সমাপ্ত] 

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

ও/এসএ/

Published: Sun, 05 Jul 2020 | Updated: Sun, 05 Jul 2020

যুদ্ধস্মৃতি : মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই শেখ

আমি আব্দুল হাই শেখ। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকসাবাড়ি ইউনিয়নের পুরান শৈলাবাড়ি গ্রামে বাবা দিয়ানত আলী শেখ ও মাতা সেফাতন নেছার ঘরে ১৯৫৩ সালের এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে জন্ম গ্রহণ করি। আট ভাই-দুই বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। তখনকার পারিবারিক নিয়ম অনুয়ায়ী মাদ্রাসা দিয়ে আমার লেখাপড়া শুরু। আমি এসএসসি পাশ করি ১৯৭০ সালে। সে বছরই ভর্তি হই সিরাজগঞ্জ আইআই কলেজে। 

এলাকার রাজনীতি অনুযায়ী গ্রামের ছাত্ররা নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়তো। তাছাড়াও এলাকার ছাত্ররাও বিশেষ করে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহানগাছার আমিনুল ইসলামরা আগে থেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাই আমিও কলেজে ভর্তি হয়ে যুক্ত হই ছাত্রলীগে। তখন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ছাত্রলীগ শহরে মিছিল করতো। মিছিলের প্রধান প্রধান স্লোগান ছিল ‘জয়বাংলা’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ইত্যাদি। 

ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে এলাকায় সত্তরের নির্বাচনী কাজে যুক্ত থাকি অন্যদের সঙ্গে। আমাদের এলাকা থেকে এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। একইভাবে সারাদেশে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনই লাভ করে। এভাবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০ আসন পেয়ে পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। ফলে নিশ্চিত হয় বাঙালিদের পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ। তখন আনন্দে অথবা দাবি আদায়ের জন্যই কলেজে গেলে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়েও তৎপর থাকতে হতো নিয়মিত।

১৯৭১ সালের ১ মার্চে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে ইয়াহিয়া খান। এটাকে বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করে সাধারণ মানুষ। সিরাজগঞ্জে এ ঘোষণার সাথে সাথেই প্রতিবাদ জানাতে ছাত্রলীগ মিছিল বের করে। সে মিছিলেই স্লোগান ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার। আমাদের ছাত্রদের সঙ্গে সে মিছিলে যোগ দেয় সাধারণ মানুষও। এরপরই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। 

প্রতিদিনই মিছিল হতে থাকে শহরে। আমাদের ক্লাস না থাকলেও মিছিল করতেই প্রতিদিন গ্রাম থেকে শহরে যাই। এরমধ্যে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ভাষণে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাঁর এ ঘোষণাকেই সিরাজগঞ্জবাসী স্বাধীনতার ঘোষণা বলে মনে করে। 

ঘোষিত স্বাধীনতা রক্ষা এবং হানাদার পাকবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। আমি প্রশিক্ষণের জন্য তৎকালীন জিন্না স্টেডিয়াম বর্তমানে শহীদ একে শামসুদ্দিন স্টেডিয়ামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে নাম লেখাই। সেখানে মুকুল ফৌজের জহুরুল ইসলাম মিন্টু, আনসার সদস্য বাহাদুরসহ অনেকেই আমাদের প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন। প্রায় প্রতিদিনই আসতেন সিরাজগঞ্জের তৎকালীন এসডিও একে শামসুদ্দিন এবং এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর।

২৫ মার্চ ঢাকায় নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায় পাকহানাদের বাহিনী। শুরু করে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে পাকসেনারা। বড় বড় শহর থেকে গ্রামে ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তাদের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে প্রচার হতে থাকে পাকবাহিনীর নির্যাতনের খবর। এতে সাধারণ মানুষ আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের ওপর যেটুকু আস্থা সাধারণ মানুষের ছিল তা-ও শেষ হয়ে যায়। 

এ সময় জিন্না স্টেডিয়ামে চানমারীর মধ্যে দিয়ে প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়। কেউ কেউ চলে যায় বাঘাবাড়ি ঘাটে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে। আমাদের বলা হয় এলাকায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনের জন্য। আমি এলাকায় ফিরে মুক্তিযোদ্ধা দল গঠনে যুক্ত হই। আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল ইসলাম তালুকদারের ছোটভাই নজরুল ইসলাম লিচুর নেতৃত্বে ১৩/১৫ জনের একটি দলও গঠন করা হয়। এতে যুক্ত হন আনসার সদস্য শাহ আলম সরকার (বেলতা), আমার বড় ভাই আব্দুস সামাদ (পুরান শৈলাবাড়ি), ইব্রাহিম হোসেন (শৈলাবাড়ি), হেদায়েতুল আলম (তেলকুপি) প্রমুখ। এ সময়ে আমরা জোগাড় করে ফেলি প্রায় দশটি রাইফেল ও বেশ কিছু গুলি। 

এদিকে, ২৭ এপ্রিল ভোরে ট্রেনযোগে পাকবাহিনী এসে দখল করে নেয় সিরাজগঞ্জ শহর। এখানেও শুরু করে গণহত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। সিরাজগঞ্জে শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটি রাজাকার বাহিনীর তৎপরতা। আমাদেরও শুরু হয় দলবদ্ধভাবে গোপন তৎপরতা।

এলাকায় বিভিন্ন ছোট-বড় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ গড়ে উঠতে থাকে। রহমতগঞ্জের ইসমাইল হোসেনের নেতৃত্বেও এলাকায় এমনি একটি গ্রুপের তৎপরতার খবর পাওয়া যায়। আমাদের গ্রুপের একজনের সম্পর্ক ছিল ইসমাইলের সঙ্গে। সেই সম্ভবত আমাদের খবর তার কাছে পৌঁছে দেয়। একদিন ইসমাইল এসে আমাদের কাছে প্রস্তাব দেন তাদের গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য অথবা অস্ত্রগুলো তাদের গ্রুপে দিয়ে দেওয়ার জন্য। উপায়ান্তর না দেখে আমরা তাঁর গ্রুপে যোগ দেই। এতে অবশ্য দলটি বড় হয়। আমরা দলবদ্ধভাবে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে থাকি। কখনো কখনো রাতে রাতে স্বাধীনতাবিরোধীদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিতে থাকি। 

ইসমাইল এককভাবে দলটি পরিচালনা করতেন, সঙ্গে ছিলেন তাঁর কয়েক ভাই। এই গ্রুপের অনেক কাজই রহস্যজনক। অনেক কাজেই আমাদের যুক্ত করা হতো না। কিন্তু দলবদ্ধভাবে থাকাটা এ সময়ে আমাদের জন্য ছিল খুবই জরুরি। আমরা নিরাপত্তার প্রশ্নেই শুধু একই এলাকায় তৎপর থাকতাম না, কখনো চলে যেতাম কামারখন্দ, বেলকুচি; কখনো বা রতনকান্দি, কাজীপুর, বগুড়ার ধুনট এলাকায়। আমরা তখন কয়েকটি নৌকায় অবস্থান করতাম। 

একদিন আমরা চলে গেছি রতনকান্দি-গোপালনগর এলাকার বগা গ্রামের কাছে। এ সময় আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বাধীন পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সঙ্গে আমাদের ইসমাইল গ্রুপের দেখা হয়ে যায়। আলোচনার ভিত্তিতে আমরা ইসমাইল গ্রুপ যুক্ত হয়ে পড়ি পলাশডাঙ্গার সঙ্গে। আমাদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয় পলাশডাঙ্গার নিয়ম অনুযায়ী। ইসমাইলকেও একটি গ্রুপ দেওয়া হয় পরিচালনার জন্য। আমাদের গ্রুপের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেড়া অঞ্চলের এক সেনা বা ইপিআর সদস্যকে।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরে যুক্ত হওয়ার দু’এক দিন পরের ঘটনা। আমরা তখন ব্রহ্মগাছার পরে নদীর মধ্যে অবস্থান করছি। সকালের প্যারেড, পিটি, প্রশিক্ষণ শেষে নাস্তা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ সময় সিরাজগঞ্জ থেকে পাকসেনার একটি দল এসে ব্রহ্মগাছার নদীতে অবস্থানরত পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা তড়িঘড়ি করে নৌকা থেকে নেমে আশ্রয় নেই নদীর পশ্চিম পারে ব্রহ্মগাছা এলাকায়, আর পাকসেনারা আশ্রয় নেয় সুবর্ণগাতী এলাকায়। তখন সূবর্ণগাতীর বেশ কয়েক জন স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিল, তারাই পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে পাকসেনাদের। 

সারাদিন উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথা ভোলার নয়। সাধারণ মানুষ পাটক্ষেত, আখক্ষেতের ভিতর দিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুড়ি, চিড়া, ভাত, যে যা পেরেছে এনে দিয়েছে। তা খেয়েই আমরা সেদিন জনগণের সহায়তায় সারাদিন যুদ্ধ করেছি। বিকেলের দিকে পাকসেনারা রণে ভঙ্গ দেয়, আমরাও সে এলাকা থেকে উইথড্র করি। এরপর আমরা চলে যাই চলনবিল এলাকায়। 

এ যুদ্ধের পরপরই একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। এ সময় আমিসহ কয়েক জনের হাতে তুলে দেওয়া হয় টিপু নামের একজনকে। বলা হয়, উল্লাপাড়া অঞ্চলের এক মুসলিম লিগ নেতা, ঐ সময় স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির নেতার ছেলে সে। সে পাকিস্তানিদের পক্ষে স্পাইং করার জন্য আমাদের সঙ্গে কাছে আসতে পারে। আমরা তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি যে, সে ছাত্রলীগ করে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতেই এ বাহিনীতে এসেছে। তখন আমরা তাকে শাস্তি দিতে গড়িমসি করি। এ জন্য কমান্ডারেরা আমাকেসহ গ্রুপের অন্যদের তিরস্কার করে। পরে ঐ ছেলেকে আমাদের হাত থেকে নিয়ে ইসমাইলের আরেকটি গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবির পরিচালিত হতো পুরোপুরি সামরিক কায়দায়। পাকসেনাবাহিনী থেকে বেড়িয়ে আসা কিছু সদস্য এসে যুক্ত হয়েছিল পলাশডাঙ্গায়, তারাই এ শৃঙ্খলা গড়ে তোলে। আব্দুল লতিফ মির্জা, বিমল কুমার দাস, সোহরার আলীসহ ছাত্রনেতারা এ বাহিনী পরিচালনা করতেন। 

এ বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত নৌকায় থাকতো। অপারেশনের প্রয়োজনে মাটিতে নামতো, অপারেশন শেষ হলে আবার নৌকায় আশ্রয় নিত। যেহেতু বাহিনীর শৃঙ্খলা রক্ষার নিয়মগুলো সেনাসদস্যের পরামর্শে করা হয়, তাই বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাদেরও কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলতে হতো। সেকসন, প্লাটুন, কোম্পানির নৌকাগুলো পাশাপাশি অবস্থান করতো। নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রতিদিন গভীর রাতে পুরাতন আশ্রয় ছেড়ে নতুন আশ্রয়ে যাওয়া হতো। কোনো না কোনো গ্রামের পাশে আমরা আশ্রয় নিতাম। ভোরে উঠে মাটিতে নামতাম প্যারেড, পিটি ও অস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আলোচনা হতো। তখন আমরা গ্রামবাসীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেতাম। ঐসব গ্রামবাসীও আমাদের মুক্তহস্তে চালডাল তুলে দিত যা থেকে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ার চালডাল হয়ে যেত। প্রতিদিন আমাদের সামান্য কিছু হাতখরচ দেওয়া হতো।

উধুনিয়া বাজারে ছিল একটি রাজাকার ক্যাম্প। পরিকল্পনা করা হয় সে ক্যাম্প আক্রমণের। আমরা প্রায় তিনটি সেকশন সে আক্রমণে যুক্ত হই। প্রতিটি আক্রমণে সাধারণত সেনা সদস্যরাই নেতৃত্ব দিতেন। সঙ্গে থাকতেন গুরত্বপূর্ণ ছাত্রমুক্তিযোদ্ধারা। ক্যাম্প ঘিরে ফেলার পর আমাদের দিক থেকে আক্রমণ করা হয়। রাজাকারেরা তেমন প্রতিরোধই করতে পারেনি। আত্মসমর্পণ করে অন্তত পনের জন রাজাকার। পরে তাদের বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়। 

এ সময় রাজাকারদের অন্তত দশটি থ্রিনটথ্রি রাইফেলসহ বেশ কিছু গুলি আমাদের কাছে জমা হয়। তখন পলাশডাঙ্গা আরো একটি যুদ্ধের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনাটি করা হয় ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জের রেললাইনের মোহনপুর দিলপাশারের একটি রেলব্রিজে। ঐসব রেলব্রিজে রাজাকার ক্যাম্প বসিয়ে পাহারা দেওয়া হতো যাতে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ধ্বংস করে রেলপথ বন্ধ না করতে পারে। তাছাড়াও মুক্তিযোদ্ধারা ঐসব রেলব্রিজের নিচ দিয়ে যেন চলাচল না করতে পারে এ জন্যও রাজাকারদের সশস্ত্র পাহারা বসানো হতো। 

ঐ রেলব্রিজ অপারেশন পরিকল্পনা করে পলাশডাঙ্গা। সেখানে সুবিধা ছিল যে, কোনো পাকসেনা ছিল না। আবার অসুবিধা ছিল যে, যুদ্ধ শুরু হলেই ট্রেনযোগে চলে আসতে পারে পাক সেনারা, তাই অপারেশন হতে হবে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে। যাই হোক, ওই অপারেশনে আমাদের গ্রুপও যুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা কয়েকটি নৌকায় ভাগ হয়ে ব্রিজের দু’পাশে নেমে রাজাকারদের ওপর আক্রমণ করি। খুব সহজেই রাজাকারেরা পরাজয় স্বীকার করে। আমাদের হাতে আসে বেশ কিছু থ্রিনটথ্রি রাইফেল ও গুলি। রাজাকারদের সেখানেই শাস্তি দেওয়া হয়, কাউকে কাউকে ছেড়ে দেয়া হয়।

আরো একটি অপারেশনের কথা খুব মনে পড়ে। সে অপারেশনটি ছিল বেলকুচি-এনায়েতপুর অঞ্চলের এক শান্তি কমিটির নেতার বাড়িতে। আমরা আমাদের বড় নৌকা ওয়াপদার ভিতরে রেখে বাইরে গিয়ে ছোট ছোট নৌকায় উঠে সে শান্তি কমিটির নেতার বাড়ি ঘেরাও করি। কিন্তু সে বাড়ি এতোই দুর্ভেদ্য যে, আমরা সে বাড়িতে ঢুকতে ব্যর্থ হই। 

অপারেশন থেকে ফিরে আসতে আমরা ওয়াপদা বাঁধে ওঠার সময় হঠাৎ একটি গুলি এসে পলাশডাঙ্গার পরিচালক আব্দুর লতিফ মির্জার পাশ দিয়ে চলে যায়। তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। এ সময়েই লতিফ মির্জাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে শোনা যেত। এ গুঞ্জণে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারও করা হয়েছিল। তাঁকে বলা হতো সাবধানে চলাফেরা করার জন্য। এ ঘটনা তারই অংশ কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি। কিন্তু আমার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে এ ঘটনা।

এ ঘটনার পর আবার আমরা ফিরে যাই চলনবিল এলাকায়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে এলাকায় আসি আমার মা-বাবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। এলাকায় এসে শুনতে পাই যে, ইসমাইল গ্রুপের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইলের নেতৃত্বে পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে এসেছে। 

তার কয়েকদিন পর নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাড়াশের হান্ডিয়াল-নওগায় পাকবাহিনীর এক বিশাল দল ঘিরে ফেলে। তুমুল যুদ্ধ হয় পাকসেনা বাহিনীর সঙ্গে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের। সাহসের সঙ্গে লড়াই করে মুক্তিযোদ্ধারা। জনগণ ও প্রকৃতির সহায়তায় সারাদিন যুদ্ধের পর বিজয়ী হয় মুক্তিযোদ্ধারা। পাকসেনাদের অনেকেই নিহত হয়। ধরা পড়ে এক ক্যাপ্টেনসহ অন্তত বারো জন। নিহত হয় শ দেড়েক রাজাকার। বিপুল সংখ্যক অস্ত্র জমা হয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। পরে জানতে পারি যে, এ যুদ্ধ করে পলাশডাঙ্গা বিপুল অস্ত্র পেলেও গুলির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সে যুদ্ধের খবর আমাদের এলাকায়ও জনগণের মুখে মুখে প্রচার হতে থাকে রূপকথার মতো।

এলাকায় বসে খবর পাই যে, পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কৌশল পাল্টে নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় ঠাঁই নিয়েছে। কারণ বর্ষা কমে যাওয়ায় চলনবিলের বিচরণ এলাকা ছোট হয়ে এসেছে। সরে গেছে নাটোর-বগুড়ার দিকে। ফলে পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি আমি। এতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু হতাশ হলে তো চলবে না, তাই আবারো দল পাকাতে শুরু করি। বেশ কয়েকজন সঙ্গীও পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য। এ সময় আমার সঙ্গে জুটে যায় পুরান শৈলাবাড়ির আব্দুল হালিম, গুণেরগাঁতীর আনোয়ারুল ইসলাম খান, রাণীগ্রামের আকবর আলীসহ আরো কয়েকজন। এক সময় আমরা চলে যাই শুভগাছায়, সেখান থেকে নৌকায় উঠে রওনা হই রৌমারীর উদ্দেশ্যে।

যমুনা ব্রহ্মপুত্রের উজান ঠেলে আমরা চলে যাই মাইনকার চর হয়ে রৌমারীতে। সেখানে ইয়থ ক্যাম্পে নাম লেখাই। সে ক্যাম্পের দায়িত্ব পালন করতেন ছাত্রলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন (দোয়াতবাড়ি), জহুরুল ইসলাম তালুকদার (মুকুল ফৌজ), শহীদুল ইসলাম তালুকদার, আনোয়ার হোসেন রতু, আমির হোসেন ভুলু প্রমুখ। লঙ্গরখানায় দায়িত্ব পালন করতেন নুরুল ইসলাম। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কাকড়ি ক্যাম্পে হায়ার ট্রেনিংয়ে। আমরা চলে যাই সেখানে। 

কাকড়ি ক্যাম্পে বিভিন্ন অস্ত্রে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু হয়। আর বলা হয়, আরো উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে আমাদের পাঠানো হবে মরণটিলায় হায়ার ট্রেনিংয়ে। এতে বোঝা যায় যে, এটিও রৌমারীর মতোই একটি ইয়থ ক্যাম্প, তবে এটি পরিচালিত হচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে, তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও সেখানে দেখা যেত। কাকড়ি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ হয় প্রায় পনের দিন। এরপর হায়ার টেনিংয়ে পাঠানো হয় আসামের মরণটিলায়। এ ক্যাম্পটি অবশ্য মাইনকারচরের খুব কাছেই। শুরু হয় আমাদের নতুন প্রশিক্ষণ। এখানে প্রশিক্ষণের গুরুত্বটা রৌমারী ও কাকড়ি ক্যাম্পের চেয়ে একটু বেশী।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় চলে আসে। শোনা যেতে থাকে যে, দ্রুতই স্বাধীন হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এর প্রভাব পড়ে মরণটিলা ক্যাম্পেও। প্রশিক্ষণের গুরুত্ব কমে যায়। ক্যাম্পের খাবারদাবারেও সমস্যা হতে থাকে। এ ক্যাম্পে থেকেই খবর পেতে থাকি যে, সীমান্ত এলাকায় থাকা বিপুল সংখ্যক এফএফ মুক্তিযোদ্ধা দলে দলে দেশের ভিতরে ঢুকে পড়ছে। আরো শুনতে পাই যে, পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা সবাই অস্ত্র আর গুলির প্রয়োজনে রৌমারীতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এ অবস্থায় আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই যে, প্রশিক্ষণ শেষ করবো নাকি মরণটিলা ক্যাম্প ছেড়ে পলাশডাঙ্গায় গিয়ে যুক্ত হবো?

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। সীমান্ত এলাকায় তাদের তৎপরতা আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। এখন তারা বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। যৌথ বাহিনীর বৈমানিকেরাও আমাদের মাথার ওপর দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়তে শুরু করে যুদ্ধ বিমান নিয়ে। তখন আমাদের প্রশিক্ষণের চেয়ে দেশ মুক্ত হওয়ার খবর নেওয়াই প্রধান কাজ হয়ে পড়ে। 

এক সময় মরণটিলায় প্রশিক্ষণের আগ্রহ কমে যায়, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে। আব্দুস সামাদ (শৈলাবাড়ি), আব্দুল হামিদ তালুকদার (দিয়ারপাঁচিল)সহ অন্তত পনের জন চলে আসি রৌমারীতে। সেখানে আব্দুল লতিফ মির্জা, বিমল কুমার দাসসহ পুরানো সহযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা হয়। তারাও আমাদের গ্রহণ করে সাদরে। 

রৌমারীতেই জানা গেল যে, আমির হোসেন ভুলু, ইসমাইল হোসেন, জহুরুল ইসলামের নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টর থেকে ফিরে আসা সিরাজগঞ্জের এফএফ এবং রৌমারীতে অবস্থান করা বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তারা ভেতরে ঢুকে পড়েছেন সিরাজগঞ্জ মুক্ত করতে। 

জানা গেল যে, কয়েক জন কমান্ডার গেছেন প্রবাসী সরকারের সঙ্গে দেখা করতে। তারা ফিরে এলেই আমরা রওনা হবো দেশের ভিতরে। কোলকাতায় যাওয়া কমান্ডারবৃন্দ যখন রৌমারীতে ফিরে আসে তার দু’এক দিনের মধ্যেই পাকসেনারা ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ খবর পেলাম রৌমারীতে। এ খবরে আমরা উল্লসিত হয়ে পলাশডাঙ্গা প্রধান আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে রৌমারী থেকে মাইনকার চর পর্যন্ত বিজয় মিছিল করি।

এবার স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পালা। পলাশডাঙ্গা দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এ সময় আমাদের এলাকার আওয়ামী লীগের বড় নেতা শহীদুল ইসলাম তালুকদার ডেকে নিলেন। বললেন, ‘তুই আমার সঙ্গে আমার নৌকায় চল।’ তার কথা ফেলা সম্ভব নয়। অন্য সহযোদ্ধাদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে তার নৌকাতেই ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। দেশ মুক্ত হওয়ার একদিন পরেই তার নৌকাতেই রওনা হলাম শত্রু মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে। 

বাড়িতে ফিরে দেখি, ৯ ডিসেম্বরের শৈলাবাড়ি যুদ্ধের পর পাকসেনারা আমাদের বাড়িসহ গ্রামের আরো কিছু বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামের ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করি। এরপর শহরে এসে মোক্তারপাড়ার মোড়ে স্থাপিত পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের প্রধান ক্যাম্পে রিপোর্ট করি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের দেওয়া বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে থাকি। 

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর কাছে আমাদের অস্ত্র জমা দেই। শেষ হয় আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুক্তিযোদ্ধা জীবনের।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে পড়াশোনায় ফিরে যাই। তারপর মোছা. আনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করি ১৯৭৮ সালে। আমাদের দু’জনের সংসারে তিন সন্তান এসএম আনোয়ারুল কবীর, মোছা. সুমনা শারমীন সূবর্ণা ও শেখ আতাউল কবীরের জন্ম হয়। পরবর্তীতে ব্যবসা ও সমাজসেবামূলক কর্মে মন দেই। সাথে সাথে স্থানীয় সরকার রাজনীতিতে দ্ইু বার খোকসাবাড়ি ইউপির নির্বাচিত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ শহরের বাহিরগোলা ঘোষপাড়ায় বাস করছি।

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sat, 27 Jun 2020 | Updated: Sat, 27 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু

রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু আমার নাম। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে পিতা জালালউদ্দিন তালুকদার ও মাতা সফুরা খাতুনের ঘরে ১৯৫৪ সালে আমার জন্ম। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার মেজো চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার তখন মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমিও আওয়ামী লীগের সমর্থক।

সত্তর সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার কাজীপুর-সিরাজগঞ্জ আসন থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন। এক সময় শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরীহ মানুষের ওপর পাকসেনারা হামলা চালায়। তখন সবকিছুই এলেমেলো হয়ে যেতে থাকে। চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার চলে যান ভারতে। 

সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা আসার আগমুহূর্তে চাচার পরিবার শহরের বাড়িঘর ফেলে চলে আসে আমাদের গ্রামে। বড় চাচার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু ভাইও সপরিবারে গ্রামে চলে আসেন। আমার বড় ভাই সাইফুল ইসলাম পাবনায় পড়াশোনা করতেন। তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। মিন্টু ভাই নিয়ে এসেছিলেন বেশ কয়েকটি রাইফেল। 

একদিন আমার আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদার তিনি রাইফেল হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ফায়ার হয়ে যায়। মিন্টু ভাই এসে তাঁকে অনেক ধমকাধমকি করেন। একদিন পাকসেনারা বাগবাটীতে এসে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। পুড়িয়ে দেয় শত শত বাড়িঘর। বাগবাটী গণহত্যার দু’তিনদিন পরই মেজো চাচার পরিবার ও তাঁর আনা রাইফেলগুলো নিয়ে মিন্টু ভাই ভারতে যাওয়ার জন্য রৌমারীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর আমার ভাই সাইফুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ গ্রামের অনেক তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারত চলে যান।

এদিকে, বাগবাটী গণহত্যার পর আমাদের গ্রামের মানুষের ধারণা হয় যে, এ গ্রাম যেহেতু এমএনএ মোতহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম, তাই এ গ্রামেও এসে তাণ্ডব চালাবে পাকসেনারা। ফলে গ্রামের মানুষ অন্যান্য গ্রামে বিশেষ করে সড়াতৈল গ্রামে রাতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। দিনের বেলায় তারা ফিরে এসে বাড়িতে থাকত। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। এর মধ্যে একদিন বাহুকা গ্রামের বাসিন্দা পুলিশে কর্মরত সোলায়মান আসেন রাইফেলের খোঁজে। কিন্তু রাইফেল না পেয়ে তিনিও চলে যান ভারতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।

ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকসেনাদের যুদ্ধও সংঘটিত হতে থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহসও বাড়তে থাকে। কিন্তু মোতাহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম বলে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামে সাধারণত আশ্রয় নিতে আসত না। এর মধ্যে গান্ধাইলের বড়ইতলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় পাকসেনাদের। পরের দিন ঐ মুক্তিযোদ্ধারা আসেন আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিতে। তাদের আশ্রয় দেওয়া হয় বিভিন্ন বাড়িতে। পাকসেনারা এ গ্রামে হামলা চালালে যেন প্রতিরোধ করা যায় এজন্য মুক্তিযোদ্ধারা বাঙ্কার খুঁড়তে শুরু করে। 

এ সময় এক মুক্তিযোদ্ধা আমার চাচাতো ভাই দুলাল তালুকদার দুলু ভাইকে বাঙ্কার খুঁড়তে বলেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার বয়স দুলু ভাইয়ের চেয়ে কম, কিন্তু তিনি দুলু ভাইকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। এতে তিনি ক্ষেপে যান ঐ মুক্তিযোদ্ধার ওপরে। তিনি হচ্ছেন মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাড়ির ছেলে। তার ওপরে তাঁর ছোটভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার এহেন বেয়াদবি তিনি মানবেন কেন? তাঁদের মধ্যকার এ ঝগড়া প্রায় মারামারিতে রূপ নেয়। পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ও গ্রামের মানুষ এসে এ বিরোধ মিটিয়ে দেয়। তখন ঐ মুক্তিযোদ্ধা দুলু ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চান। 

ওদিকে আবার এক মুক্তিযোদ্ধা তাঁর রাইফেল পরিষ্কার করতে গিয়ে ফায়ার হয়ে যায়। তখন পাশের বাড়ির জাবারী খাঁ তাঁর বাইর-বাড়িতে ধান মলন দিচ্ছিলেন। ঐ গুলি গিয়ে তাঁর গরুর শরীরে লাগলে গরুটি আহত হয়। সাথে সাথেই গরুটি জবাই করে কম দামে মাংস বেচা হয়। পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রাম থেকে চলে যায়। এদিন গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণ যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য দল খুঁজছিল তাঁরা ঐ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেয়।

গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ফলে সিরাজগঞ্জ শহরে পাকসেনারা থাকলেও গ্রামে স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা কমে যায়, গ্রামের মানুষেরও সাহস বাড়তে থাকে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধের পর সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। তখন সবার চিন্তা আমাদের গ্রাম থেকে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছে তাঁদের কী অবস্থা! তাঁরা সবাই বেঁচে আছে তো? ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনারা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি আমরা। প্রতিটি গ্রাম থেকে মিছিল বের হয়ে, জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে মাতিয়ে তোলে সাধারণ মানুষ।

গ্রামের আশেপাশেই যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তাঁদের খোঁজ সহজেই পাওয়া যায়। তাঁরা বেঁচে আছে, ভালো আছে। বড় চাচার ছেলে জহুরুল ইসলাম, মিন্টু ভাই ডিসেম্বরের শুরুতেই তাঁদের দলবল নিয়ে এলাকায় চলে এসেছিলেন। মেজো চাচার ছেলে ফিরোজ তালুকদার চলে এলেন দেশ মুক্ত হওয়ার দু’দিন পরে। তাঁর কাছে খবর পাওয়া গেল যে, আমার ভাই সাইফুল ইসলাম বগুড়ায় আছেন, ভালো আছেন। তিনিও ফিরে আসবেন সহসাই। তার দুদিন পর আমার বড় ভাই ফিরে এলেন বগুড়া থেকে। স্বস্তি ফিরে আসে আমাদের পরিবারে। 

কিন্তু তখনও আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ হযরত আলী খাজা, হারুণর রশীদ, নজরুল ইসলাম ননীসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসেননি। তাঁরা কোথায় আছেন তাও জানা যাচ্ছিল না। মান্নান তালুকদার ফিরে এলেন প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে। তিনি জানালেন যে, তাঁরা ছিলেন সিলেট অঞ্চলে। গ্রামের অন্যরা যাঁরা এখনো ফেরেননি, তাঁরা সবাই আছেন সিলেটে। দ্রুতই বাড়ি ফিরে আসবেন তাঁরাও। তাঁর খবরে গ্রামের সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলামু

ও/ডব্লিউইউ

Published: Thu, 25 Jun 2020 | Updated: Thu, 25 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : মো. আজাদ বেপারী

আমি পিতা আমির বেপারী ও মাতা সালেহা বেগমের একমাত্র সন্তান মো. আজাদ বেপারী। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার শাহেদ নগরের বেপারী পাড়ায় আমাদের বাড়ি। ১৯৭১ সালে কতই বা বয়স হবে আমার, বড় জোর ১৩ বা ১৪ বছর। আমার বাবা শহরের বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে বাজারে বেচতেন। এটাই আমাদের এলাকার জাত ব্যবসা। সে সময় অনুযায়ী আমরা মোটামুটি সচ্ছল ছিলাম। লেখাপড়া তেমন শেখা হয়নি, কাজকর্মেও তেমন যাওয়া হয়নি তখনো।

অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর স্বাধীনতার জন্য দেশের সবাই উন্মুখ হয়ে ওঠে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে যেতে শুরু করে। এ সময় গ্রামের মিছিলে যারা নেতৃত্ব দিতেন তাঁদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাঁদের নাম মনে পড়ছে তাঁরা হলেন আব্দুর কাদের, দেলবার হোসেন, তারাজুল প্রমুখ। সেসব মিছিলে আমিও যোগ দিয়েছি, বাড়ি থেকেও কোনো নিষেধ করা হতো না। বিভিন্ন স্থানে গণ্ডগোলের খবর আসতো। কিন্তু কারো মধ্যে কোনো ভীতি দেখা যায়নি। সবাই উন্মুখ স্বাধীনতার জন্য। 

কিন্তু এক সময় নিরীহ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিরা হামলা চালায়। সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা না এলেও সেসব খবর চলে আসতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সিরাজগঞ্জেও মিলিটারি আসছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে যাদের আত্মীয়-স্বজন, বাড়িঘর আছে তারা আগেভাগেই শহর ছাড়ে চলে যায়। কিন্তু গ্রামে আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, তাই আমরা কোথায় পালাবো? গ্রামেরই বাবার পরিচিত আফাজ বেপারী এগিয়ে আসেন সাহায্য করতে। তাঁদের আত্মীয়বাড়ি আছে শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামের পাশের দাওভাঙ্গা গ্রামে। আফাজ বেপারী তাদের সঙ্গে সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। 

এদিকে, পাকসেনা আসার খবরে শহরের মধ্যে শুরু হয় লুটপাট। গ্রামে বসেই শোনা যায় জেলখানায় বিহারী হত্যাকাণ্ড, ন্যাশনাল ব্যাংকে (বর্তমান সোনালী ব্যাংক) লুটপাটের খবর। সে রাতেই আমি আমার মা-বাবার সাথে আফাজ বেপারীর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়বাড়ি দাওভাঙ্গ গ্রামে চলে যাই।

দাওভাঙ্গায় যখন ছিলাম তখন নানা খবর-গুজব সেখানেও পৌঁছাতে থাকে। খবর পাই যে, শহরে ঢুকেই পাকসেনারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে থাকে। এ সুযোগে লুটপাট হয় ব্যাপক। তারা বিভিন্ন গ্রামের লোককে লুটপাটে উৎসাহ দেয়। তাতে যুক্ত হয় আমাদের গ্রামেরও কেউ কেউ। কখনো কখনো এসব লোকজনকে তারা গুলি করে হত্যাও করে। জানতে পারি যে, আমাদের গ্রামের দুজনকে বড় পোস্ট অফিসের মোড়ে লুটপাট করার সময় গুলি করে হত্যা করেছে। 

দিন যেতে থাকে। শহর থেকে গ্রামে খবর পৌঁছে শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনের। অনেকে গ্রামে খবর নিয়ে য়ায়, শহরে আর আগের মতো ধরপাকড় বা মানুষ হত্যা নাই। এ পরিস্থিতিতে একদিন একাই শহরে আসি। দেখি আমাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি পোড়া টিন গুছিয়ে রাখি। তারপর আবার গ্রামে ফিরে যাই। কয়েকদিন পর আবার বাবা-মায়ের সাথে শহরে চলে আসি। কিন্তু বাড়িতো পুড়িয়ে দিয়েছে, থাকবো কোথায়?

শহরে আসার পর আমাদের পরিবারকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের সেকেন গাড়িয়াল। তাঁর ছেলের নাম আমির। আমার বাবার নাম আর তাঁর ছেলের নাম একই হওয়ায় সেকেন গাড়িয়ালকে তিনি শশুর বলে ডাকতেন। আমি নানা বলে ডাকতাম। এ আত্মীয়তার সূত্র ধরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে আমরা উঠি, তিনি আমাদের জন্য একটি ঘর ছেড়ে দেন, যতদিন বাড়িতে ঘর তোলা না হবে, ততদিন সে বাড়িতে থাকার সুযোগ করে দেন। আমাকে সাধারণত বাড়ির বাইরে বের হতে দিতেন না। তবুও লুকিয়ে মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে বের হতাম। ওই সময় রেললাইনের পাশে সর্দার পাড়ার পোস্ট অফিসের মোড়ে বাজার বসানো হয়েছিল, সে বাজারে গিয়েছি মাঝেমধ্যে।

গ্রামের মধ্যেও মাঝে মাঝে পাকসেনা ও রাজাকারেরা চলে আসতো, কোনো কোনো বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়তো। কেউ তাদের সামনে যাওয়ার সাহস পেতো না, দূর থেকে দেখেই নিরাপদে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতো। একদিন সেকেন গাড়িয়ালের বাড়ির মধ্যেও ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারের দল। আমার মা দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, কিন্তু আমাকে ধরে ফেলে। ঐ সময় সেকেন গাড়িয়ালের মেয়ের পা পুড়ে গে যাওয়ায় বারান্দায় শুয়ে ছিল। 

সে মুহূর্তে আমির মামার স্ত্রী ছিলেন অবাঙালি পরিবারের। তিনি এগিয়ে আসেন। তিনি উর্দুতে আমার কথা বলেন যে, ‘ওকে ছেড়ে দাও।’ পাকসেনারা জিজ্ঞেস করে, ‘এ তোমার কী হয়।’ মামী উত্তর দেয়, ‘এ আমার ছেলে।’ ওরা বলে, ‘তোমার এতো বড় ছেলে হয় কীভাবে?’ মামী বলে, ‘হয়।’ এ কথা বলে মামী আমাকে ছাড়িয়ে নেয়। সেকেন নানার মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে? বিমার?’ এ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় তারা। পরে পাশের এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে পাকসেনা ও রাজাকারেরা। সে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। পরে সে বাড়ি থেকে একজনকে ধরে নিয়ে চলে যায় পাকসেনা ও রাজাকারেরা।

দেশ মুক্ত হওয়ার মাস খানেক আগে পোড়া টিন দিয়ে কোনো রকমে একটি ঘর তুলে আমরা আমাদের ভিটায় চলে আসি। এদিকে ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ভিতরে আসতে শুরু করে। আমরা পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের খবর পেতে থাকি। একদিন সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাকসেনারা রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকে পড়ে। তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাধারণ মানুষ ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে শহরে ঢুকে পড়ে। আমাদের গ্রামের মানুষও মিছিল নিয়ে শহরে আসে, সে বিজয় মিছিলে যোগ দেই আমিও।

saiful

 

অনুলিখন : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম 

 

 

 

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sun, 21 Jun 2020 | Updated: Sun, 21 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

সন্তোষ কুমার শীল

আমি সন্তোষ কুমার শীল ১৪ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার বর্তমান পেশা শিক্ষকতা। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মাড়োয়ারি পট্টি (মুজিব সড়ক)-এ বসবাসরত জীবনকৃষ্ণ শীল ও মাতা গৌরীরাণী শীলের সবার বড় সন্তান আমি। আমরা পাঁচ ভাই তিন বোন। বাবা মাড়োয়ারি পট্টি-বানিয়াপট্টির মোড়ে মুদি দোকান করে সংসার চালাতেন। আমি তখন জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি। এ সময়ে উত্তাল জোয়ার শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার। আমরা কিশোররাও স্বাধীনতার সে মিছিলে যোগ দিয়েছি। 

সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর হওয়ায় পাকবাহিনীর কোনো ক্যাম্প ছিল না। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে মহকুমায় অবস্থিত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যুক্ত হয়ে পড়ে স্বাধীনতার সে মিছিলে।

২৫ মার্চ পাকসেনাদের বিভিন্ন স্থানে অত্যাচারের খবর চলে আসতে থাকে। এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তারা শহর ছেড়ে গ্রামে আত্মীয়-স্বজন বা মুখচেনা অনাত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে মিলিটারি আসার দু’তিন দিন আগে আমরাও সপরিবারে বাড়িঘরে তালা দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে শহর ছাড়ি, চলে যাই সদর থানারই এক গ্রাম সয়দাবাদে।

আমাদের বাড়িতে থেকে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াশোনা করত আমার পিসতুতো ভাই রংপুরের শ্যামল কুমার শীল। সেও আমাদের সঙ্গে যায়। ২৭ এপ্রিল ভোররাতে ঈশ্বরদী ট্রেনযোগে মিলিটারিরা আসে সিরাজগঞ্জ শহরে। আমরা সয়দাবাদে বসেই দেখি, সিরাজগঞ্জ শহরে আগুন দিয়ে গণহত্যা শুরু করে। জানতে পারি, আমাদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর তিন/চার দিন পর তারা গ্রামে নামে। গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সে বাড়িটি ওয়াপদা বাঁধের কাছে হওয়ায় সে আশ্রয়কে নিরাপদ মনে হয় না, মনে হয় সহজেই মিলিটারির গাড়ি চলে আসবে এখানেও।

সয়দাবাদের আশ্রয় ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে যাই যমুনার চরের মধ্যে। টাঙ্গাইলের সন্তোষের পূর্বে চারাবাড়ির পাশে কাবিলা গ্রামে বাস করতেন আমার পিসতুতো বোন-জামাই সত্যরঞ্জণ শীল। আমরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে উঠি। মাসখানেক সেখানে থাকি, কোনও কাজকর্ম নেই, এভাবে তো সংসার চলে না। তখন খবর পাওয়া যায় যে, টাঙ্গাইল শহরে পাকসেনারা কম দামি চাল-আটা বেচছে। উপায় না পেয়ে সাহস করে বাবা আমাদের শহরের চাল-আটা কিনে চরের মধ্যে বেশি দামে বেচার বুদ্ধি বের করেন।

আমরা কয়েক ভাই শহরে যেতাম। আমরা বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা লাইনে দাঁড়াতাম। হিন্দু বলে আলাদা একটা ভয় ছিল, আবার একটা সাহস ছিল যে, ওই শহরে আমাদের কেউ চেনে না। ধীরে ধীরে আমাদের সাহস বাড়ে। কয়েক ভাই মিলে চাল-আটা কিনতাম। সেসব চাল-আটা আবার এক জায়গায় করে চারাবাড়ির বাজারে বসে বেচতাম, এভাবেই আমাদের সংসার খরচ কোনও ভাবে জুটে যেত।

এদিকে, সিরাজগঞ্জ শহরের খোঁজ-খবর নিতে থাকি যে, বাড়িতে ফিরে যাওয়া যাবে কিনা? খবর পেতে থাকি যে, পাকসেনাদের ধরপাকড় কিছুটা কমে এসেছে। প্রায় চার মাস পর বাবা সিদ্ধান্ত নেন সিরাজগঞ্জ শহরে যাবার। বাবা, ঠাকুর মা আর আমাকে নিয়ে শহরে আসেন যাতে ঠাকুর মা আমাদের রান্না করে দিতে পারেন। আমাকে বাবা নিয়ে আসে কারণ, আমি যেন বাবার সঙ্গে থাকতে পারি, যেকোনো বিপদে-আপদে তাঁকে সহয়োগিতা করতে পারি। শহরে আসার পর মনে হলো, এ শহর আমাদের নয়, পাকসেনাদের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের দু’একটি বিল্ডিং ছাড়া সবই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নিজেদের বাড়ির সামনে আসি। দেখি, আমাদের বাড়ি পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। 

আমাদের বাসার সামনে এসডিপিও অফিস। সে অফিসে দিব্বি কাজ করছেন নতুন আসা এসডিপিও, ডিউটি করছে বাঙালি পুলিশ। আমরা বাপ-বেটা আর ঠাকুর মা পোড়া টিনের মধ্যে থেকে কিছু টিন কুড়িয়ে এনে একটি ছাপরা তুলে ফেললাম কোনও রকমে দোকানদারী করার জন্য। ভিতরেও একটি ছাপরা তুলে থাকা শুরু করলাম আমরা তিন জন। আমাদের পাশের বিশ্বজিৎ দত্তদের বাড়ি দখল করে নিয়েছিল মফিজ তালুকদারের দারোয়ান রমজান বিহারি। সে আমাদের অভয় দিল যে, যেকোনো সমস্যা হলে সে দেখবে। তার দেওয়া সাহসেও আমরা কিছুটা সাহস পেলাম শহরে থাকার, যেমন জলে পড়লে খড়কুটা ধরে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। বিশ্বজিৎ দত্তদের ভিতরের বড় ঘরটি ছিল অক্ষত, সে ঘরে বিভিন্ন লুটের স্তুপ করে রাখা ছিল। 

এদিকে, কয়েকদিন পর দোকানের মালামাল আর পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে টাংগাইল যাই। সেখানে অন্য ভাইয়েরা আগের মতো কিছু মালপত্র কিনে রেখেছে, এ ছাড়াও শহর থেকে আরো মালপত্র কিনে আনি দোকান চালানো জন্য। সে সময় সঙ্গে নিয়ে আসি আমার ছোট ভাই আশুতোষকে। সে বাবার সঙ্গে দোকানদারী করতে শুরু করে। আর আমি টাংগাইল থেকে মালপত্র এনে দিতে থাকি। অন্যদিকে আমার পিসতুতো ভাই শ্যামল চারাবাড়িতে পরিবারের দেখাশোনা ও মালামাল সংগ্রহ করতে থাকে দোকানের জন্য।

একদিন এসডিপিও অফিসে পাকিস্তান মিলিশিয়ার কয়েকজন জোয়ান আসে সাতটি গুলির পেটি নিয়ে। এসডিপিও অফিসে সে গুলির পেটি রেখে যাদের দিয়ে গুলি বহন করানো হয়েছিল তাদের বিদায় করা হয়। মিলিশিয়ারা কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে আবার গুলির পেটি নিয়ে যাবে কালীবাড়ির ক্যাম্পে। জিরানো শেষে আবার গুলির পেটি বহন করার জন্য লোক ধরা শুরু হয়। ৬ জনকে ধরার পর বাবাকেও বলা হয় যে, ঐ পেটি নিয়ে যেতে হবে। বাবা দোকান ছেড়ে বাড়ির ভিতরে আসেন শার্ট গায়ে দেওয়ার জন্য। এ কথা শুনে ঠাকুর মা আমি কান্নাকাটি করে বাবাকে ঠ্যাকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু বাবার ভাব, গেলে কী হবে? কালীবাড়ি গিয়ে পেটি নামিয়ে দিয়েই চলে আসবে। আমাদের কান্নাকাটির ফলে বাবার বের হতে একটু দেরি হয়। বাইরে এসে দেখি, এসডিপিও অফিসের কেরানি অন্য একজনকে ধরে গুলির পেটি পাঠিয়ে দিয়েছেন, ফলে বাবাকে আর যেতে হলো না। সেদিন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

এদিকে, স্বাধীনতার চূড়ান্ত সময় চলে আসে। শৈলাবাড়ির যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ আমরা শুনতে পাই শহরে বসে। এ সময়ে তটস্থ হয়ে পড়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা। শোনা যেতে থাকে, যেকোনো সময় পাকসেনারা চলে যাবে শহর ছেড়ে। ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাই আমরা। পরে জানতে পারি, মাড়োয়ারি পট্টির অয়্যারলেস টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিস্ফোরক দিয়ে।

এর আগে আমজাদ বিহারির খোঁজে আসে পাকসেনারা। তারা আমজাদ বিহারিকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলে। কিন্তু সে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না। ঐ রাতে রেলগাড়িতে করে বিদায় নেয় সিরাজগঞ্জ থাকা পাকসেনারা। পরদিন সকালে লুটের মালপত্র রেখে ঘরে তালা দিয়ে স্ত্রী আর মেয়ে শরীফুনকে নিয়ে বিদায় নেয় অবাঙালি আমজাদ বিহারি। এর কিছুক্ষণ পর থেকেই গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে শহরে ঢুকে পড়তে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ। জয় বাংলা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সিরাজগঞ্জ শহর।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম

ও/ডব্লিউইউ

Published: Sat, 13 Jun 2020 | Updated: Sat, 13 Jun 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : শফিকুল ইসলাম টুক্কা

আমার বাবা মারা যান ১৯৬১ সালে। আমার বয়স তখন তিন/সাড়ে তিন। সে হিসেবে আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে। আমি শফিকুল ইসলাম টুক্কা। পিতার নাম মজিবর রহমান ও মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। গ্রাম: সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার জানপুরে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার বয়স ১৩/১৪ বছর। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মা আমাকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন। সে সময় মা আমাকে নিয়ে ওঠেন তার বাবা একই গ্রামের শুকুর শেখের বাড়িতে। আমি বড় হতে থাকি নানা-মামার বাড়িতে। একটু বড় হলে মা আমাকে নানা বাড়ির সামনেই রাস্তার ধারে বসিয়ে দেন বাদাম, বুটকালাইয়ের দোকান দিয়ে। বেচাবিক্রি কী হতো তা জানি না, কিন্তু তাতে মায়ের হয়তো দু’চার পয়সা আয় হতো, কিন্তু আমরা চলতাম নানার সংসারেই।

একাত্তরের অসহয়োগ আন্দোলনের সময় গ্রামের সব মানুষের সাথে শহরে মিছিল করতে আসতাম, এতে আমার খুব আনন্দ হতো। ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে সে কথা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ভীতিকর অবস্থা শুরু হতে থাকে। গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে যে, পাকসেনারা সিরাজগঞ্জ শহরে চলে আসতে পারে। এ ভীতিকর অবস্থায় অনেকেই শহর ছাড়তে শুরু করে। আমাদের নানা-মামার পরিবারেও এ নিয়ে আলোচনা চলতে শুরু করে। কারণ আমাদের শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকার মতো কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই, কোথা ও যাওয়ার জায়গা নেই।

২৭ এপ্রিল পাকসেনা সিরাজগঞ্জ আসার দু’এক দিন আগে সিরাজগঞ্জ বয়রাঘাটে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করে। সেখানে এক রিক্সা চালক ও এক ঘোষ শহীদ হন। অন্যদের সঙ্গে আমিও শহীদদের দেখতে যাই। তাদের দেখে আসার পরে বাড়ির সবাই প্রস্তুতি নেই গ্রামের দিকে চলে যাওয়ার জন্য। নিজেদের কোনও আত্মীয় না থাকায় বাড়ির বাৎসরিক কামলা হবির বাড়ি শাহানগাছা গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিবারের যা কিছু বহনযোগ্য সেসব মালামাল এবং গরুছাগল নিয়ে পরিবারের সবাই রওনা হই হবির বাড়ি শাহানগাছার দিকে। তার এক-দুইদিন পরেই সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা এসে দখলে নিয়ে আগুন দেয়। আমরা শাহানগাছা গ্রাম থেকে সে আগুন ও আগুনের ধোঁয়া দেখতে পাই।

সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা দখলে নিয়ে অত্যাচার শুরু করে। গণহত্যার বিভীষিকাময় কথাবার্তা গ্রাম থেকেই শুনতে পাই। এর মধ্যেই কেউ কেউ শহরে এসে ঘুরে যাচ্ছে। এতে আমাদেরও সাহস একটু বাড়ে। প্রায় কুড়ি দিন পর একদিন আমি আর রফিক মামা গ্রামে আসি বাড়ির অবস্থা দেখার জন্য। সেদিন বাড়ির কাঁঠাল গাছ থেকে বেশ কিছু কাঁঠাল নিয়ে শাহানগাছা ফিরে যাই। একই দিনে এক পুড়িয়ে দেওয়া দোকানের ছাইয়ের মধ্যে বেশ কয়েক আনা পয়সা কুড়িয়ে পাই। তা নিয়ে গিয়ে গেলে মা খুব খুশি হন। এরপর এক-দুই দিন পরপরই মামার সাথে শহরে আসতে শুরু করি। আমার শুরু হয় পোড়া দোকানের ছাইয়ের মধ্যে পয়সা খোঁজার কাজ। মামার সঙ্গে এসে কখনো মামার সঙ্গে কখনো বা একা একা পয়সা খুঁজে ফিরতাম। সবই পেতাম খুচরা পয়সা। কারণ নোট তো পুড়ে গেছে, কিন্তু খুচরা পয়সাগুলো আগুনে পুড়েও টিকে আসে। কোনও কোনও দিন পেতাম একটাকা দেড় টাকা কখনো বা দশ টাকার খুচরা পয়সাও কুড়িয়ে পেয়েছি। যেদিন বেশী পয়সা পেতাম সেদিন আনন্দে মনটা নেচে উঠতো। আমি সব পয়সা মায়ের হাতে তুলে দিতাম। মা এ সব পয়সা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেন। চালডাল কেনা ছাড়াও মা দুধভাতের ব্যবস্থা করতেন ব্যবস্থা করতেন সে পয়সা দিয়ে।

শহরে এসে জানপুরে নিজের বাড়ির অবস্থা দেখে ভিক্টোরিয়া স্কুলের পাশ দিয়ে ঢুকতাম শহরে। ওই রাস্তা দিয়ে চলে আসতাম চৌরাস্তা, সেখান থেকে শহরের অন্যান্ন জায়গায় যেতাম। ভিক্টোরিয়া স্কুলের মধ্যে বেশ কিছুদিন পাকসেনারা ক্যাম্প করে ছিল, সেখানে পাকসেনা ও রাজাকারদের দেখেছি। সত্যনারায়ণ সারদা সতিয়াদের বাড়িতে রাজকার, আলবদরের ক্যাম্প করা হয়েছিল। সেখানে আলবদর-রাজাকারদের আড্ডা দিতে দেখেছি। এ ছাড়াও পাকসেনা ও রাজাকারদের সিরাজগঞ্জ কলেজে। তাছাড়াও শহরের মধ্যে বড় পুলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে রাজাকারেরা রাইফেল কাধে নিয়ে ডিউটি করতো।

ছবি : অভিযাত্রা

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় আমাদের পরিবার শাহানগাছার হবির বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ছিলো। শেষের দিকে এসে গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়ে। সবাই তখন আলোচনা করতো, তাড়াতাড়িই দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধে গোলাগুলির আওয়াজ পাই শাহানগাছাতোই।

অবশেষে সিরাজগঞ্জ থেকে ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনারা পালিয়ে যায়, মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। এর দুতিন দিন পরেই আমরা পুরো পরিবার শাহানগাছা থেকে চলে আসি সিরাজগঞ্জ শহরে। শহরে এসে ভিক্টোরিয়া স্কুল, সিরাজগঞ্জ কলেজ সহ বিভিন্ন স্থানে দেখতে পাই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ভিক্টোরিয়া রাজাকারদের দেখেছি আটকে রাখতে, যারা ক’দিন আগেও শহরময় দাপটের সাথে ধুরে বেড়াতো।

[শফিকুল ইসলাম টুক্কা- চৌরাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান করেন। বর্তমানে এক কন্যা দুই পুত্র সন্তানের জনক।]

অনুলিখন : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম

ও/এসএ/

Published: Fri, 20 Mar 2020 | Updated: Fri, 20 Mar 2020
Published: Mon, 16 Mar 2020 | Updated: Mon, 16 Mar 2020

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছে। খুঁজে ফিরেছে নিরাপদ আশ্রয়, স্বজনরা স্বপ্ন দেখেছে দেশ যেন হানাদার মুক্ত হয়; যারাই এ স্বপ্ন নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে আমি তাদেরই একজন। 

আমি হাসান আনোয়ার, জন্ম- ১৯৫৩ সালের ১৮ জুলাই। পিতা- করম আলী শেখ, ছোটখাট ব্যবসা করতেন। মাতা- লাবনী বেওয়া গৃহিনী। গ্রাম- দিয়ারধানগড়া, সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকা। পড়াশোনা তেমন না করতে পারায় ১৯৬৮ সালে বাবা আমাকে সন্ধ্যা স্টোরে ইলেকট্রিক কাজ শিখতে দেন। কিন্তু একটি ছোট দুর্ঘটনার কারণে বাবা সেখান থেকেও ছাড়িয়ে নিয়ে পাঠিয়ে দেন খুলনায়। সেখানে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করি মোহসীন জুট মিলে।

সিরাজগঞ্জ থাকতেই আমি মোজাফ্ফর ন্যাপ সমর্থক, খুলনা গিয়ে সহজেই সম্পৃক্ত হই সে দলের সঙ্গে। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে যোগাযোগ গড়ে ওঠে খুলনার প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আশরাফ আলী ভাইয়ের সঙ্গেও। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন, বন্ধ হয়ে যায় মিলকারখানা। মোহসীন জুট মিল খুলনা শহর থেকে দূরে হওয়ায় আমরা মিল এলাকায় প্রতিদিন মিছিল করি, শ্লোগান তুলি স্বাধীনতার পক্ষে। 

এ সময় খুলনায় বিহারী বাঙালি ‘রায়ট’ শুরু হয়। আমরা সে খবর পেতাম মিলে থেকেই। এর মধ্যেই ২৫ মার্চ ঢাকাসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকাগুলোতে নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায় পাকবাহিনী। এতে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ পরিস্থিতিতে বিদেশ-বিভূঁইয়ে পড়ে থাকা ঠিক নয় বলে মনে হয়, আমরা সিরাজগঞ্জের লোকজন খুলনা ছেড়ে রওনা হই বাড়ির দিকে।

২৭ মার্চ আমরা সিরাজগঞ্জের ১৪ জন রওনা দেই নিজ এলাকার দিকে। দীর্ঘ হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের আসতে হয় নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে। পথে পথে পাকবাহিনীর নির্যাতনের চিহ্ন, কোনও কোনও গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লাশ পড়ে আছে, বিশেষ করে যশোর নওয়াপাড়ায় অনেকগুলো লাশ আমরা দেখতে পাই। আবার পাকসেনাদের প্রতিরোধের চিহ্নও চোখে পড়েছে সহজেই। এমন দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের চলার পথে সাধারণ মানুষ যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তা অতূলনীয়। 

পথের মানুষকে ডেকে নিয়ে ডাল-ভাত খাওয়ানো, রাতে আশ্রয় দেওয়া, পরের দিন কোন পথে যেতে হবে তা দেখিয়ে দেওয়া- এভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছে সাধারণ মানুষ। মোট ছয় দিন হেঁটে হেঁটে সিরাজগঞ্জ চলে আসি আমরা, তখনো মুক্ত সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর বাঙালিদের প্রতিরোধ চেষ্টার স্মৃতি নিয়ে ফিরে এসে শুনতে থাকি নানা গুজব। শোনা যায়, অমুক জায়গায় বিহারীরা নির্বিচারে হত্যা করছে বাঙালিদের, সর্বস্ব হারিয়ে এলাকায় ফিরে আসছে তারা। 

বাঙালিদের অনেকেই বিহারীদের ওপর মারমুখী হয়ে উঠতে থাকে, ফলে খুলনার মতোই বাঙালি-বিহারী ‘রায়টের’ আভাস পাওয়া যায়। ভীতসন্ত্রস্থ মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপস্থিতিতে একদম শেষ মূহুর্তে কিছু উগ্র মানুষ বিহারীদের হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করে। সেদিনই আমরা পরিবারের সবাই শহর ছেড়ে চলে যাই শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামে। সেখানে আমাদের আশ্রয় দেয় এক অনাত্মীয় পরামত্মীয় হয়ে। পরের দিন সে গ্রামে থেকেই জ্বলতে দেখি সিরাজগঞ্জ। গোলাগুলির শব্দও পাওয়ায় যায়।

নানা গুজব গুঞ্জণ শুনতে শুনতে কয়েক দিন পর শহরের পরিস্থিতি বুঝতে, নিজেদের বাড়িঘরের অবস্থা দেখতে চলে আসি সিরাজগঞ্জে। গ্রামের ঢোকার সময় দেখা হয় গ্রামের মাহমুদ নামের একজনের সাথে। সে শহর থেকে কিছু লুটের মাল নিয়ে যাচ্ছিল। সে জানালো, মিলিটারি আসার আগে থেকে শহরে লুটপাট শুরু হয়। যে যেখান থেকে পারছে, মালামাল লুটে নিচ্ছে। শহরে যাওয়া যাবে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো, মাথায় সাদা পট্টি লাগাতে হবে, তাহলে পাকবাহিনী মনে করবে যে তুমি বিহারী, তাহলে ওরা তোমাকে কিছু বলবে না। 

খুলনায় থাকার সময় বেশ ভালোই উর্দু রপ্ত করেছিলাম, সে সাহসে মাহমুদের সহযোগিতায় মাথায় পট্টি বেঁধে নিলাম, আল্লা ভরসা করে রওনা হলাম শহরের দিকে। রেললাইন পার হতেই দেখলাম, সেখানে (বর্তমান উপজেলা তহশিল অফিস) পড়ে আছে এক বাঙালির গুলিবিদ্ধ লাশ। ভয়ে ভয়ে রওনা হলাম সিরাজী সড়ক ধরে, মোক্তারপাড়ার মোড় পার হওয়ার সময় দেখি দুই সেনাসদস্য আসছে এদিকেই। ওদের দেখেও না দেখার ভান করে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু ওরা এসে ধরে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, মাকান কিধার? আমিও বলি, ইস শহরমে। ‘যায়েগা কিধার?’ ‘ইধার।’ ওরা আর কিছু বলে না। 

কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাই জিন্নাহ রোডের (বর্তমান এসএস রোড) মোড়ে পড়ে আছে আরো একটি লাশ। বড় বাজারের কাছাকাছি যেতেই দেখলাম, বড় পুলের দিক থেকে একটি জিপ গাড়ি এগিয়ে আসছে। তখন ঘুরে রওনা হলাম বড় পোস্ট অফিস ধরে। কাপুড়িয়া পট্টির মাঝামাঝি এসে ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলাম বাড়ির পাশের গলি দিয়ে হাঁটা দিলাম রেললাইনের দিকে। লাইনে ওঠার আগেই দেখলাম, একটু বাক্স পড়ে আছে, কিন্তু তা অনেক ওজনের জিনিষপত্রে ঠাঁসা। ওটা রেখে চলে এলাম গ্রামের পীর সাহেবের বাড়ির সামনে। সেখানে পীর সাহেবের বেশ কিছু মুরীদ- যাদের কয়েক জন স্থানীয় হলেও বেশীর ভাগই বাইরের লোক। তাদের জানালাম বাক্সের কথা। ওরা বাক্সটি এনে খুলে দেখলো, তা গুলিতে ঠাঁসা। সেদিনই ফিরে এলাম চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামে।

শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনের পর তাদের কথায় কেউ কেউ শহরে আসতে শুরু করে। আমাদের গ্রামে অন্যের বাড়িতে থাকার চেয়ে নিজের বাড়ি শহরতলীতে ফিরে আসি। একদিন গ্রামের আব্দুল বারীর বাবা সবদের আলীকে ধরে নিয়ে যায় সোলেমান বিহারীর ভাইসহ দুই বিহারী। আবু তাহেরের চাচা ফেদু মুন্সীকেও ধরে নেয় বিহারীরাই। আরেক দিন আমার মামা ফটিক আলী শেখ, আমালু শেখ ও রাখালকে ধরে নিয়ে যায় আবুল মেম্বার, সাত্তার মেম্বারসহ পীরের মুরীদেরা। পরের দিন মামাকে খুঁজতে যাই জেলখানার ঘাটে। দেখতে পাই মামার মামার লাশ পড়ে আছে নদীর কুলে। কিন্তু সে লাশ ছুঁয়ে দেখার সাহস পাই না। এ সময় মিলিশিয়া এসে ধমকাধমকি করায় চোখের পানি ফেলে চলে আসি সেখান থেকে।

আমি জানি যে, আমাদের দল মোজাফ্ফর ন্যাপ স্বাধীনতার পক্ষে, তাই ভিতরে ভিতরে দলের নেতাদের খোঁজ করতে থাকি। খবর পাই যে, আমাদের নেতা রেজাউল করিম সূর্য ও জাহেদুল ইসলাম রন্টু আছেন রন্টু ভাইদের গ্রামের বাড়ি কামারখন্দ থানার চৌদুয়ার গ্রামে। খবর পেয়ে আমি, একরাম, সালাম ও লাল চলে যাই সে গ্রামে। দেখা হয় সূর্য ভাই আর রন্টু ভাইয়ের সঙ্গে। তারা ধমকাধমকি করলেন। বললেন যে, ‘বিশ্বসেরা’ পাকিস্তান সেনাবাহিনী সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতা অসম্ভব ব্যপার।’ নেতাদের কথায় হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি শহরে। 

এদিকে, কষ্টেসৃষ্টে শহরে থেকেই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার খবর পাচ্ছিলাম। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বড় ধরণের যুদ্ধের আশংকা করি। সিরাজগঞ্জ শহরকে ঘিরে, তখন আবারো চলে যাই চন্ডিদাসগাঁতীর সেই অনাত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে। সেখান থেকেই খবর পাই সিরাজগঞ্জ শহর মুক্ত হওয়ার।

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম
 

Published: Sun, 01 Dec 2019 | Updated: Wed, 11 Dec 2019

কমান্ডার শহীদের অপারেশন

‘তখন আমার বয়স সতের বছর। এসএসসি পাস করে জগন্নাথ কলেজে সবে ভর্তি হয়েছি। পাঞ্জাবী-পায়জামা পরতাম। চিবুকে হালকা দাড়ি। উর্দু ভালো বলতে পারতাম। নামাজ কাজা করতাম না। একবার ধরা পড়েও ওই উর্দু ভাষা, দাড়ি আর পোশাকের কারণে ছাড়া পোয়ে যাই। এ ধরণের ক্যামোফ্লেজের কারণেই সহযোদ্ধারা আমাকে মাওলানা বলে ডাকত। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে আমাদের ক্যাম্পে ঢাকা প্লাটুনের আমি ছিলাম সেকেন্ড ইন কমান্ড। সে জন্য ওরা আমাকে টু আইসি মাওলানা বলে ডাকত’।

কথাগুলো বলেছিলেন মাহবুব আহমেদ শহীদ। একাত্তরে গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় প্রথম যে দলটি আসে তিনি ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। তিনিই সর্বপ্রথম ঢাকায় গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হানাদার বাহিনীকে আতঙ্কিত করে তোলেন। ওই অপারেশনে তিনি ব্যবহার করেন প্রায় ২৫ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ। এছাড়া গুলিস্তান সিনেমা হলের কাছে সে সময় ঢাকার বিখ্যাত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চোচিংচো’তে, চকবাজার মোড়, পাকমোটরের (এখন বাংলামোটর) কাছে দারুল কাবাবঘরে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তোলপাড় কাণ্ড সৃষ্টি করেন তিনি।

চোচিংচো আর দারুল কাবাবঘর ছিল সে সময়ের হানাদার পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম আড্ডাস্থল। তার বিস্ময়কর ও দুঃসাহসিক সেসব অপারেশনের ঘটনা এখনো তার সহযোদ্ধা বন্ধুদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণের অন্যতম বিষয়। যুদ্ধকালীন কমান্ডার ৬১ বছর বয়সী মাহবুব আহমেদ শরীফ ওরফে টুআইসি মাওলানা এখন যুদ্ধদিনের অনেক ঘটনার দিন-তারিখ, সহযোদ্ধা অনেকের নাম ভুলতে বসেছেন। যুদ্ধ শেষে আবার ফিরে গিয়েছিলেন ছাত্রজীবনে। রাজনীতি তাকে টানেনি। লায়ন্স ক্লাবের মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন। সেই সঙ্গে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ব্যবসা। স্ত্রী ও ২ সন্তান নিয়ে এখন যাপন করছেন প্রায় নির্ঝাঞ্ঝাট জীবন।

মাহবুব আহমেদ শহীদ বলেন- “সে সময় আমাদের বাসা ছিল বকশিবাজারের উর্দু রোডে। বাবা হেমায়েতউদ্দিন ছিলেন পিডব্লিউর একজন কর্মকর্তা। আমরা পাঁচ ভাই ও এক বোন। ভাইদের মধ্যে আমি ৪র্থ। ৭ মার্চের পর ঢাকায় তখন ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক অবস্থা। আমরা সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে ঢাবির ফজলুল হক হলের সামনে প্যারেড করতাম। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের ঘটনাও দেখলাম। বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণাও শুনলাম। যুদ্ধে তো যাবই। কিন্তু কোথায় যাব সে সিদ্ধান্ত তখনো নিতে পারিনি। তবে ধারণা ছিল আমাকে ভারতের আগরতলা যেতে হবে।

“আমি এবং মহল্লার আরো ক’জন বন্ধু- এদের মধ্যে ছিল জালাল (বিএমএ’র বর্তমান সভাপতি ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন), জিয়া ও সামসু- এপ্রিলের শেষের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিই। প্রথম দফায় আমি আর শামসু যেতে পারিনি। শাসসু অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমার অভিভাবকরা কিছুটা বাধ সাধলেও আমার বোন আফরোজা ছিল আমার সিদ্ধান্তের পক্ষে। পরের সপ্তাহে, অর্থাৎ মে মাসের প্রথমদিকে আমি আর শামসু আগরতলা পৌঁছাই। আলম এবং ঢাকার অন্য সঙ্গীরাও তখন সেখানে পৌঁছে গেছে। আমাদেরকে নিয়েই মতিনগরে শুরু ঢাকার ছেলেদের প্রথম ক্যাম্প। ক্যাম্পটি ছিল সীমান্তের কাছে। পরে হানাদার বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় ওই ক্যাম্প কিছুটা ভিতরে মেলাঘরে স্তানান্তর করা হয়।

“এক মাসের মতো প্রশিক্ষণের পর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা ঢাকা অপারেশনের অ্যাসাইনমেন্ট পাই। সাধারণভাবে আমাদের প্রত্যেককে গ্রেনেড আর বেয়নেট দেয়া হয়। কিছু পরিমাণ এক্সপ্লেসিভ ছিল। যদ্দুর মনে পড়ছে, ২টি সাব মেশিনগান দেয়া হয়েছিল। প্রায় ১০০ মাইল হাঁটতে হয় আমাদেরকে। পরিচিত কোন পথ ধরে নয়, গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে, কখনো নৌকায় খাল-বিল পেরিয়ে অবশেষে ঢাকায় পৌঁছাই। ওই পথ পাড়ি দিতে বৃষ্টিতে ভিজেছি, ভেজা কাপড় শরীরেই শুকিয়ে গেছে।

“তারিখটা ঠিক মনে পড়ছে না, জুনের ৮/৯ তারিখের দিকেই হবে, আমি প্রথম অপারেশন চালাই চোচিংচো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। কাপড়ের ব্যাগে আমের আড়ালে গ্রেনেড নিয়ে স্কুটারে রওনা হই গুলিস্তানের দিকে। বিকালের ঘটনা। রেস্টুরেন্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেনেড ছুড়ে দিই। স্কুটার চালক মনে হয় কিছু সন্দেহ করেছিলেন। পিন খুলে ফেলার পর লিভারটা লাফিয়ে ওঠার সময় শব্দ হয়েছিল। তবে তিনি স্কুটার থামাননি। বিকট শব্দে গ্রেনেড ফাটার পর ওই স্কুটারেই ফুলবাড়ির রেললাইন অতিক্রম করে যাই।

“এরপর আমার একাকী দ্বিতীয় অপারেশন ছিল চকবাজার মসজিদ মোড়ে। চকবাজার তখন ছিল ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। ওই এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের বিরূপ সমালোচনাও চালু ছিল। মুক্তিযোদ্ধা যে তৎপর একথা মানতে চাইত না ওরা। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল জগন্নাথ কলেজে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে গ্রেনেড ছুড়ব। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পাল্টে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কিছুটা শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করি। চকবাজার মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে সমজিদের দোতলা থেকে চৌরাস্তার মোড়ে গ্রেনেড ছুড়ে দিই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় মুসুল্লিদের জিজ্ঞাসা করি, ‘নিচে কী হয়েছে? শব্দ কিসের? এত হৈচৈ কেন?’ আমার প্রশ্নে উত্তরে একজন ধমকে উঠে বলেন ‘যান যান, আপনের অতো জানার দরকার নাই। মুক্তিরা বোমা মারছে।’ তখন আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়েছিল যে, ঘটনাস্থল থেকে হাফ কিলোমিটার দূরে আমাদের বাসার কাছেও দেখি দ্রুত পালাতে গিয়ে কয়েকটা রিকশা উল্টে গেছে।

“দারুল কাবাবঘরে তৃতীয় অপারেশনে অবশ্য হাজারীবাগের একটি ছেলেকে সঙ্গে নিই। ছেলেটির নাম আবুল। আগের দিন এনায়েতুল হক গামাকে নিয়ে রেকি করে এসেছিলাম। ঢাকায় আসার পর আমি যে কয়জন ছেলেকে ট্রেইন্ড করে তুলি, ও তাদেরই একজন। আমরা ওই অপারেশনে একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। আবুল মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল। আমি পিছনে বসা। সন্ধ্যার পরের ঘটনা। মোটর সাইকেলে বসা অবস্থাতেই কয়েকটি গ্রেনেড হামলা চালানো হয় ওই সময়। শহীদ মিনারের কাছে মন্ত্রীর গাড়ির ভেতর আমার দলের দুই ছেলে গ্রেনেড ছুড়ে মারে। মন্ত্রী এতে গুরুতরভাবে আহত হন এবং ওই হামলার খবর বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকায় প্রচার হয়”।

১৯ অক্টোবরের গাড়িবোমা হামলা সম্পর্কে মাহবুব আহমেদ শহীদ বলেন, ‘ওই অপারেশন ছিল ভারত থেকে ঢাকায় আমার দ্বিতীয় দফায় আসার পরের অপারেশন। তবে মাসটি অক্টোবর না সেপ্টেম্বর তা মনে করতে পারছি না। মেলাঘর থেকেই ওই অপারেশনের পরিকল্পনা হয়। ৫০ পাউন্ড মতো এক্সপ্লোসিভসহ ৪/৫ জন ছেলেকেও পাঠানো হয় আমার সঙ্গে। তখন ২ নম্বর সেক্টর থেকে একসঙ্গে এক দেড়শ’ গেরিলা যোদ্ধা ঢাকার আশপাশ এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা হত। ওই ধরনের একটি দলের সঙ্গে আবারও আমার দীর্ঘযাত্রা শুরু হয়। যাত্রাপথে এক সময় পাকিস্তান আর্মি ও ইন্ডিয়ান আর্মির ক্রসফায়ারের মধ্যেও পড়ি। একবার গাইডের ভুলে পড়ি বিলের মধ্যে। ৫০ পাউন্ডের এক্সপ্লোসিভের ব্যাগ পানিতে ভিজে আরো ভারি হয়ে যায়। অনেক ধকলের পর অবশেষে নৌকায় চেপে বাড্ডা দিয়ে ঢাকায় পা রাখি। ওই অপারেশনে আমি সহযোগিতা নিই আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু বংশালের ছেলে মাসুদের। তিনি এখন কানাডায়। মাসুদ গাড়ি চালাতে পারতেন। অপারেশনের প্রয়োজনে ধানমন্ডি থেকে বিএডিসির একটি গাড়ি হাইজ্যাক করি আমরা। ওই সময় আজাদও (রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী) আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমার নির্দেশে এনায়েতুল হক গামা বড় দুই বোমা বানিয়ে রেখেছিলেন।

‘গাড়ি হাইজ্যাকের পরপরই রওনা হই মতিঝিলে হাবিব ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। চলন্ত অবস্থাতেই গাড়ির মধ্যে বোমা সেট করি। ৫০ পাউন্ডের মধ্যে ব্যবহার করি অর্ধেকটা। হাবিব ব্যাংক (বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক) আর শিল্প ব্যাংকের মাঝের যে প্যাসেজ- সেখানে গাড়ি রেখে ফিউজ চার্জ করে নেমে আসি। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে আরেকটা গাড়ি অপেক্ষায় ছিল। ওই গাড়িটি কার ছিল এখন আর মনে করতে পারছিনা। আমাদের গাড়ি ঘটনাস্থল ছেড়ে যখন শাপলা চত্বরের কাছে তখনই প্রচণ্ড শব্দে আশেপাশের অনেক গাড়িও বিধ্বস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ব্যাংক ভবনও। পরে শুনেছি আমাদের মামা মে অ্যান্ড বেকার কোম্পানীর আখতার সাহেবের গাড়িও ওই বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছিল’।

Published: Wed, 13 Nov 2019 | Updated: Thu, 30 Jan 2020

একটা সফল অপারেশন করে ঢাকায় ঢুকে যাই

 বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ এনায়েতুল করিম খান

১৯৭১ সালে ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের বাসা লালবাগে। ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী পলাশী ফায়ার সার্ভিস, জগন্নাথ হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ ঢাকায় যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় সে ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ভয়ে আমরা পরদিন ২৬ মার্চ সকালে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে ওপারে জিঞ্জিরায় চলে যাই। দু’দিন থাকার পর আবার লালবাগের বাসায় চলে আসি। স্কুল বন্ধ, বাইরেও থমথমে অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে একদিন সকালে এলিফ্যান্ট রোড থেকে আমার ফুপাত ভাই মাসুম ইকবাল এলেন আমাদের বাসায়। গল্প করতে করতে মাসুম ভাই আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, চল আমরা যুদ্ধে যাই- আমরা যুদ্ধ না করলে তো দেশ স্বাধীন হবে না এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ হবে না। তার কথা শুনে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। আর তখন তো আমার বয়স মাত্র ১৬ বছর। তার কথা ও উৎসাহে রাজী হয়ে গেলাম। আর আমার রক্তের ভিতরেও কেমন ঢেউ খেলে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবো। কিন্তু কিভাবে যাবো- মাত্র দু’জন মানুষ। বাসা থেকেও আমাদেরকে যেতে দেওয়া হবে না। এটা আমরা জানি। তারপর সকালে একটা ছোট্ট চিঠি লিখে রেখে বাসা থেকে বেরিয়ে ‘রাজার’ রিকশা নিয়ে এলিফ্যান্ট রোডে আসি। আমাকে দেখে মাসুম ভাই খুশি হলেন।

আমরা যাত্রা করলাম কুমিল্লা বর্ডারের দিকে। কারণ ঢাকা থেকে কুমিল্লা দিয়ে ত্রিপুরা প্রবেশই সহজ মনে করেন মাসুম ভাই। সেদিন ৩১ মার্চ কিংবা ১ এপ্রিল। আমরা বাসে যাচ্ছি। বাস কুমিল্লা যাওয়ার আগেই পাক সেনাদের দু’টি চেক পোস্ট লক্ষ্য করলাম। একটি মেঘনা ঘাটের কাছে অন্যটি ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে। প্রথম চেকপোস্টে আমাদের বাস থামিয়ে পাক সেনারা একজন করে যাত্রীকে বাস থেকে নামায় এবং চেক করে আবার বাসে উঠতে দেয়। শুধু একজনকে অর্থাৎ মাসুম ভাইকে ওরা সন্দেহ করে দাঁড় করিয়ে রাখে। তাকে কিছুতে ছাড়বে না তারা। ছেড়ে দেওয়ার জন্য বাসচালকসহ করলেই অনুরোধ করে এবং মাসুম ভাই নিজেও বলেন, ‘কুমিল্লায় আমার বোনের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি’। তাতেও কাজ হচ্ছে না। প্রায় ঘন্টা খানেক পর যখন বাস ধীরগতিতে কুমিল্লার দিকে যাচ্ছে তখন হঠাৎ করে মাসুম ভাইকে পাক সেনারা ছেড়ে দেয় এবং উনি বাসে এসে উঠেন।

বাস আমাদের কুমিল্লায় গিয়ে পৌঁছে দেয়। আমরা গোমতীর পাড়ে এক জায়গায় বাস থেকে নামি। আমাদের সঙ্গে নামেন সেখানকার স্থানীয় একটি পরিবার। ওদের সঙ্গে ওখানেই পারিচয় হয়। ওদেরকে বলি, আমরা অমুক গ্রামে যাব- এখান থেকে কিভাবে যায় যায়? ওরা বললেন, গোমতীতে তখন করফিউ চলছে। পাক আর্মিরা টহল দিচ্ছে, যে কোন সময় ফায়ার করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আমরা গোমতী পার হলাম। আমি সাঁতার জনতাম না- তাই স্থানীয় এক লোক কাছে থেকেই চারটি কলাগাছ কেটে নিয়ে এলেন। সেই কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে আমরা পার হই। পার হয়ে সেখান থেকে গোকুল নগর নামক সীমান্তবর্তী একটি জায়গায় একটি বাড়িতে উঠি। ওই বাড়িটির এক অংশ ছিল ওপারে ত্রিপুরায়। আমরা ওখানে বিশ্রাম নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কাঁঠাল খেলে আগরতলা চলে যাই। আমরা সেদিনই সীমান্ত অতিক্রম করি।

আগরতলায় একটি ক্যাম্প তৈরী হয়েছিল। কুমিল্লা ত্রিপুরা বর্ডার দিয়ে যারা বাংলাদেশে থেকে যেতো তারা প্রথমে সেখানে গিয়ে উঠত। ক্যাম্পের দায়িত্বে যারা আছেন তারা এসব বাঙ্গালিকে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং-এর জন্য পাঠান। আমরাও গিয়ে সেই ক্যাম্পে উঠি। ক্যাম্পে মাসুম ভাইয়ের পরিচিত একজনকে পাই এবং বলি আমরা যুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নিতে চাই। তারা আমাদের প্রথমে মেলাঘর নামক অন্য একটি মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে পাঠালেন। এখানে আমরা মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর দেখা পাই।

মেলাঘর ক্যাম্পে খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল ওসমানী প্রায়ই আসতেন। এই ক্যাম্পে থেকেই আমরা ট্রেনিং নেই। আমাদের কমান্ডো ট্রেনিং দেন মেজর হায়দার। কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার কারণ ঢাকা অপারেশনের জন্য। বিশেষত ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সকলেই কমান্ডো ট্রেনিং নেন। আমাদের আর্মি ট্রেনিং-এর ক্ষেত্র ছিল আগরতলার মেলাঘরের নিবিড় জঙ্গলে। দীর্ঘ ১ মাস ২০ দিন আমরা ট্রেনিং নেই।

কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার পর আমাদের আরও একটি উচ্চ ট্রেনিং ও চানমারি করার জন্য পাঠানো হয় উদয়নগরের পালাটানায় (ইন্ডিয়ান আর্মিদের ক্যাম্পে)। মেলাঘর থেকে ট্রাকযোগে দূরত্ব ছিল ২ ঘন্টার পথ। এই ট্রেনিং দেন ইন্ডিয়ান আর্মিরা। খুব কঠিন ট্রেনিং ছিল এটি। এই ট্রেনিং শেষে আমরা ৪০ জনের গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করার জন্য আগস্ট মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।

আমাদের গ্রুপে লিডার ছিলেন মোশাররফ হোসেন। তিনি কুমিল্লার, কিন্তু ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তার বাড়ি ছিল। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় প্রবেশ করা। আমাদের সঙ্গে রকেট লাঞ্চার, চাইনজ এলএমজি ১টি, বৃটিশ এলএমজি ২টি, স্টেনগান এবং এক্সপ্লোসিভ, এন্টি-ট্যাংক ও পার্সোনাল মাই, গ্রেনেড ও গুলি ইত্যাদি ছিল। আমাদের প্রথম অপারেশন কুমিল্লার দিঘীর পাড় এলাকাতে। তারপর ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে প্রবেশ করি। আমাদের আগেই বলে দেওয়া ছিল, কিভাবে যেতে হবে, কোথায় গিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নিতে হবে, সব। এই সব নির্দেশ দেন ইন্ডিয়ান আর্মিরা। তারা বলেন, তোমরা ঢাকার নিকটে অবস্থান নেবে এবং এ্যাটাক করবে আর আমরা ওপর থেকে আক্রমণ করবো।

আমরা সেভাবেই একদিন রাতের বেলা বাংলাদেশে প্রবেশ করি। আমাদের সঙ্গে গাইড ছিল। তাকে অনুসরণ করে ঢাকার দিকে এগুতে থাকি। রাত ছাড়া আমরা মুভ করিনি। সীমান্ত থেকে কুমিল্লার ভিতর দিয়ে এসে ময়নামতি ক্যান্টমেন্টের পিছনে অবস্থান নিই। ধান ক্ষেতের আল ছাড়া রাস্তা দিয়ে কখনও মুভ করিনি। আর প্রয়োজন ছাড়া কখনো গোলা-বারুদ খরচ করতাম না। ইমারজেন্সি ছাড়া অপারেশন করা নিষেধ ছিল। আমাদের ৪০ জনের গ্রুপের মতো বড়-ছোট আরও অনেক গ্রুপ ছিল, যারা সকলেই ঢাকার দিকে এগুচ্ছিল। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে আমরা ঢাকার দিকে এগিয়ে যাই। সোনারগাঁও এর উদ্দেশ্যে আমরা এগুচ্ছি।

সোনাগাঁও থেকে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার আগে নদীতে পাক আর্মির টহল লক্ষ্য করি। আমরা এলার্ট হয়ে যাই। যদি গানবোট নিয়ে আমাদের দিকে আসে তাহেল আমরা ফায়ার করব নচেৎ নয়। মরণপণ লড়াই করবো। কিছুতেই ধরা দেব না।

যাক, আমরা চুপচাপ নদী পার হয়ে মুন্সিগঞ্জ দিয়ে ধলেশ্বরী পার হয়ে ধলেশ্বরীর পাড়ে অবস্থান নিই। বেশ ক’দিন এখানে থেকে ঢাকার দিকে আসতে থাকি। ইতোমধ্যে মাওয়া, জিঞ্জিরা এই এলাকার প্রায় পুরোটাই মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। আমাদের মতো অন্যান্য গ্রুপও ঢাকার পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে এবং সব গ্রুপের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব ছিল বুড়িগঙ্গা পার হয়ে ঢাকার বৃহত্তর লালবাগ থানা এলকা দখল করা। আমরা সে অনুযায়ী জিঞ্জিরা থেকে ঢাকার দিকে আসতে থাকি এবং বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে আঁটি বাজারে অবস্থান নিই। এখান থেকে ঢাকার খবরা-খবর নেওয়ার জন্য আমাকে ঢাকার ভেতরে পাঠানো হয়। আমার সঙ্গে খোকন ছিল। সেদিন ১০ ডিসেম্বর। আমি বুড়িগঙ্গা পাড় হয়ে সদরঘাট দিয়ে কিছু রাস্তা হেঁটে কিছু রাস্তা স্কুটারে লালবাগে আমাদের বাসায় আসি। এবং আমি কোন আর্মস নিয়ে ঢুকিনি।

বাসায় থাকা নিরাপদ মনে করলেন না কেউ। তাই দাদীর সঙ্গে আমাকে লালবাগ থেকে এলিফ্যান্ট রোডে ফুপুর বাসায় যেতে হয়েছিল। আমি এলিফ্যান্ট রোডে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত থাকি। এবং সমস্ত খবরা-খবর সংগ্রহ করি। হঠাৎ করে ১৪ তারিখ এলিফ্যান্ট রোডের ওপর ইন্ডিয়ান যুদ্ধ বিমান থেকে পাকিস্তানি আর্মিদের উদ্দেশ্যে শেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে একটি বাসার কাজের মেয়ে ও দুই বাচ্চা মারা যায়। সেদিনই আমি ধানমন্ডিতে আমার আব্বার মামাত ভাইয়ের বাসায় চলে যাই। ঐ বাসায় একটি বাঙ্কারের মতো ঘর ছিল। আমি সেই বাঙ্কারে আশ্রয় নিই, এবং সেখানে থেকে যাই।

১৬ তারিখ ঢাকা শত্রুমুক্ত হলে ১৭ তারিখ ভোর বেলা আমি রওয়ানা হই আমাদের গ্রুপের উদ্দেশ্যে। আমার গ্রুপ বুড়িগঙ্গার ওপারে ১৪ তারিখে বছিলায় একটা সফল অপারেশন করে ১৪ জন পাকিস্তানি বন্দীসহ ঢাকায় ঢোকার পথে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিতে ১১জন শহীদ হন। আমি আমার গ্রুপকে খোলামোড়া ঘাটের এপারে কামরাঙ্গীর চরে তাদের বিদ্ধস্ত অবস্থায় পাই। আমি তাদেরকে কিছু সেবা দেই এবং রাজুর ভাই এর নির্দেশে পাক বন্দীসহ ঢাকার লালবাগে চলে আসি। এবং পাকবন্দীদেরকে পিলখানায় হস্তান্তর করে দেই। একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর শোক আমাকে এখনও আবেগ তাড়িত করে।

Published: Fri, 04 Oct 2019 | Updated: Fri, 04 Oct 2019
Published: Fri, 04 Oct 2019 | Updated: Fri, 04 Oct 2019

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ শিকদারের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ শিকদার তার মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। 

 

 

/এসিএন

Published: Thu, 26 Sep 2019 | Updated: Thu, 26 Sep 2019

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (তৃতীয় অংশ)

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আমাদের প্রশিক্ষণ গেরিলা যুদ্ধের, কিন্তু লাগানো হলো নিয়মিত যুদ্ধে, অথচ এ যুদ্ধে আমরা সত্যি অনভিজ্ঞ। ফলে এ যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায়ই এফএফ যোদ্ধাদের প্রাণ হারাতে হতো। আমরা এফএফদের দিয়ে সীমান্ত যুদ্ধ করানোর ব্যপারে সমালোচনা শুরু করি। এবং কখনো কখনো যুদ্ধে যেতে অস্বীকারও করতে থাকি। একদিন আমাদের ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার ধারণা, কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেন যে, আমরা সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমাদের এই সমালোচনা একদিন বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে, তাই দ্রুত আমাদের দেশের ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ডিফেন্স থেকে ছাড় দিয়ে দেশের ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আমাদের দেশের ভিতরে ঢোকার ২৩ মুক্তিযোদ্ধাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ ২৩ জন হলাম- ১. কুয়াত-ইল ইসলাম, ২. গোলাম মোস্তাফা, ৩. মাহমুদুল আলম, ৪. আব্দুস সামাদ আনসারী, ৫. হাফিজুর রহমান, ৬. এমএ সাত্তার, ৭. শামসুল ইসলাম, ৮. খোরশেদ আলম, ৯. গোলাম সারোয়ার সিদ্দিকী, ১০. রেজাউল করিম, ১১. নুর মোহাম্মদ, ১২. জহুরুল হক রাজা, ১৩. ইদ্রিস আলী, ১৪. দেলোয়ার হোসেন, ১৫. আলতাফ হোসেন, ১৬. মোঃ মোস্তফা, ১৭. আব্দুর রাজ্জাক, ১৮. আলফাজ উদ্দিন, ১৯. মোঃ আলম, ২০. আব্দুর রহমান, ২১. আল-মাহমুদ, ২২. বরাত আলী ও ২৩. অনিল চন্দ্র সরকার।। নাম সম্বলিত তালিকায় স্বাক্ষর করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার এমপিএ ডা. মঈনুদ্দিন আহমেদ। আমরা যখন সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে ঢোকার অপেক্ষায় আছি তখন সোনা মসজিদের কাছে অপারেশনে গিয়ে শহীদ হন বাংলাদেশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নাজমুল।


আমরা ভারতের জলঙ্গী দিয়ে ডিগ্রির চর এলাকায় এসে জনগণের কাছে আশ্রয় নেই। দেখলাম ইতিমধ্যেই ওই এলাকার জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা রপ্ত করে ফেলেছে। গ্রামবাসী বিভিন্ন বাড়ি থেকে চালডাল তুলে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল, কে কোন বাড়িতে থাকবে তার থাকার ব্যবস্থাও তারাই করে দিল। পরের দিন ইলিশ ধরা জেলেদের সহযোগিতা নিয়ে পার হলাম পদ্মা নদী। ঠাঁই পেলাম রাজশাহীর নাটোরের মধ্যে। সেখানে একজন গাইড ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা নিয়ে চলে এলাম চলনবিল এলাকার অষ্টমণীষা মির্জাপুরে। এক গ্রামে আশ্রয়ে থাকার সময় এলাকার লোকজন অভিযোগ করলো যে, গেদু নামের জনৈক ‘মুক্তিযোদ্ধা’ মুক্তিযুদ্ধের দল চালানোর নামে জনগণের কাছে থেকে চাঁদা তুলছে। তার বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগও করলো কেউ কেউ। আমরা ভাবলাম, যদিও এটা আমাদের এলাকা নয়, তবুও এর একটা বিহিত করা দরকার। নইলে মুক্তিযুদ্ধের সমূহ ক্ষতি হবে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে আটক করা হলো। জনসমক্ষে বিচার করে জনগণকে সন্তুষ্ট করে সেখান থেকে বিদায় নিলাম আমরা। এরপর উল্লাপাড়ার নওকর গ্রাম হয়ে আমরা স্থায়ী আস্তানা গড়লাম আমাদের খামার উল্লাপাড়া-সড়াতৈল এলাকায়। 

আগেই বলেছি, আমাদের কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলাম। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯-‘৭০ ছাত্র সংসদ রাকসুর সহ-সাহিত্য সম্পাদক। তিনি এলাকায় এসে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তাব করলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য আমাদের একটা পত্রিকা দরকার। আমরা ভাবলাম, কুয়াত ভাই কবিতা-টবিতা লেখেন, সে বাতিক এ যুদ্ধের সময়ও যায় নি। এখন যুদ্ধের সময় আমরা পত্রিকা করবো কখন? কেউ কেউ দ্বিমত পোষন করলাম, কেউ বা বিরক্তির সঙ্গে নিশ্চুপ রইলাম। তিনি কোথা থেকে একটি প্রেসের খবর নিয়ে এলেন। দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমানের সহযোগিতায় লোক জোগাড় করলেন সে প্রেস আনার জন্য। এক রাতে আমরা সে প্রেস এনে বসিয়ে দিলাম বেলকুচি থানার দৌলতপুর স্কুলের কাছে। পরে দেখেছি, সে প্রেস থেকে অক্টোবরের শেষের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জুলফিকার মতিনের সম্পাদনায় ‘বাংলার মুখ’ নামের একটি পত্রিকা বের হতে। যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রেস থেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের হুশিয়ারী দিয়ে লিফলেটও ছাপা হতো। আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলার মুখ পত্রিকা ও লিফলেট বিলি করেছি। 

আমরা ওই এলাকার কয়েকটি গ্রামে ঘোরাফেরা করি। এতে স্বাধীনতা বিরোধীরা এলাকা ছেড়ে থানা সদরে আশ্রয় নেয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত রক্ষার উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন গ্রামে গ্রাম বৈঠক, ইউনিয়ন বৈঠক, পোস্টারিং, লিফলেটিং করতে থাকি। আমরা চেষ্টা করি জনগণের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য। এদিকে, উল্লাপাড়া স্টেশনের কাছে ছোনতলায় পাক-সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল, তারা অক্টোবরের শেষের দিকে সেখানকার বেশ কিছু যন্ত্রপাতির ক্ষতি করে চলে যায়, এতে আমাদের চলাচলের এলাকা আরো বেড়ে যায়। এ সময় খবর পাওয়া যায় যে, সলপের পাশের বেতকান্দি কামারপাড়ার পাশে অবস্থানরত রাজাকারেরা ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়েছে। খবর পাওয়া পর ওই রাজাকার দলকে ঘেরাও করে ৪০ জন রাজাকারকে ৪০টি থ্রিনটথ্রি রাইফেল সহ আত্মসমর্পন করানো হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে গণআদালত বসিয়ে বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। এতে আমাদের দলে ৪০টি রাইফেল জমা হয়। তখন স্থানীয় ভাবে রিক্রুট করা দল বড় করা হয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে বড় দল কাম্য নয়। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আমাদের দলে থাকা অন্য এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা চলে গিয়ে তাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করবে। এ সিদ্ধান্তের পর উল্লাপাড়ার বঙ্কিরহাটের আব্দুস সামাদ, উল্লাপাড়ার দেলোয়ার, উল্লাপাড়ার ঘাইটনার ইদ্রিস, কাজীপুরের মানিকপটলের আলতাব স্ব স্ব এলাকায় চলে যায়। 

আমাদের গেরিলা গ্রুপের মতোই আরো কয়েকটি গ্রæপ ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে মালিপাড়া পাক-বাহিনী ক্যাম্পে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারিখ নির্দ্ধারণ হয় ২৬ নভেম্বর। এ আক্রমনে যুক্ত হন আব্দুল হাই, আব্দুস সামাদ এবং আমরা সহ আরো কয়েকটি গ্রুপ। আমাদের যুদ্ধের কৌশল ছিল পাক-সেনাদের ওপর আক্রমন করে ভীত-সন্ত্রস্থ করে নিজেদের কোনও ক্ষতি হতে না দিয়ে ফিরে আসা। আমরা সেটাই করি। পরের দিন সকালে খবর আসে যে, পাক-সেনারা মালিপাড়া ক্যাম্প ছেড়ে সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে চলে গেছে। আমরা রাস্তায় তাদের আক্রমনের উদ্যোগ নেই, কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে তারা আগেই পার হয়ে চলে যায়। আমরা তখন মালিপাড়া গিয়ে সেখানে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেই। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে খবর পাওয়া যায় যে, নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক ধরে পাক-সেনাদের বিভিন্ন গ্রুপ ঢাকার দিকে চলে যাচ্ছে। আমরা তাদের ওপর আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেই। আমরা তালগাছীর মাকড়কোড় গ্রামের পাশে নগরবাড়ী-বগুড়া সড়কের নিরাপদ দূরে ট্রেন্স খুঁড়ে পজিশন নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ জনের একটি গ্রুপকে আসতে দেখা যায়। কাছাকাছি এলে তাদের ওপর গুলিও চালানো হয়। কিন্তু তারা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রাস্তার অপর পাড়ে নেমে পড়ে এবং ডাবল মার্চ করে সেখান থেকে চলে যেতে পারে। আমাদের অনভিজ্ঞতাই হয়তো তাদের বাঁচিয়ে দেয়। 


ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে বিজয়ের শুভক্ষণ। ১৬ ডিসেম্বর, আমরা সেদিন চরনবীপুর গ্রামে শেল্টার করে আছি, সে গ্রামেই আমরা খবর পাই যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা বিজয়োল্লাস করতে করতে শেল্টার থেকে বেড়িয়ে আসি। এবং প্রকাশ্যে এসে সেদিনের মতো ক্যাম্প করি চরনবীপুর স্কুল প্রাঙ্গণে। 

সকল মুক্তিযোদ্ধা প্রকাশ্যে চলে আসে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এলাকার প্রধান মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প হয়ে ওঠে এনায়েতপুর বেতিলে। আমরাও সেই ক্যাম্পে যোগ দেই। এর মধ্যে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের পর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের মহুকুমা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। ফিরে যাই কলেজে।  
[সমাপ্ত]

 

/এসিএন

Published: Thu, 12 Sep 2019 | Updated: Thu, 12 Sep 2019

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (দ্বিতীয় অংশ)

[পূর্ব প্রকাশের পর]
মোহনপুরের কাছে গিয়ে রেললাইনে উঠি। সে লাইন ধরে হাঁটতে থাকি ঈশ্বরদীর দিকে। কিন্তু সে পথে চলা তখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, চলনবিল তখন বর্ষার পানিতে ভরে গেছে। রেললাইনটি শুধু জেগে আছে, সে রেললাইনে মাঝে মধ্যেই পাক-বাহিনী রেলইঞ্জিন নিয়ে টহল দিতে আসে। তারা এসে পড়লে রেললাইন ছেড়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই, নির্ঘাত ধরা পড়তে হবে তাদের হাতে। তবুও আগে পিছে দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকি আমরা ৬ জন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। আমরা সন্ধ্যার পর গিয়ে দিলপাশার স্টেশনে পৌঁছি। কিন্তু ওখান থেকে রেজাউলের আত্মীয় বাড়ি নৌকা ছাড়া পৌঁছা সম্ভব নয়। একজন মাত্র দোকানদার বসে আছে, সে জানালো, আর কিছুক্ষণ পরে ঈশ্বরদী থেকে পাক-বাহিনী ইঞ্জিন নিয়ে আসবে, তাই এখান থেকে এখনই সরে না পড়লে ধরা পড়তে হবে পাক-বাহিনীর হাতে। 

কিভাবে নৌকা পাবো এ চিন্তায় আমরা দিশেহারা হয়ে নৌকা খুঁজতে থাকি। কাছেই একটা জেলে নৌকা পাওয়া যায়, কিন্তু সে এখন নিয়ে যেতে পারবে না। বাধ্য হয়ে তাকে ভয় দেখাই, সে তখন পার করে দিতে রাজী হয়। আমরা নৌকায় উঠে রওনা হওয়ার দুদণ্ডের মধ্যেই চলে আসে রেলইঞ্জিনটি। আমরা অল্পের জন্য পাক-সেনাদের হাতে ধরা পড়া থেকে বেঁচে যাই। দূরত্বের কারণে রেজাউলদের সঙ্গে এ আত্মীয় বাড়িতে কোনও যোগাযোগই নেই, ওরা আমাদের পেয়ে খুব খুশি হয়। অনেক আদরযত্ন করে। 

পরের দিন সকালে উঠেই রওনা হই রেল লাইন ধরে। গুয়াখাড়া স্টেশনের কাছে গিয়ে রেললাইন ছেড়ে হাঁটতে থাকি পশ্চিম দিকে। দয়ারামপুুর জমিদার বাড়ি পার হয়ে এবার খুঁজতে থাকি টুনিপাড়া শহীদুলের আত্মীয় বাড়ি। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পাওয়া গেল সে বাড়ি। তাদের থাকার ঘর একটাই, সে ঘরের মেঝেতেই কাঁথা বিছিয়ে সবার থাকার ব্যবস্থা হলো। আবার ভোরেই রওনা হলাম তাদের অনেক অনুরোধ সত্বেও, কারণ আমরা তো নিমন্ত্রণ খেতে আসিনি, যত তাড়াতাড়ি পারি আমাদের সীমান্ত পার হতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে আবার রেললাইন, আব্দুলপুর স্টেশনের পাশ দিয়ে রেললাইন পার হয়ে আমরা চলে এলাম রাজশাহী জেলার চারঘাটের কাছে পদ্মা নদীর কাছে। আমাদের সবার কাছে টাকাকড়ির অভাব, অনেক খুঁজে সস্তায় একটা নৌকা পাওয়া গেল। তাতে পদ্মা পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভারতের নদীয়া জেলায়। নাম লেখালাম কেচুয়াডাঙ্গার বিধানচন্দ্র বিদ্যানিকেতনে স্থাপিত ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেতে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে। পাবনার ছিল বকুল, সাইদুল, শফি, রাজ্জাক সহ অনেকেই। এর সপ্তাহ দুয়েক পরেই একদিন ৬০/৭০ জন ছেলে নিয়ে ক্যাম্পে এলেন শাহজাদপুরের এমপি আব্দুর রহমান। তিনি এসে দু’তিন দিন পর আমাদের শত খানেক তরুণকে নিয়ে গেলেন বেড়ার এমএনএ অধ্যাপক আবু সায়ীদের বালুরঘাট কামারপাড়া ক্যাম্পে। কিন্তু তিন দিন পরই আবার ফিরে আসতে হলো আগের ক্যাম্পে। এই টানাহেঁচড়ার মধ্যে ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরে গেল শহীদুল। আবার কয়েকদিন পরই আগের ক্যাম্প শিফট করে আমাদের চলে আসতে হলো পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে।

পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে সকাল-বিকাল প্যারেড পিটির পাশাপাশি চলতে লাগলো প্রশিক্ষণের জল্পনা কল্পনা, কবে আমাদের হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে এসব। একদিন হঠাৎ করে ক্যাম্পে হাজির হলেন আমাদের সঙ্গী সরোয়ারের বাবা আবু বকর, তিনি তার ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছেন এখানে। তার আগে কোলকাতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের খুঁজে বের করে এ ক্যাম্পের নাম পেয়েছেন। তিনি সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকলেন, এলাকার পরিস্থিতি, সবার বাড়ির খবর জানালেন। বিকেলের দিকে অশ্রু সজল চোখে আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিলেন।

১৪ আগস্ট আমাদের ইয়ুথ ক্যাম্পে একটি টিম এলো হায়ার ট্রেনিংয়ে রিক্রুট করতে। ওই দিনই খুব সহজেই আমরা ৫ জন রিক্রুট হয়ে গেলাম। এখন শুধু মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া, অস্ত্র হাতে এলাকায় ফিরে যাওয়া আর শত্রু হননে মেতে উঠে দেশকে হানাদার মুক্ত করা। পরদিন ১৫ আগস্ট আমরা রওনা হলাম হায়ার ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে। আমরা সমতলের মানুষ, কিন্তু আমাদের যেতে হবে পাহাড়ে। প্রথমে ট্রাকে, তারপর ট্রেনে, আবার ট্রাকে সমতল থেকে আমরা যেতে লাগলাম পাহাড়ের দিকে। সমতলের মানুষ, পাহাড় দেখার উত্তেজনা অনুভূতি আলাদা। 

ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিল শিলিগুড়িতে, তারপর আবার ট্রাকে পাহাড়ের আঁকাবাকা পথে, অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম পানিঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। শুরুতেই নামধাম লিখে আমাদের পড়ার জন্য কিছু কাপড়চোপর, খাওয়ার জন্য একটি প্লেট একটি মগ দেওয়া হলো। আমাদের থাকার  ব্যবস্থা হলো তাবুতে। ঝর্ণার পাশে স্থাপন করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে ঝর্ণার পার  হতে ঝুলন সেতু, যা আমাদের এলাকায় অকল্পনীয়। 

পরদিন শুরু হয়ে গেল ৪০ দিনের প্রশিক্ষণ। ৩৬ গ্রেনেড, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান, সাব-মেসিন গান, মর্টার গান- পর্যায়ক্রমে এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণও হতে লাগলো। সকালে প্যারেড-পিটি, ৮টার দিকে চা-নাস্তা, এরপর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, ১১টার দিকে চা-নাস্তা, ১টা পর্যন্ত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরে গোসল খাওয়া অল্প বিশ্রাম, ৩টার দিকে আবার প্রশিক্ষণ বিকেল পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ চলাকালে বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও পরিচয় হতে লাগলো। সিরাজগঞ্জ মহুকুমারই পাওয়া গেল অনেককে। এর মধ্যে তাড়াশের আমজাদ হোসেন মিলনকে দোভাষী হিসেবে পেলাম আমরা, কারণ সে হিন্দি ভালো বুঝতো। 

শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের সেকশনে ভাগ করে গ্রুপ করে দেওয়া হলো। আমাদের গ্রুপ হলো ২৩ জনের, গ্রুপের কমান্ডার হলেন কুয়াত-ইল ইসলাম। গ্রুপ কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলামের সঙ্গে আমাদের আগে পরিচয় ছিল না, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এসেই পরিচয়। যদিও তিনি আমাদের এলাকারই লোক। তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা এবং তখনকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের সহ-সাহিত্য সম্পাদক। প্রশিক্ষণ শেষে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমাদের পাঠানো হলো মোহদীপুর ক্যাম্পে, সেখান থেকে পাঠানো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের অপর পাড়ে। সেখানে ভারতীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো ভারতীয় ডিফেন্সে। আমরা সেখানে নিয়মিত সীমান্ত পাহারা দিতে লাগলাম, পাশাপাশি রাতে সীমান্ত পার হয়ে পিছন দিক থেকে পাক-সেনাদের ওপর হামলা চালাতাম। 
[চলবে]

 

লেখক- মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ নূরনবী

/এসিএন

Published: Mon, 09 Sep 2019 | Updated: Mon, 09 Sep 2019

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা

[প্রথমাংশ]
তারুণ্যের ধর্মই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। ১৯৭১ সালে সে নেশাই চেপেছিল তরুণদের মাঝে। তাদের বেশীর ভাগই বাড়িতে বাবা-মাকে না জানিয়ে চলে যেতো মুক্তিযুদ্ধে, মেতে উঠতো শত্রু হননে। শাহজাদপুরের আগনুকালী গ্রামেরও ৬ তরুণ একদিন বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে চলে যায় সীমান্তের ওপারে। এদের ৫ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসে নিজ এলাকায়, মেতে ওঠে শত্রু হননে। বাড়ি থেকে পালানো ওই তরুণদের মধ্যে আমিও একজন। 

আমি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরনবী। আমার জন্ম ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি। আমার পিতা: জুলমাত আলী কৃষিকাজ করতেন। মাতা: জয়নব বেগম গৃহিণী। গ্রাম: আগ নুকালী, ইউনিয়ন: বেলতৈল, থানা: শাহজাদপুর. মহুকুমা: সিরাজগঞ্জ। প্রাইমারি স্কুল থেকে পাশ করে খাস সাতবাড়িয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। উনসত্তুরের ৬ দফা ও ১১ দফার ছাত্র আন্দোলনের সময় আব্দুল লতিফ মির্জা, কোরবান আলী, বাকী মির্জা, গোলাম আজম, শহীদুজ্জামান হেলাল প্রমুখ ছাত্রনেতা আমাদের স্কুলে আসতেন। এরা সবাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ করতেন, আসতেন সিরাজগঞ্জ বা শাহজাদপুর থেকে। এভাবেই স্কুল জীবনে রাজনীতির হাতেখড়ি আমার। ১৯৭০ সালে ওই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে উল্লাপাড়া আকবর আলী কলেজে ভর্তি হই। সত্তুরের শেষের দিকে ১ম বর্ষ অ্যানুয়াল পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করে গ্রামে ফিরে আসি। 

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে সাধারণ মানুষ। তারা মনে করতে থাকে যে পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালিদের আর এক সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। ফলে রাষ্ট্র-প্রশাসনে দেখা দেয় অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব অনুভূত হতে থাকে সর্বত্র। শহরের মানুষ গ্রামে ফিরে আসতে থাকে। আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু জহুরুল হক রাজাও তার পরিবারের সঙ্গে মার্চের শুরুতেই চলে আসে তাদের গ্রামে। দেশের এ পরিস্থিতিতে আমাদের পড়াশোনা লাটে ওঠে, আমরা সব সময় কী ঘটছে না ঘটছে তা জানতে গ্রামের সড়কের পাশে কালীবাড়িতে জমায়েত হতে শুরু করি। সেখানে এক দোকানে রেডিও ছিল, তা থেকে খবর শোনার জন্য গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা জমায়েত হতো। রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতো সেখানে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ভাষন শোনার জন্য গ্রামের সবাই ভেঙ্গে পড়ে কালীবাড়িতে, কিন্তু সেদিন ভাষণ প্রচার না হওয়ায় সবাই হতাশ হয়ে পড়ি। পরের দিন সকালে আমরা সে ভাষণ শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষনাকে স্বাধীনতার ঘোষণা, আর অন্য সব কিছুকে কৌশল মনে হয় আমাদের। গ্রামে-গ্রামে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি।   

আমাদের এলাকায়ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু হয়। আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে এগিয়ে আসেন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আব্দুস সোবহান। প্রশিক্ষক হিসেবে আরো এগিয়ে আসেন ইপিআর সদস্য আলতাব হোসেন, তিনি তখন ছুটি নিয়ে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। প্রথম অবস্থায় বাঁশের লাঠি হাতে বিকেলে আমরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি। গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ জন তরুণ প্রশিক্ষণ নিতে থাকি। একই সময় সাতবাড়িয়া হাই স্কুল মাঠেও শুরু হয় প্রশিক্ষণ। 
দিন গড়াতে থাকে। ২৫ মার্চে গভীর রাতে ঢাকায় নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা। ঢাকা, চিটাগাং, রাজশাহী, খুলনা থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। আমরা গ্রামের তরুণেরা কালীবাড়ি রাস্তার পাশে ভিড় করে তাদের কাছে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নানা অত্যাচারের খবর সংগ্রহ করতে থাকি। পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা বিশেষ করে পানি খাওয়ানো, প্রয়োজনে ক্ষুধার্তের আহার জোগানোর কাজে সহযোগিতা করতে থাকি আমরা। এ সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পূর্ণই ভেঙ্গে পড়ে, এলাকায় বেড়ে যায় ডাকাতের উপদ্রব, বিশেষ করে যে সব তাড়া খাওয়া মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরছিল তাদের ওপর। তখন রাত জেগে পাহারা, দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের রাত যাপন ও নিরাপত্তার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করি আমরা গ্রামের তরুণেরা। 

২৫ এপ্রিল বাঘাবাড়ি ও বগুড়ার দিক থেকে নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক দখলে নেয় পাক-বাহিনী। থমথমে অবস্থা নেমে আসে আমাদের এলাকায়। তখন সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া আর কোনও বিকল্পই খোলা থাকে না। আমরাও খুঁজতে থাকি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পথ। এ ব্যপারে আমরা তরুণেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করি। অবশেষে আমরা ৬ জন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হই। ৬ জন হলাম আমি, জহুরুল হক রাজা, রেজাউল করিম লেবু, শহীদুল ইসলাম, গোলাম সরোয়ার ও আব্দুস সাত্তার। এদের মধ্যে আমরা ৫ জন আগ-নুকালি গ্রামের আর আব্দুস সাত্তারের বাড়ি খামার উল্লাপাড়া গ্রামে। আমরা খবর পাই যে, সাতবাড়িয়া গ্রামের শফি ও রাজ্জাক সীমান্তের ওপারে গিয়েছিল, এদের মধ্যে শফি বাড়ি ফিরে এসেছে। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং কোন রাস্তায় যাওয়া যাবে তার একটা ধারণা নেই। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সীমান্তের ওপারে যাওয়ার প্রাথমিক রাস্তা ঠিক করে ফেলি। নিজেদের যাওয়ার পথের ছকে কোথায় কার আত্মীয়বাড়ি বা পরিচিত জন আছে তা-ও খুঁজে বের করি যাতে যাওয়ার পথে ব্যবহার করতে পারি সেসব বাড়ি। আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে, আমরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে কারো বাড়িতে জানাবো না, তাহলে বাড়ি থেকে বাঁধা আসতে পারে। আবার চলে যাওয়ার পরে বাড়ির মুরুব্বিরা যেন নিশ্চিত হতে পারে যে আমরা সীমান্তের ওপারে চলে গেছি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। যাতে কারো পরিবার আমাদের পালানো নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় না পড়ে। 

জুন মাসের শেষের দিকে আমরা ৬ জন গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বের হই যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। আমাদের কারো কাছে লুঙ্গি-গামছা ছাড়া বাড়তি তেমন কিছু নেই। তবে রাস্তায় ক্ষুধা লাগলে যাতে খেতে পারে সে জন্য কেউ সঙ্গে নিয়েছে ছাতু, কারো আছে চিড়া। আর ৫/১০টাকা করে যার যা সামর্থ আছে সে নিয়েছে, তবে কুড়ি টাকার ওপরে কারো কাছে নেই। গ্রাম পার হয়ে আমরা মিলিত হই, হাঁটতে থাকি তালগাছীর দিকে। হাঁটতে থাকি আর পিছনে তাকাই আমাদের কেউ দেখে ফেললো কিনা? কিছু দূর যাওয়ার পর হুড়াসাগর নদীর কাছাকাছি এসে দেখতে পাই যে, আমাদের পিছু নিয়েছে রাজার বাবা আব্দুল করিম মোক্তার সাহেব। কিন্তু আমাদের কোনোক্রমেই ধরা পড়া যাবে না যে, আমরা সীমান্তের ওপারে যাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সবাই মিলে ঠিক করে ফেলি যে, আমরা হুড়াসাগরে এসেছি, বর্ষার নতুন পানিতে গোসল করব। যা ভাবা তাই কাজ। নেমে পড়লাম হুড়াসাগরে। রাজার বাবাও কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা তাকে জানালাম, বর্ষার নতুন পানিতে গোসল করে বাড়ি ফিরবো। তিনিও আমাদের সঙ্গে নেমে পড়লেন গোসলে। কিন্তু আমরা কমবয়সী মানুষ, আমাদের তো ক্লান্তি নেই। আমাদের ভাবটা এমন যে, চোখ লাল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ গোসল থামবে না। রাজার বাবা বয়স্ক মানুষ, এক সময় হার মানলেন। নদী থেকে উঠে বললেন, তোমরা গোসল সেরে বাড়ি চলে এসো, আমি চলে গেলাম। আমরাও এটাই চাচ্ছিলাম। তিনি উঠে অনেক দূর যাওয়ার পরে আমরা নদী পার হয়ে অন্য পাড়ে উঠে পড়লাম। এদিক সেদিক দেখে গাড়াদহর কাছে নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক পার হয়ে রওনা হলাম মোহনপুরের দিকে, কারণ আমরা প্রথম দিনের শেষে রাত পার করবো দিলপাশারের কাছে মাগুড়া গ্রামে আমাদের সঙ্গী রেজাউলের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। 
[চলবে]

 

লেখক- মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ নূরনবী

 

/এসিএন

Published: Sat, 20 Jul 2019 | Updated: Sat, 20 Jul 2019

টুনিরহাটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি...

[তৃতীয় পর্ব]
রাস্তার দু’পাশের ধান ক্ষেত কুয়াশায় ঢাকা থাকায় সামনের জনকে দেখার যাচ্ছে না। তবুও শীতের রাতে হেঁটে চলেছি আমরা প্রায় তিরিশ মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর গাইড জানালো আর বেশি দূরে নয় টুনিরহাট। টুনিরহাটের এক পাশে ডাঙ্গার হাট, অপর পাশে খোকার হাট। মাঝখানের টুনিরহাটে শত্রু সেনাদের ক্যাম্প। 

একটা ছোট্ট খাল। শীতকাল বলেই হয়তো খালটি শুকনা খটখটে। খালটা পাড় হতেই হঠাৎ থমকে গেলাম আমরা সবাই। সামনেই মাত্র দশ হাত দূরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানি দস্যূরা। ফলইন করিয়ে হয়তো তাদের ডিউটি ভাগ করা হচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম সবাই, এক ঝটকায় ওদের সুযোগ না দিয়েই খালের আড়ে পজিশন নিলাম, ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের কেউ এক জন পিন খুলে ছুড়ে দিল গ্রেনেড। প্রথম সুযোগে আমরা জিতে গেলাম। এবার পিছু হটার পালা। কিন্তু আমাদের বিপত্ত্বি বাধালো ওদের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সেখান থেকে এলএমজির ব্রাস ফায়ার আসতে লাগলো। আমরাও পাল্টা গুলি চালাই আর পিছু হটি, কিন্তু আমাদের এদিক থেকে যদি পাঁচটি গুলি ছুড়তে পারি তো ওরা ছোড়ে শত শত। ফলে ছত্রভঙ্গ হতে হলো আমাদের। 

হাইডে ফিরে এলাম, কিন্তু গুণে দেখা গেল আমাদের দু’জন তখনো ফেরেনি। এক জন ময়মনসিংহের আরশেদ, অন্যজন আমাদের বাহুকার শহীদুল। দুই জন সহযোদ্ধা নিখোঁজ! এটাতো হতে পারে না। ফলে আবার ফিরে যাই টুনির হাটের কাছে। আতিপাতি করে খুঁজতে থাকি সহযোদ্ধা দুজনকে। খুঁজতে খুঁজতে শহীদুলকে পাওয়া গেল একটি ধান ক্ষেতের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু আহত হয়নি। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলা গেল ওকে পেয়ে। 

স্থানীয় এক জন জানালো, পাশেই অন্যজন পড়ে আছে আহত হয়ে, যুদ্ধ হয়েছে সেখানে, হয়তো মুক্তিযোদ্ধাই হবে। সেদিকে ছুটলাম আমরা কয়েক জন। খুঁজে পাওয়া গেল আরশেদকে, তবে জীবিত নয়। এলাকাবাসী জানালো, যুদ্ধ চলাকালে সে এখান দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল, এ সময় তার শরীরে গুলি লাগে। এলাকাবাসী তাকে টেনে তুলে নেয়, স্থানীয়ভাবে হাজারো চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। শহীদ হয় আরশেদ। আমরা এলাকাবাসীর সহায়তায় আশরাফের মরদেহ নিয়ে আসি আমাদের হাইড হিসেবে পরিচিত মধ্যছাতনাই গ্রামে। তারপর তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করি। তখনই মধ্য ছাতনাই গ্রামটি শহীদ আরশেদনগর নামে নামকরণ করা হয়।

দিন গড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে চলে আসি আমরা। ২১ নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে আমাদের মিত্র বাহিনী, যা আগেও ছিল, কিন্তু ঘোষণা দিয়ে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটতে থাকে সীমান্তে, বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বিএসএফ সদস্যরা বলতে শুরু করে, তোমাদের এখন অন্য সেক্টরে পাঠানো হবে। আমরা তখন নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। এর মধ্যে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হামলা চালায় ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে, তাদের বিরোধের স্থান কাশ্মীর সীমান্তে। ফলে যুদ্ধে ভারতে সহযোগিতার লুকোচুরির সমাপ্তি ঘটে। প্রকাশ্যেই নেমে পড়ে ভারত। ফলে সীমান্ত যুদ্ধে এফএফ গেরিলাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। আমরা গোঁ ধরতে থাকি এলাকায় ফিরে যাওয়ার।
 
ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর আমাদের এলাকায় ফিরে যেতে বলা হয়। কারণ, সীমান্ত এলাকা থেকে তখন পাকিস্তানিরা যুদ্ধের চাপে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছিল কেন্দ্রের দিকে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত এলাকায় থাকার আর কোনও প্রয়োজন ছিল না। এজন্য বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাইনকারচর। সম্ভবত ১১ ডিসেম্বর মাইনকারচরে পৌঁছে শুনতে পাই, আহসান হাবীবসহ অনেকেই- যারা এক সঙ্গে এলাকা ছেড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে- তারা কিছুক্ষণ আগেই রওনা হয়েছে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। তারাও নিশ্চয়ই অন্য সীমান্তে আমাদের মতোই যুদ্ধ করে এখন এলাকায় ফিরে যাচ্ছে। আমরাও দেরি না করে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা উঠে পড়লাম নৌকায়। যত দ্রুত সম্ভব এলাকায় ফিরবো, হানাদার মুক্ত করবো নিজ এলাকা। যারা এক সঙ্গে নিজ এলাকায় রওনা হলাম তারা হলো, আমি, আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী (বাহুকা এলাকা), আলতাব, দুলাল, শহীদুল, মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া এলাকা], শাজাহান আলী কালু (বাহুকা), তোজাম (কেছুয়াহাটা)।
 
১৩ ডিসেম্বর সকাল বেলায়-ই নামলাম যমুনা তীর কেছুয়াহাটায়। কারণ, আমাদের সঙ্গে থাকা তোজামের বাড়ি সে গ্রামে। দু’দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ঠিক নেই। এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও জানা দরকার। তাই তোজামের বাড়িতে গেলাম সবাই। তোজামকে ফিরে পেয়ে গ্রামের সবাই খুব খুশি। সেখানে খবর পেলাম, আমির হোসেন ভুলু সিরাজগঞ্জ মুক্ত করতে শহরের দিকে এগিয়ে গেছেন। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা তার সঙ্গে আছে। সকল মুক্তিযোদ্ধাকেই তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে এগিয়ে যেতে বলেছেন। তোজামের বাড়ির লোকজন ততক্ষণে আমাদের খাওয়ার আয়োজন করেছেন, কিন্তু না খেয়েই আমরা ছুটলাম সিরাজগঞ্জের দিকে।
 
ব্রাহ্মণবয়ড়া পর্যন্ত আসতেই নানা কথা শোনা গেলো। এলাকায় নানা গুজব ছড়াতে লাগলো যে, বয়ড়া-বাহিরগোলা রেল লাইনের ধারে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে আমির ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক-সেনাদের। সেখানে নাকি অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আমির ভাই নিজেও অসুস্থ হয়ে খোকসাবাড়ি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর ছিল যে, পাক-সেনারা শৈলাবাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, তারা সিরাজগঞ্জ থেকেও চলে গেছে। কিন্তু রেল লাইনের ওপরে বাঙ্কার করে পাক-সেনারা তখনো ছিল, তা মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেনি। সেখান থেকে নাকি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানিরা ধরেও নিয়ে গেছে।
 
জানা গেল, সেখানে শহীদ হয়েছেন অন্তত ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আহসান হাবীবের মরদেহ করব দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার বাড়িতে। আমরাও ছুটলাম সেখানে। বিপুল মুক্তিযোদ্ধা-জনতার উপস্থিতিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহ মরদেহ।
 
পরদিন জানা গেল যে, রাতেই সিরাজগঞ্জ থেকে পাক-সেনারা পালিয়ে গেছে ঈশ্বরদীর দিকে। আমরা দলবল নিয়ে জনতার মিছিলের সঙ্গে ছুটলাম শহরের দিকে। বীরদর্পে সিরাজগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়লাম আমরা মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প করে বসলাম ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে, জুট মিল, স্পিনিং মিল ছাড়াও বিভিন্ন পরিত্যাক্ত বাসাবাড়িতে।

পাকিস্তানি প্রশাসনে কর্মরত পুলিশ, রাজাকার ও সরকারি কর্মচারীরা হয় পালিয়ে গেছে অথবা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে আছে। এ ভাবেই ভেঙে পড়েছে পাকিস্তানি প্রশাসন। সেখানে চালু করা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন। সে প্রশাসনে বিভিন্নভাবে আমাদের কাজ করানো হতে লাগলো। এক সময় ভিক্টোরিয়া স্কুলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমাদের জায়গা করে দেওয়া হলো জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে। 

প্রবাসী সরকার ফিরে এলো ঢাকায়, তাদের পক্ষ থেকে চালু হলো প্রশাসন, নিউ মার্কেটে স্থাপন করা হলো মিলিশিয়া ক্যাম্প। বিভিন্ন চাকরিতে যোগদানের জন্য আমাদের বলা হলো, মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগদানের জন্য, কিন্তু আমরা তো তখনো ছাত্র, আর ততদিনে খুলে ফেলছে স্কুল-কলেজ।  আমি স্কুলে ফিরে যেতে জ্ঞানদায়িনী স্কুলের ক্যাম্প থেকে বিদায় নিলাম জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে।

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা।  

অআই

Published: Sat, 20 Jul 2019 | Updated: Sat, 20 Jul 2019

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে শত্রুবধের অভিযান

[দ্বিতীয় পর্ব]

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চমৎকার গ্রাম নতুন বন্দর। গ্রামের সামনে দিয়ে সীমান্ত থেকে রৌমারীর দিকে চলে গেছে হেরিংবোন করা সড়ক। সে সড়কের পাশে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল, স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। স্কুলের পুব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট নদী। সে স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু ১ শ’ ৪ জনের স্থান সংকুলান হলো না স্কুল ঘরে, পরে কয়েকটি তাঁবুরও ব্যবস্থা হলো, তাঁবু গাড়া হলো স্কুলের মাঠের মধ্যে। অবরুদ্ধ এলাকা থেকে মুক্ত এলাকায় এসে থাকার জায়গা পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম আমরা সবাই। এখন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবেই। বিশেষ করে যখন আমাদের নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারকে পাওয়া গেছে। সেদিনের খাওয়া অবশ্য যার যার ট্যাঁকের পয়সা খরচ করেই করতে হয়েছিল। 

রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই সবাই, কেউ স্কুল ঘরের মধ্যে, কেউবা স্কুল মাঠের মধ্যে তাঁবুতে। কিন্তু রাতেই হঠাৎ বিপত্তি বাঁধলো। তা হলো, পাহাড়ি বন্যায় হঠাৎ প্লাবিত হলো এলাকা। আমরা যারা স্কুল ঘরে ঠাঁই পেয়েছিলাম, তাদের কোনও অসুবিধা হলো না, বিপদে পড়লো যারা ঠাঁই নিয়েছিল তাঁবুতে। মাঠে মধ্যে পানিতে টইটুম্বুর হয়ে তা তাঁবুতে ঢুকে পড়লো। এমন হঠাৎ বন্যার মোকাবেলা আমরা কোনও দিনও করিনি। ফলে যারা তাঁবুতে ছিল তাদের কাপড়চোপর বা সঙ্গে যাই ছিল, সবই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। তারা সারারাত ঘুমাতে পারলো না। পরের দিন সকালে তালুকদার সাহেব আরো কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন, আমাদের দুরবস্থা দেখে আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজ করলেন। আমাদের ব্যবস্থা হলো, পাকিস্তানি পুলিশদের পালিয়ে যাওয়ায় পরিত্যক্ত রৌমারী থানায়। আমাদের সে থানায় গিয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত থানাটিতে কেউ থাকতো না, কর্মরতরা সবাই হয় পালিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিল অথবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। 

আমরা গেলাম রৌমারী থানায়, শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রাখার রৌমারী ক্যাম্প। প্রথমে আমাদের সিরাজগঞ্জের আমাদের ১ শ’ ৪ জন নিয়ে শুরু হলো বলে এ ক্যাম্প নিয়ে আমরা গর্বিত। খুব দ্রুতই ক্যাম্প মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে ভরে উঠলো। তবে, শুরুতে যে কোনও বিষয়ই থাকে অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত পর্যায়ে, এখানেও তাই ছিল। খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন, মোতাহার হোসেন তালুকদারের বড় ভাইয়ের ছেলে, জহুরুল ইসলাম তালুকদার, তিনি সিরাজগঞ্জ মুকুল ফৌজের সংগঠক ছিলেন। রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন এসডিও অফিসের গাড়িচালক নুরু ভাই। খাবারের অব্যবস্থাপনাই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিকমতো সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত রান্নাই হতো না, ফলে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে। দিনে এক বেলা তো দূরের কথা, সপ্তাহে তিন/চার দিন খাবার জুটতো কিনা সন্দেহ। খাবার না পেয়ে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে, কিন্তু তার সহ্য ক্ষমতা দারুণ, তিনি কখনো আমাদের ওপর রাগ করতেন না, বোঝানোর চেষ্টা করতেন তার অসহায়ত্ব। তারপরেও প্রতিনিয়ত সে ক্যাম্পে শরীর চর্চা হতো, এটা করাতেন চিলগাছার কামাল ভাই, তাকে আমরা মিলিটারি কামাল বলে জানতাম। 

শুরুটা যত কষ্টই হোক, আমাদের একটা সৌভাগ্য যে, হায়ার ট্রেনিংয়ের রিক্রুটের একটি টিম চলে এলো মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই। ফলে ইয়ুথ ক্যাম্পের ভোগান্তি কম ভুগেই আমরা গেলাম মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এখন শুধু স্বপ্ন দেখা, কবে প্রশিক্ষণ শেষ হবে, অস্ত্র তুলে দেবে আমাদের হাতে, আমরা এলাকায় ফিরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হননে মেতে উঠবো। আমাদের শপথ বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, দেশকে শত্রুমুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। আমরা আরো শপথ নিতাম স্বাধীনতা অথবা মৃত্যুর। 

আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো দার্জিলিয়ের মুক্তিনালা মুজিব ক্যাম্পে। এটি ভারতের একটি ক্যান্টনমেন্টের পাশে অবস্থিত। এ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন প্রিন্স চৌহান, মেজর র‌্যাঙ্কের। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন প্রেমাংশু। এখানে শুধু আমরাই নই, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার শত শত তরুণ এসেছে প্রশিক্ষণ নিতে। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শর্ট কোর্সের একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়। তাতে অংশ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালও। যাই হোক, সেকশন, প্লাটুনে ভাগ করে প্রতিদিন সকালে প্যারেড-পিটি, তারপর নাস্তা, তারপর আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরের খাবার, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ। এতে আমরা যারা একই এলাকায় এক জোট ছিলাম, তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম। আমাদের দলে আমরা কয়েকজন রয়ে গেলাম এক সাথে। যারা এক সঙ্গে রয়ে গেলাম তারা হলাম আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী [বাহুকা], আলতাব [বাহুকা], দুলাল [বাহুকা], মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া], শাজাহান আলী কালু [বাহুকা], শহীদুল ইসলাম [বাহুকা], আমির হোসেন [বেতুয়া], হাসেম [বাহুকা], তোজাম [কেছুয়াহাটা]।

আমাদের ধারণা ছিল প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র, প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ দিয়ে পাঠানো হবে নিজ এলাকায়, কিন্তু তা পাঠানো হলো না, আমাদের পাঠানো হলো রংপুরের হাতীবান্ধা সীমান্ত এলাকায়। 

আমরা ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। আমাদের মূলত থাকতে হতো বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে, কোথাও মুক্ত এলাকা, কোথাও অবরুদ্ধ এলাকা। মুক্ত এলাকায় থাকলেও পাক-হানাদার বাহিনীর দখল করা এলাকায়, স্বাধীনতাবিরোধী ও পাক-হানাদার বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ফিরে আসতে হতো আশ্রয়ে, যাকে আমরা ‘হাইড’ বা লুকিয়ে থাকার জায়গা বলতাম। এভাবে আক্রমণ করার কারণ পাক-বাহিনী যেন মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে সব সময়। সুযোগ পেলে দিনে অথবা রাতে আমরা এসব হামলা চালাতাম। আমরা সাধারণত ছোট ছোট গ্রুপে এসব হামলা চালাতাম। কিছুক্ষণ গোলাগুলি করেই আবার ফিরে আসতাম নিরাপদ আশ্রয়ে। এসব আশ্রয়কে আমরা বলতাম হাইড বা পালিয়ে থাকার স্থান। আমাদের এসব হামলায় সহযোগিতা করতো রাস্তাঘাট চেনা স্থানীয় গাইডেরা। তারাই পথ দেখিয়ে অপারেশনে নিয়ে যেত, আবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসতো। আর আমাদের সকল কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করতেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিএসএফ ক্যাম্পে, সেখান থেকে ভারতের ভিতরের কোনও হাসপাতালে। আমাদের খাবারের ব্যবস্থা, হাত খরচের টাকা-পয়সা দেওয়া হতো বিএসএফ থেকেই। আমরা অপারেশন করতাম প্রধানত রংপুর এলাকার হাতীবান্ধা, বড়খাদা, সিংড়িমারী, বাওরা, ডিমলা এলাকায়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের প্রায় তিরিশটি ছোটবড় অপারেশনে অংশ নিতে হয়েছে। তবে টুনির হাট যুদ্ধের কথা কোনও দিনও ভুলবার নয়।
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়, শীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে প্রায় সারাদিন। চার হাত দূরের মানুষকে দেখা যায় না। এতে এক দিকে সুবিধা, পাক-হানাদার বাহিনী সহজে আমাদের দেখতে পায় না। আবার সেটাই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, কারণ আমরাও তাদের দেখতে পাই না। সেদিনের এমনি এক বিপদে আমাদের পড়তে হয়েছিল টুনিরহাট পাক-সেনা ক্যাম্পে হানা দিতে গিয়ে। স্থানীয় গাইড এসে জানালো যে, টুনিরহাটে জনা তিরিশেক পাক-সেনা অবস্থান করছে, রাজাকারও আছে ২০/২৫ জন। এলাকার মানুষ তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট। এলাকাবাসী চায় যে, ওই পাক-সেনা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা করে তাদের তাড়িয়ে দিক। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম, টুনিরহাট পাকিস্তানি ক্যাম্পে হানা দেবো, আধা ঘন্টা গোলাগুলি করে আবার ফিরে আসবো হাইডে অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়ে। প্রস্তুত হলাম আমরা জনা তিরিশেক মুক্তিযোদ্ধা। রওনা দিলাম গভীর রাতে। 

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।

এসএ/

Published: Fri, 19 Jul 2019 | Updated: Sat, 20 Jul 2019

প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারত যাত্রা

[প্রথম পর্ব]

ঊনসত্তরের ছাত্র আন্দোলন জনগণের মধ্যে ছাত্রদের একটি ভিন্ন ধরণের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। জনগণ মনে করতে থাকে যে, ছাত্ররাই তদের রক্ষাকর্তা। ফলে জনগণ যেখানে অন্যায় সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ছাত্রদের উস্কে দিতে থাকে। ছাত্রদের দ্বারা এমনি এক সামাজিক অনাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহসী হয়ে উঠি। হয়ে উঠি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। 

আমি মোফাজ্জল হোসেন বানু, জন্ম: ১৯৫৬ সালের ১৮ মার্চ। পিতা: বাহারুদ্দিন সরকার, তিনি কৃষিকাজ করতেন। মাতা: সাহেরা খাতুন গৃহিণী। আমরা ৩ ভাই ২ বোন। ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। গ্রাম: মেছড়া মল্লিকপাড়া, ইউনিয়ন: মেছড়া, থানা: সিরাজগঞ্জ সদর। 

১৯৭১ সালে আমি কাজীপুর থানার সোনামুখী ইউনিয়নের হরিনাথপুর হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় আমাকে জায়গীর থাকতে হতো স্কুলের পাশের বাঘবেড় গ্রামে। আমি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন ছাত্রলীগ নেতা মেছড়ার বাছেদ ভাইসহ আরো কয়েক জন ছাত্রলীগ নেতা যান হরিনাথপুর হাই স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে। সেদিনই আমি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। 

যুক্ত হই ঊনসত্তরের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনে। এ সময়ে গ্রামের স্কুলগুলোতেও নিয়মিত মিছিল হতো, সে মিছিল প্রদক্ষিণ করতো আশপাশের গ্রামগুলো। তখন বাঙালিরা প্রচন্ড আইয়ুব বিরোধী হয়ে উঠেছিল। ফলে ছাত্ররা হয়ে ওঠে জনগণের নয়নের মনি। এ সময় বিডি মেম্বর চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধেও তাদের গম চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ছাত্ররা। সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের টাউট বাটপারদের বিরুদ্ধেও। 

এমনি একটি বড় ঘটনা ঘটে কাজীপুর থানার সোনামুখী ইউনিয়নের বাঘবেড় গ্রামে। সে গ্রামের কতিপয় মানুষ ধর্মের নামে মজমা বসাতে একটি পাড়ায়। সেখানে গাঁজা-ভাঙ সেবন, মাতলামীতো চলতোই, তাছাড়াও নারীদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এরা প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুন মানতো না। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল চুরি-ডাকাতি। এদের কয়েকটি পরিবারের ওপর গ্রামের সাধারণ মানুষ ভীষন ক্ষুদ্ধ। তারা ওই সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের উস্কে দিতে থাকে। 

আমরা হরিনাথপুর হাই স্কুলের ছাত্ররা একদিন সে গ্রামের দিকে মিছিল নিয়ে যাই, উদ্দেশ্য ওই সব সমাজ বিরোধীদের সমাজ থেকে উচ্ছেদ করা। সে মিছিলে যোগ দেয় বিভিন্ন গ্রামের মানুষও। বাঘবেড়ের সেই সমাজ বিরোধীদের ওপর মিছিল থেকে হামলা চালানো হয়। সেদিন ওই সব সমাজ বিরোধীদের অনেকের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, গণপিটুনিতে মারা যায় অন্তত ৭ জন সমাজ বিরোধী। স্বাভাবিক ভাবেই উদ্যোক্তা ছাত্রদের কাঁধেই এর দায়ভাব চেপে বসে। 

এর ক’দিন পরেই আসে ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন। চারদিকে গুজব ছড়াতে থাকে যে, এখন ছাত্রদের ধরে জেলের ভাত খাওয়াবে। আমাদের কয়েক জনকে স্কুলে যেতে বারণ করা হতে থাকে। আমরা হয়ে উঠি স্কুল পালানো ছাত্র। এভাবেই আমার স্কুলের সঙ্গে প্রকাশ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধবান্ধব আর নিজের বাড়িতে পালিয়ে থাকা। আর গোপনে যোগাযোগ রেখে স্কুলের খাতায় ছাত্র নামটি রাখা। এর মধ্যে আসে নির্বাচন। গ্রামে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মতো ভোট চেয়ে বেড়াই। সে নির্বাচনে আমাদের গ্রামের কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। সারাদেশের আওয়ামী লীগের বিজয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি স্কুলে ফিরে যাওয়ার। এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করি সে স্বপ্ন থেকেই। 

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই আবার পূর্ব বাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে। আমরা ছাত্ররা স্বাধীনতার জন্য মাতম করতে শুরু করি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলে পড়ে নিরীহ স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ওপরে। এতে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আমরা ছাত্ররা তো আগে থেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় দাদা এহসান উদ্দিন তালুকদার বললেন, ভালোই হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেহেতু রুখে দাঁড়াতে শুরু করেছিস, যা যুদ্ধে যা, পাকিস্তানিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়া। 

সিরাজগঞ্জে হানাদার বাহিনী আসার পর পরই দল পাকাতে শুরু করলাম, ভারত যাবো, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করবো, স্বাধীন করবো দেশ, যে দেশে কোনও অন্যায় থাকবে না। আমার মতোই অনেকেই এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তখন। জুটে গেলাম সব এক সঙ্গে। নৌকাও ঠিক করা হয়ে গেল, মে মাসের মাঝামাঝি আমরা মোট ১০৪ জন বেতুয়া ঘাট থেকে সে নৌকায় উঠে পড়লাম। 

আমার সহযাত্রীদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলো- শুড়ি মেছড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ, একই গ্রামের নুর ইসলাম, হায়দার আলী, বেতুয়া গ্রামের কাশু খাঁ, আমনমেহার গ্রামের জুলফিকার আলী ভুট্টো, একই গ্রামের আবু বকর, হায়দার আলী, নেহার আকতার, পাটগ্রামের সোলায়মান, কালাইচার হাপ্পা, শুভগাছার চান মিয়া, কাজীপুরের আবুল কালাম আজাদ, খাড়-য়া গ্রামের শহীদ আহসান হাবীব, বাহুকার আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী, একই গ্রামের কালু, দুলাল, শহীদুল ইসলাম এবং চিলগাছা গ্রামের তারিকুল ইসলাম প্রমুখ। প্রায় দুই দিন যমুনা ব্রহ্মপুত্রের উজান ঠেলে পৌঁছে গেলাম রৌমারীর পাশের ভারতের আসাম প্রদেশের মাইনকারচরে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, সে ক্যাম্প খুঁজে পাবো কোথায়?

আমরা চিনতাম শুধু মোতাহার হোসেন তালুকদারকে। তিনি এবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এমএনএ নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায়ই শুনে এসেছি যে তিনি ভারতে চলে এসেছেন। পরে তার পরিবারও চলে এসেছে এই মাইনকার চরে। সিদ্ধান্ত নিলাম তাকেই খুঁজে বের করার। আমাদের আগেই অনেকেই বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে জীবন বাঁচাতে এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। আমরা কয়েকজন নৌকা থেকে নেমে তাদের কাছে মোতাহার হোসেন তালুকদারের খবর নিতে শুরু করলাম। 

তাঁকে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। মোতাহার হোসেন তালুকদারকে খুঁজে পেয়ে বললাম, আমরা এলাকা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে এসেছি, আপনি আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে সিরাজগঞ্জের আরো কয়েকজন ছাত্র ও যুবনেতাকে ডেকে আনলেন। তাদের সঙ্গে আমাদের পাঠিয়ে দিলেন, রৌমারীর পূব দিকের একটি গ্রাম নতুন বন্দরে।

[ চলবে....]
 
মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর যুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে
অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক। 

 

-এম জে

Published: Sat, 29 Jun 2019 | Updated: Sat, 29 Jun 2019

জেল হোসেন মণ্ডলের যুদ্ধকথা

চাষাভুঁষা মানুষ আমি, নাম জেল হোসেন মণ্ডল। বাবার নাম ছাবেদ আলী মণ্ডল।

মায়ের নাম জেলা খাতুন। জন্ম ১৯৪৯ সালে। গ্রাম: তেলকুপি, ইউনিয়ন: খোকসাবাড়ি, জেলা: সিরাজগঞ্জ। 

আমাদের গ্রামটি সিরাজগঞ্জ শহরের একেবারে কাছেই। লেখাপড়া জানতাম না আমি, বাবা কৃষি কাজ করতেন। তাই আমাকেও কৃষিকাজেই যুক্ত হতে হয়। মাঠে যখন কাজ থাকতো না তখন রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজও করতাম। আর জোগালের কাজ করতে গিয়ে ওই বয়সেই ঘুরে বেড়িয়েছি ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর। আমার বয়স যখন মাত্র সতের বছর তখন অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করান। আমার স্ত্রীর নাম শাহিদা খাতুন। 

১৯৬৯ সালে দেশে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। তখন আমাদের পাশের ধীতপুর আলাল গ্রামের মো. আলাউদ্দিন শেখ ছাত্রলীগ করতেন। তিনি মাঝেমধ্যেই আমাদের শহরে মিছিল করতে নিয়ে যেতেন, তাদের সংগঠনের কর্মী সভা হলেও যেতে বলতেন। আমরাও গ্রামের লেখাপড়া জানা বা না জানা তরুণেরা যেতাম, তবে রাজনীতির কিছু বুঝতাম না। মিছিল করতে ভালো লাগতো তাই যেতাম, মিছিলে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে হাঁটলে মনে হতো দেশের জন্য কাজ করছি। এ ভাবেই লেখাপড়া না জানা সত্বেও জড়িয়ে পড়ি স্থানীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আশপাশের গ্রামে দল বেঁধে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বেড়াই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। দেখা যায়, আওয়ামী লীগের এ বিজয় শুধু সিরাজগঞ্জেই নয়, সারাদেশেই সম্ভব হয়েছে। মনে হতে থাকে, এ বিজয় যেন আওয়ামী লীগের নয়, এ বিজয় জনগণের। আমরা জনগণ আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।
 
১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত আমরা ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাঙালিরা পাকিস্তানের ক্ষমতা নেবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু বাঙালিদের সে স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে দেয় পাকিস্তানের সামরিক সরকার ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা। ১ মার্চ সে ঘোষণা করে, ৩ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। জনগণ ভাবে, এটা পাকিস্তানিদের বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র। আবার ক্ষেপে যায় ছাত্ররা। 

রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান ওঠে, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানকে আর কোনও সহযোগিতা নয়। আবার গ্রাম থেকে মিছিল নিয়ে শহরে যাওয়া, গলা ফাটিয়ে স্লোগান তোলা, ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার কথায় কথায় হাততালি দেওয়া শুরু হয়ে গেল আমাদের। সিরাজগঞ্জের এসডিও একে শামসুদ্দিনও আর এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর প্রশাসন ছেড়ে নেমে এলেন জনতার মিছিলে। 

পঁচিশ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালায় নিরীহ বাঙালির ওপর। এ খবরে মিছিলের ঢল নামে শহরে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে মিছিল যায় শহরে, আমাদের গ্রাম থেকেও মিছিল যায় শহর কাঁপাতে। যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তারাও বাঙালিদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোন ক্যাম্প ছিল না, ফলে বিনা যুদ্ধে শুধু মিছিলে মিছিলেই মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। শুরু হয় সিরাজগঞ্জকে হানাদার মুক্ত রাখার তৎপরতা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলায় আক্রান্ত বাঙালিরা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরতে শুরু করে। তাদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। ভীত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এদিকে, প্রচার হতে থাকে যে, যে কোনও দিন পাকিস্তানি মিলিটারিরা চলে আসবে সিরাজগঞ্জেও। এতে ভীতসন্ত্রস্থ সিরাজগঞ্জবাসী শহর থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটে গ্রামের দিকে। আমাদের তেলকুপি গ্রাম শহরের লাগোয়া, আমরাও বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র মাটির নিচে পুঁতে রেখে বাড়ি ছাড়ি, চলে যাই প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে। 

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে ঈশ্বরদী ও সৈয়দপুরের অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে পাক-বাহিনী ঢোকে সিরাজগঞ্জ শহরে। তারা এসেই অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণের মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহর ও তার আশপাশ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ভষ্মিভূত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। শহরতলীর আমাদের গ্রামের প্রায় সব বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বেশ কিছু নারী-পুরুষকেও হত্যা করাা হয় আমাদের গ্রামের মধ্যে। থমথমে হয়ে পড়ে সমগ্র এলাকা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রনেতারা চলে যায় আত্মগোপনে। 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরে আসার পর তাদের সহযোগিতার পথ বেছে নেয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা। আমাদের গ্রামের মুসলিম লীগ, জামায়াত কর্মীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সিরাজগঞ্জের এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার লস্কর শহর ছেড়ে চলে গেছেন তার আগেই। তাহলে পাকিস্তান কাকে দিয়ে চালাবে বেসামরিক প্রশাসন? প্রথমে দোয়াতবাড়ি গ্রামের জনৈক আলী ইমাম নামের এক অবাঙালি, তারপর মুসলিম লীগ নেতা তরিকুল ইসলাম লেবু মিয়াকে এসডিওর দায়িত্ব দিয়ে চালু করা হয় ভেঙে পড়া পাকিস্তানি প্রশাসন। 

তাদের সহযোগিতা করতে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। মুসলিম লিগ, জামায়াত নেতাকর্মীদের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে শহরের মানুষ। আমিও পরিবার-পরিজনের সাথে ফিরি নিজ গ্রামে, কিন্তু বাড়িতেও থাকি পালিয়ে পালিয়ে। চড়ার মধ্যে কাজ করি, পারতপক্ষে বাড়িতে আসি না, রাতে এসে খেয়েদেয়ে অন্য কোনও বাড়িতে গিয়ে থাকি।
  
এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বাররা পাক-বাহিনীকে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। তারাও শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনে সহযোগিতা করতে শুরু করে। আমাদের গ্রামের মেম্বারের ওপর চাপ আসে রাজাকার বাহিনীতে তরুণদের নাম দেওয়ার জন্য। আমাদের এলাকার মেম্বার নামের লিস্ট দেওয়ার সময় আমার নামও ঢুকিয়ে দেয়। এক কান দু’কান করে একথা সহজেই জানাজানি হয়ে যায়। রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চাপে ভীত হয়ে পড়ি। একদিন গ্রামের মুরুব্বী ময়দান প্রামানিক আসেন আমার বাড়িতে। আলাদা করে বাইরে নিয়ে ফিস ফিস করে বলেন- তোর নামতো রাজাকার বাহিনীতে দিছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- কী করবো, বুদ্ধি দেন, আপনে তো আমার মুরুব্বি। তিনি বলেন- গ্রাম ছেড়ে চলে যা, তাও রাজাকারে যাসনে। দরকার পড়লে মুক্তিযুদ্ধে যা, তোদের মতো জোয়ান মানুষ ঘরে বসে থেকে মার খাবি কেন, দেশের কাজে লেগে যা। তাকে বললাম- আমার হাতে তো একটা পয়সাও নেই, এ অবস্থায় কী করবো। তিনি তখন তার পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলেন। বললেন- আমার দেওয়ার মতো এই আছে, তুই এলাকা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যা। বাড়িতে ফিরে রাতে বউকে খোলাসা করে না বলে বল্লাম- মেম্বার সাব আমার নাম রাজাকার বাহিনীতে দিয়েছে, কিন্তু আমি যাব না সেখানে। আমার স্ত্রী আর কী বলবেন, তারও তো বলার কিছু নেই। আসলে তিনিও চান না যে, আমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেই। 
 
সকালে উঠে খেয়েদেয়ে কাউকে কিছু না বলে রওনা হলাম অজানার উদ্দেশ্যে। এক কাপড়েই রওনা হতে হলো, কারণ, বেশি কাপড় নিতে গেলে জানাজানি হবে। বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাবলাম, ইন্ডিয়ায় যাব, যোগ দেব মুক্তিযুদ্ধে। অনেকের কাছেই শুনেছি যে, শুভগাছার যমুনার ঘাট থেকে প্রায় প্রতিদিনই নৌকা যাচ্ছে রৌমারী মাইনকার চরে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। রওনা হলাম সেদিকেই। পথেই দেখা, চন্দ্রকোনার আনোয়ার, খালেক, লুৎফর, টুম্পা, গোলামের সঙ্গে। ওরাও যাবে মুক্তিযুদ্ধে। ওদের পেয়ে সাহস আরো বেড়ে গেল। 

নৌকার মাঝির সঙ্গে মাইনকার চরে যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলো। আমার কাছে পয়সা কম, তবুও নৌকার মাঝি নিতে রাজী হলো। শুভগাছা ঘাটেই দেখা রহমতগঞ্জের ইসমাইল আর জাকিরের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নৌকায় উঠতে যাবো, সে সময় বাঁধা দিলো ইসমাইল (রহমতগঞ্জ)। বলল যে, তোমার রৌমারীতে গিয়ে কোনও লাভ নেই, কারণ ওখানে কমপক্ষে ম্যাট্রিক পাশ ছেলেদেরই ট্রেনিংয়ে নেয়। সেখানে গেলে আবার ফিরেই আসতে হবে। ইসমাইলই ওসমান মাঝিকে দায়িত্ব দেয় আমার থাকার ব্যবস্থা করতে। আর ইসমাইল চলে যায় কয়েকজনকে রৌমারী পৌঁছে দিতে। আমি মাইনকার চর যেতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ি। সেদিনের মতো থেকে যাই শুভগাছার ওসমান মাঝির বাড়িতেই।
 
শুভগাছা থেকে বাড়ির পথ মাত্র এক বেলার, কিন্তু বাড়িতে ফিরতে মন টানে না, কিন্তু যাবো কোথায়? এ আত্মীয় বাড়ি, ও বন্ধুর বাড়ি, আমিনপুর, ফুলকোচা ঘুরে ঘুরে তিন দিন পর ফিরে আসি বাড়িতেই। কিন্তু বাড়িতে থাকি না রাজাকার হওয়ার ভয়ে। সারাদিন চড়ার মধ্যে থাকি, ক্ষেতে কাজ করি, কারো সঙ্গে যেন দেখা না হয়, সেভাবেই চলাফেরা করি। রাতের অন্ধকারে চোরের মতো বাড়িতে ঢুকে চারটে খেয়ে আবার পালাই যাতে কেউ দেখতে না পায়। এ অবস্থায় খবর পাই যে, লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প খুলেছে। খবর পেয়েই  আমার চাচাতো ভাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে যাই ভদ্রঘাট। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে, আগের দিনই অর্থাৎ ১৭ জুন লতিফ মির্জার বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সরে গেছে দূরে কোথাও। অল্পের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া হলো না বলে হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি এলাকায়। আবারো বনেবাদারে ঘুরে বেড়াই, ক্ষেতে কাজ করি পালিয়ে পালিয়ে, আর রাতে গোপনে বাড়ি গিয়ে খেয়ে চলে আসি, অন্য কারো বাড়িতে রাত কাটাই।
 
একদিন দুপুরে চন্দ্রকোনার ক্ষেতে কাজ করছি, কুদ্দুস এসে জানায় যে, রৌমারী থেকে ফিরে এসেছে ইসমাইল, আমাকে দেখা করতে বলেছে। তখনই ইসমাইলের সঙ্গে দেখা করতে যাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে। ইসমাইল তখন বাড়িতেই, সে আমাকে একটি রাইফেল হাতে দিয়ে কুদ্দুসকে গুলি করতে বলে। আমি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে যাই, ইতস্তত করি। কুদ্দুসও বলে, কমান্ডার যখন বলছে, মার গুলি, দেখি তোর কত সাহস! আমিও রাইফেল হাতে তুলে নিই, তাক করি কুদ্দুসের দিকে। তখন ইসমাইল আমাকে ঠেকিয়ে দিয়ে বলে, ঠিক আছে তুই পারবি। আজ সন্ধ্যায় আসিস, অপারেশনে যাবো। আমি আর কুদ্দুস দু’জনেই তখনকার মতো চলে আসি।
 
সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সঠিক স্থানে পৌঁছে যাই। সেখানে আমার মতোই জড় হয় আরো ১৪/১৫ জন। আসে ইসমাইলও। তার কথা মতো, উত্তর দিকে রওনা দেই সবাই, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। যেতে যেতে পৌঁছে যাই কেচুয়াহাটা গ্রামে। আমাদের কয়েক জনকে গ্রামের বাইরে রেখে অন্যরা গ্রামে ঢুকে পড়ে। সেখানে এক ডাকাতকে ধরা হয়। তার কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় তিনটি রাইফেল আর বেশ কয়েকটি গুলি। ডাকাতকে ছেড়ে দিয়ে আমরা সবাই আবার ফিরে আসি এলাকায়। সারাদিন গ্রামের আশেপাশে থাকি। আবার সন্ধ্যায় একত্রিত হই। এ ভাবে চলতে চলতে আসে বর্ষাকাল। নদীনালা, খালবিল ভরে ওঠে বর্ষার পানিতে। তখন একটি নৌকা ঠিক করা হয়। ইসমাইলের নেতৃত্বে আমরা প্রায় ২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা উঠে পড়ি নৌকায়। আজ বেলকুচি তো কাল চলে আসি কামারখন্দ এলাকায়। কখনো বা বাগবাটী রতনকান্দি অঞ্চলে। 

রতনকান্দির শ্যামপুর গ্রাম থেকে একদিন আমরা রওনা হলাম চক ডাকাতিয়া নদী হয়ে। সেখানে লতিফ মির্জার পলাশডাঙ্গা বাহিনী অবস্থান করছিল। আমরা সেখানে ঢুকতেই আমাদের ‘হল্ট’ করতে বলা হলো। আমরা হাত উপরে তুলে পরিচয় দিলাম। তখন আমাদের সে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হলো। আলোচনা শেষে আমাদের ইসমাইল বাহিনী মিশে গেল পলাশডাঙ্গায়।
 
ইসমাইলের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলো দু’টি নৌকা- ৯-এ ও ৯-বি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণের নৌকায়। অরুণদা বললেন- তুমি আমার বডিগার্ড। কিন্তু তখনো জানিনা বডিগার্ড কথার মানে কী? অরুণদা বুঝিয়ে বললেন, সব সময় আমার সাথে সাথে থাকবি, আমি যেখানে যাই, সেখানে যাবি, যা করতে বলি করবি। সেদিন থেকেই অরুণদার ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়ি। ধীরে ধীরে লেখাপড়া জানা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলতে চলতে বুঝতে পারি যে বডিগার্ড মানে দেহরক্ষী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লুৎফর রহমান অরুণের বডিগার্ড হতে পারাটা আমার জন্য বিরাট গর্বের, কারণ তিনি ছিলেন পলাশডাঙ্গার কমান্ডার, তার স্নেহ ছায়াতলে থাকার কারণেই পলাশডাঙ্গার সকল মুক্তিযোদ্ধার কাছে আলাদা খাতির-সন্মান পেয়েছি। তার অংশ নেওয়া সকল যুদ্ধেই আমাকে অংশ নিতে হয়েছে। সে সব যুদ্ধের কথা অনেকেই লিখেছেন, অনেকে লিখবেন, আর বড় মানুষেরা যখন যুদ্ধের কথা বলবেন, তখন তাদের যুদ্ধকথাই সবাই শুনবেন। তাই যুদ্ধ আলোচনার চেয়ে অন্য কথা বলাই ভালো বলে মনে হয়।
 
পলাশডাঙ্গার তখন অনেকগুলো নৌকা, পঞ্চাশটির কম নয়। সবগুলো নৌকা কাছাকাছি একটি বড় গ্রাম বা কয়েকটি ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। সকালে সবার জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ করা পাঁচ সিকা করে ব্যাটালিয়নের নৌকা থেকে নিয়ে আসতে হতো। টাকা বিতরণ করতেন পলাশডাঙ্গার ক্যাসিয়ার রতনকান্দির চিলগাছা গ্রামের আব্দুল হাই তালুকদার। নৌকার যে কোনও একজন বাজার করে আনতো। বাজার শেষে যদি কিছু থাকতো তবে তার ভাগ ফেরত পেতাম। কেউ বিড়ি খেতো, কেউ সিগারেট, তাও আনতে হতো বাজার থেকে। সন্ধ্যার আগেই খাওয়াদাওয়া শেষ করতে হতো, কারণ রাতে নৌকায় বাতি জ্বালানো নিষেধ। সন্ধ্যায় নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাজিরা নেওয়া হতো। তারপর নৌকা গণনা হতো। তারপর আগের দিনের আশ্রয় ছেড়ে চলে যেতে হতো নতুন আশ্রয়ে।
 
রোজার প্রথম দিন। আমরা হান্ডিয়াল-নওগাঁ অঞ্চলে নোঙর করে আছি। প্রায় সবাই রোজা রয়েছে, নৌকায় নৌকায় সেদিন বিশেষ বাজারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিকেলের দিকেই ইসমাইলের নৌকা থেকে দাওয়াত দিয়ে গেল যে, আমরা ইসমাইল বাহিনীতে যারা ছিলাম, তারা সবাই এক সঙ্গে ইফতার করবো। এ ব্যাপারে অরুণদাকে বলতেই তিনি যেতে নিষেধ করলেন। ইফতারের আগে আগে আবারো খবর এলো, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য। এবারো অরুণ দা নিষেধ করে বললেন, আমরাও তো এক সঙ্গে ইফতার করবো, নিজের দলের সঙ্গেই রোজার প্রথম ইফতার করা দরকার। মনে হলে ইফতারের পরে গিয়ে দেখা করে এসো। আমার আর ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে যাওয়া হলো না। 

ইফতার ও রাতের খাওয়া শেষে এবার এ আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার পালা, তার আগে মুক্তিযোদ্ধা হাজিরা, নৌকার হাজিরা। নৌকার হাজিরা দেখতে গিয়ে পাওয়া গেল যে, ৯-এ আর ৯-বি অনুপস্থিত। নেই ইসমাইলের নৌকা। সে দুই নৌকার মুক্তিযোদ্ধারাও নেই। তার মানে, ইসমাইলরা পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল যে , ইসমাইলের সঙ্গে পলাশডাঙ্গায় আসা সবাইকে এভাবে ইফতারের কথা বলে গোছানো হয়েছে। প্রায় সবাই সে ইফতার করতে গিয়ে চলেও গেছে ইসমাইলের সঙ্গে। বুঝতে পারলাম, কেন ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য আমাকে টানা হেঁচড়া করছিল। আবার স্পষ্ট করে বলেনি যে, যদি তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়! আমি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই যে, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে না গিয়ে ভালোই হয়েছে। ইসমাইল যাই চেষ্টা করুক অথবা আমার পুরনো সহযোদ্ধারা থাকুক, একটা বড় বাহিনী ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হয়নি।
 
১১ নভেম্বর বড় ধরণের আঘাত আসে পলাশডাঙ্গার ওপর, আমরা সেদিন আশ্রয় নিয়েছি হাণ্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকায় জিন্দান শাহর মাজার ঘিরে, ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। ভোর রাতের দিকে বোঝা গেল যে, পাকিস্তানি সৈন্য ও তার সহযোগিরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েও ঘাবড়ে যাইনি আমরা। যার যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে পজিশন নেই, শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সে যুদ্ধ চলে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হয়তো ভেবেছিলো যে, দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের পরাজিত করতে পারবে, কিন্তু আমরাও মাটি কামড়ে পড়ে থাকি। ধীরে ধীরে পাকিস্তানিরা ঘাবড়ে যেতে থাকে। সময় যত গড়ায়, পাকিস্তানিরা কাঁদা-প্যাঁকে আটকা পড়তে থাকে। বুট জুতা, জামাকাপড়, অস্ত্রশস্ত্র চলনবিলের কাঁদামাটিতে ভিজে তা ভারি হয়ে উঠতে শুরু করে। সময় যত গড়াতে থাকে, এলাকার মানুষজনেরও সাহস বাড়তে থাকে। তারাও ঘিরে ধরতে শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার সহযোগিদের। দুপুরের দিকেই আমাদের বিজয় নিশ্চিত হয়, পাকিস্তানিরা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে। এক সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে জনগণও তাদের ইচ্ছেমতো মারপিট শুরু করে। মেয়েরা পর্যন্ত তাদের ঘষির মাঁচা থেকে ধরে এনে আমাদের কাছে জমা দিতে থাকে অস্ত্রগুলি সহ। এ ভাবেই বিজয়ী হই আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা। 

একজন ক্যাপ্টেন সহ অন্তত ১২ জন ধরা পড়ে, আর মারা পড়ে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য, শতাধিক রাজাকার। আমাদের কেউ শহীদ হননি। তবে, জামতৈলের কাঞ্চু, মধু নাইন্নার সালামসহ ৪ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ বিজয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, কিন্তু যুদ্ধের কৌশল পাল্টানোর প্রয়োজন পড়ে। 

কমান্ডাররা নৌকা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তখন বন্যা আর নেই, সংকুচিত হয়ে এসেছে চলনবিলের পানিবহুল এলাকাও। হান্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকা ছেড়ে আপাতত অন্য চলে যাওয়ার ব্যপারেও ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। এর দু’দিন পরেই আমরা গুরুদাসপুর এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সে এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকারদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ওদিকে যাওয়া হয় না। বগুড়ার দিকেও একই অবস্থা। মোহনপুরের দিকেও যাওয়া সম্ভব হয় না। নাটোরের তালম এলাকায় সরে যাই আমরা। ওই এলাকার রাণীরহাট গ্রামে আমাদের রোজার ঈদ পার হয়। আবার ফিরে আসি পরিচিত এলাকার দিকে। নিমগাছীর দিকে এসে সেখানকার চেয়ারম্যানের কাছে আশ্রয়ের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিলে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে বলে তারা কান্নাকাটি করতে শুরু করে। তখন আমাদের দল বগুড়ার ধুনুট হয়ে কাজীপুর-রতনকান্দির দিকে সরে যাওয়ার চিন্তা করে। আমরা বগুড়ার চান্দাইকোনা বাজার হয়ে ধুনুটের মধ্যে ঢুকে পড়ি। কমান্ডারেরা সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকদিন এলাকা ছেড়ে থাকার। এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নেয় মুক্ত এলাকা নিরাপদ আশ্রয় মাইনকারচর হয়ে রৌমারী যাওয়ার। আমরা চলে আসি ব্রহ্মগাছার পাশ্ববর্তী চকডাকাতিয়া গ্রামে।

নওগাঁ যুদ্ধের আগের দিন পলাশডাঙ্গা থেকে কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেছে বাবামায়ের সঙ্গে দেখা করতে। এলাকা ছাড়ার আগেই তাদের বাহিনীতে নিয়ে আসতে হবে, এজন্য আমাকে পাঠানো হয় আমার এলাকায়। হয়তো এ ভাবেই অন্য এলাকায় আরো কাউকে পাঠানো হয়। আমি চন্দ্রকোনা থেকে ইনসাফ, খায়ের ও গোলামকে খুঁজে বের করি এবং যুদ্ধের খবরাখবর ও বাহিনীর সিদ্ধান্ত জানাই। ওরা সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হই। এর পর আমি খোকসাবাড়ীতে যাই আব্দুল হাইকে খুঁজতে। ওর বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে আব্দুল হাই রৌমারীতে চলে গেছে। আমি রতনকান্দির ক্ষুদ্রবয়ড়া গ্রামে এসে পলাশডাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে জানতে পারি যে, এ কয়দিনে কমান্ডারেরা নৌকা ঠিক করে রেখেছে রৌমারীতে যাওয়ার জন্য। পরের দিন আমরা পলাশডাঙ্গার সবাই মেছড়ার যমুনার ঘাট থেকে উঠে পড়ি রৌমারীর উদ্দেশ্যে। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তিন/চার দিনে অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা পৌঁছে যাই বাংলাদেশের অন্যতম মুক্ত এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। আমাদের ছেড়ে নেতারা ছোটেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরবর্তী নির্দেশনার জন্য।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্ত হয়ে গঠন করা হয় মিত্র বাহিনী। তারা বিভিন্ন দিক থেকে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের মধ্যে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি। বিজয়ী হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর দু’তিন দিনের মধ্যে পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ, যারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন যোগাযোগ করতে, তারা ফিরে আসেন। আমরাও রওনা হই সিরাজগঞ্জের দিকে। 

ভাটির টানে আসতে সময় লাগে না, আমরা দেড় দিনের মধ্যে পৌঁছে যাই সিরাজগঞ্জে। জেলখানার ঘাটে এসে নামি সবাই। এক ধরণের কৌতুহল থেকে জেলখানার ভিতরে ঢুকি। পরিচিত যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে তাদেরও দেখি সেখানে আটকা থাকতে। আমাকে দেখে পরিচিতরা মুখ লুকায়। কেউ কেউ কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বের হয়ে আসি জেলখানা থেকে।
 
পলাশডাঙ্গার প্রথম ক্যাম্প করা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজের হোস্টেলে। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর কলেজের পড়াশোনা শুরু হওয়ার তোড়জোর শুরু হয়, ফলে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হয়। পলাশডাঙ্গার সবাই ঠাঁই নেয় মোক্তারপাড়ার মোড়ের সাহারা হোটেলে। এর মধ্যে জানুয়ারির মাঝামাঝি কলেজ মাঠে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়া হয়, অস্ত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। ধীরে ধীরে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা যার যার কাজে স্কুল কলেজে বা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। আমিও ফিরে যাই নিজের বাড়িতে পরিবারের কাছে। 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।  

[বীর মুক্তিযোদ্ধা জেলহোসেন মন্ডল। পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের একজন সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ৩ কন্যা ৩ পুত্র সন্তানের জনক। বর্তমানে খোকসাবাড়ী ইউপি সদস্য।]
  

অআই
 

Published: Wed, 26 Jun 2019 | Updated: Wed, 26 Jun 2019

যুদ্ধকথা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের হাতে থেকে রক্ষা পেতে শহর ছেড়ে প্রায় সবাই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু তাতেও রেহাই পায়নি সাধারণ মানুষ। গ্রামে গিয়ে হামলা চালিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীরা, অথবা জীবন রক্ষার প্রলোভন দিয়ে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে শহরে, নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে লোকজনকে দেখাতে শহরে দেওয়া হয়েছে মহড়া। তারপর তাকে হত্যা করে পুঁতে দেওয়া হয়েছে তারই নেতার বাড়ির আঙ্গিনায়। এমন অনেক শহীদের এক জনের নাম শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজন (৪০)। তার পিতার নাম: রজব আলী, বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার দিয়ারধানগড়া গ্রামে। 

শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, তার স্বামী আবুল হোসেন গুলমহাজন রেলে কুলির কাজ করতেন, পাশাপাশি শহরে ছিল ছোট হোটেল ব্যবসা। তার দুই সন্তান আব্দুস সালাম (৬০) ও আব্দুল আলীম (৫০)। তার স্বামী আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। যেখানেই সংগঠনের মিছিল মিটিংয়ের কর্মসূচি থাকতো সেখানেই চলে যেতেন তিনি সদলবলে। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রিয়পাত্র। যাইহোক, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল ভোর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দখলে নেয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর। তার আগেই আবুল হোসেন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান তার এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ি সদর থানার শিয়ালকোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে। পাশাপাশি চেষ্টা চলতে থাকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের খোঁজার কাজ। অপরদিকে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নিয়ে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লিগ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থকদের নিয়ে গঠন করে শান্তি কমিটি, গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। শুরু হয় আওয়ামী সমর্থকদের খুঁজে বের করা। তার স্বামী আবুল হোসেনকে গ্রামের মুরুব্বিরা খবর পাঠান দেখা করার জন্য। তাকে বলা হয় যে, তাকে কিছুই করা হবে না। তিনিও সরল বিশ্বাসে চলে আসেন গ্রামের মুরুব্বির সঙ্গে দেখা করতে। 

শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, ঘটনার পর তিনি খবর পেয়েছেন যে, তার স্বামী দিয়ারধান গড়া পীর বাড়ির সামনে আসার পর পীরের মুরিদ ও রাজাকারের তাকে আটক করে বেধড়ক মারপিট করে আধামরা করে ফেলে। পরে তাকে বেঁধে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হয়। এ সময় শহরবাসীকে শোনানো হয় যে, পাকিস্তানের বিরোধীতা করা হলে এভাবেই শাস্তি পেতে হবে। শহর ঘুরিয়ে আবুল হোসেনকে নিয়ে আসা হয় মাড়োয়ারি পট্টিস্থ মহুকুমা আওয়ামী সভাপতি মোতাহার হোসেন তালুকদার এমএএর বাস ভবনের সামনে, সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছতলায় অর্ধমৃত অবস্থায় পুঁতে রাখা হয় তাকে। 

শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে
শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে

শহীদের বড় ছেলে আব্দুস সালাম (৬০) জানান, সিরাজগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর গ্রামের মানুষ ও আত্মীয় স্বজন তার বাবার কঙ্কাল  মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাসভবনের সামনের কৃষ্ণচূড়া তলা থেকে তুলে আনে এবং গ্রামে জানাযা করা হয়। পরে সেই কঙ্কাল দাফন করা হয় মালশাপাড়া কবরস্থানে। তিনি আরো জানান, বাবা আবুল হোসেন গুলমহাজন শহীদ হওয়ার পর একই গ্রামের তার নানা সালু শেখ তাদের পরিবারকে নিয়ে ঠাঁই দেয়। তারা সেখানেই অবস্থান করছেন। শহীদের স্ত্রী সালেহা খাতুন জানান, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর শহীদ পরিবারের জন্য দান করা দুই হাজার টাকা পেয়েছেন। পাশাপাশি ঘর তোলার জন্য টিন টিউবওয়েল পেয়েছেন। তাকে নারী পূনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখান থেকে এক বছর ধরে দৈনিক দুই টাকা করে মজুরী এবং দুপুরের খাবার পেয়েছেন। সেখানে তাকে দর্জির কাজ শেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা নানা কাজে লাগাতে পারেন নি। তার বাবা ভাইয়ের বাড়িতে থেকে তাদের সহযোগিতায় এতিম ছেলে দু’টোকে কোনও রকমে মানুষ করেছেন। পরে তাদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। দু’জনই এখন দেশে ফিরে এসে ঘরসংসার করে খাচ্ছে। 

শহীদের ছোট ছেলে আব্দুল আলীম (৫০) জানান, দেশের প্রায় সব নেতাই তাদের বক্তৃতায় বলেন, তিরিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে তিরিশ লক্ষ শহীদের মধ্যে আমার বাবার রক্ত রয়েছে, এ জন্য আমরা গর্বিত। কিন্তু সে সব শহীদ পরিবারকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়না। আমরা অর্থনৈতিক সাহায্য সহযোগিতা বা পূণর্বাসনের দাবিও করি না, কিন্তু আমরা আশা করি যে এদেশের জন্য আমাদের পরিবারের এই অবদান, এটা রাষ্ট্র মনে রাখুক। আমার পরিবারকে শহীদ পরিবারের মর্যাদা দেওয়া হোক এটাই আশা করে আমার পরিবার। 
লেখক- মুক্তিযোদ্ধা ও সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক।    

লেখক মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম

 

/এসিএন

Published: Wed, 26 Jun 2019 | Updated: Wed, 26 Jun 2019

যুদ্ধস্মৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)

শ ম শহীদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা

প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের হাতে অস্ত্র, গোলাবারুদ ছিল কম। ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে দু/তিনটি করে রাইফেল আর হয়তো পঞ্চাশ রাউন্ড করে গুলি সঙ্গে রাখতে পারতাম। এ দু/তিনটি রাইফেল সবাই মিলে আগলে রাখতাম, পরিস্কার করতাম, ডিউটির সময় কাজে লাগাতাম। আমাদের সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন আমাদের নেতা শেখ মোঃ আলাউদ্দিন ভাই। বাহিনী কোন দিকে যাবে, কোথায় আক্রমন করবে, তার সিদ্ধান্ত তিনিই হয়তো সিনিয়রদের কয়েকজনের পরামর্শে করে নিতেন, আমরা তা জানতে পারতাম না। তবে বুঝতাম যে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব করা হচ্ছে। আমাদের কোনও সময়ই বড় কোনও আক্রমনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়নি, বা আলাউদ্দিন ভাইয়ের গ্রুপ ঝুঁকিপূর্ণ কোনও আক্রমনের পরিকল্পনা নেয়নি। আমাদের চেয়ে দূর্বল স্থানে আঘাত করা, গ্রামগুলোকে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত থেকে মুক্ত করা- আমাদের জনযুদ্ধের এটাই ছিল কৌশল, যা আমরা অক্ষরে অক্ষরে অনূশীলন করি। আমি একটা বড় যুদ্ধে মানে রায়গঞ্জ থানা আক্রমনে অংশ নিতে পেরেছিলাম। সেখানেও আমাদের আক্রমনকারী গ্রুপের ওপর যেন শত্রুরা বাইরে থেকে এসে আঘাত করতে না পারে সেই গ্রুপে থাকতে হয়েছিল। আসলে ছোট ছোট আক্রমনের মধ্যে দিয়ে সাহস অর্জণটাই ছিল আমাদের দলের প্রধান কৌশল।

অন্যান্য গ্রুপের সঙ্গে আলাউদ্দিন ভাই সমন্বয়ের চেষ্টা করতেন। এ কারণে তাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হতো। তিনি তার মুক্তিযোদ্ধা দলকে রায়গঞ্জ ও তাড়াশ থানা এবং নিজ এলাকা বহুলী ইউনিয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু দু/এক জন সঙ্গীকে নিয়ে চলে যেতে আরো দূরে, অন্য মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে। যেমন, বড়ইতলী গিয়েছিলেন আলাউদ্দিন ভাই। সেখানে ছিলেন বিএলএফ নেতা মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম ভাই তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে। সেখানে ঘেরাও দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা সে ঘেরাওয়ের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হন। এ ঘটনা আমি পরে জানতে পারি।

আমাদের অস্ত্রের অভাবের কথা আগেও বলেছি। নভেম্বরের প্রথম দিকে আলাউদ্দিন ভাই আমাদের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যান কাজীপুরের তাড়াকান্দিতে। বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি সেখানকার যমুনার এক ঘাট থেকে খালাস করতে হয়। অস্ত্র ও গুলি গুলো ছিলো প্যাকেট করা, মানে একেবারেই নতুন। অস্ত্রগুলো আমরা নিয়ে আসি আমাদের এলাকায় আমাদের দলের জন্য। এতে আমাদের দলের অস্ত্রের সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়, যা খুবই প্রয়োজন ছিল, কারণ মুক্তিযুদ্ধ তখন অনেকটাই জমে উঠেছে।

নভেম্বরের শেষের দিকে দলে দলে দেশের ভিতরে ঢুকছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নেপাল, ভুটান, ভারত বাংলাদেশকে দিয়েছে স্বীকৃতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যৌথ বাহিনী। তারা একের পর এক পাক-বাহিনীকে পরাস্থ করে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার দিকে। বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হওয়া হয়ে ওঠে সময়ের ব্যাপার।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিকে আমাদের জানানো হলো যে, সিরাজগঞ্জের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে আমরা পৌঁছে যাই সদর থানার ফুলকোচা গ্রামে। সেদিন আলাউদ্দিন ভাইয়ের দলে আমরা প্রায় ১শ’ মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। বিশ্রাম শেষে ১২ ডিসেম্বর সকালে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ছোনগাছা মাদ্রাসায়, সেখানে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা জড় হয়েছে। কারণ, শৈলাবাড়ি ক্যাম্প এখান থেকে তাড়াতে না পাললে সিরাজগঞ্জ মুক্ত করা কখনোই সম্ভব নয়। আমাদের জানানো হলো, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারেরা বসেছেন যুদ্ধের কৌশল নির্দ্ধারণে, এর পর হামলা করা হবে শৈলাবাড়িতে অবস্থিত পাক-হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখানে বিপুল সংখ্যক পাক-সেনা, পুলিশ ও রাজাকার রয়েছে। সেখানে হামলা করে ছিন্নভিন্ন করে দিতে হবে পাক-হানাদার ও তার দোসরদের।

নেতাদের সিদ্ধান্ত অনূযায়ী আমাদের পজিশন দেওয়া হলো শৈলাবাড়ি ক্যাম্পের পূব পাশে ওয়াপদা বাঁধের ওপরে। পূব দিকে মুখ করে বিকেলের দিকে শুরু হলো আক্রমন। আমাদের দেশ মুক্ত করার লড়াই আর ওদের আত্মরক্ষার যুদ্ধ। এবার আমাদের অস্ত্র গোলা বারুদ ছিল, তবে পাক-হানাদার বাহিনীর তূলনায় তা স্বল্পই। আমরা যতদূর জেনেছি যে, আমাদের পক্ষে থ্রি-ইঞ্চ মর্টার, এলএমজি, ছিল থ্রিনটথ্রি এসএলআর। কিন্তু ওরা লড়ছে মরণপণ নানা ধরণের অস্ত্র দিয়ে। আধা ঘন্টা যুদ্ধ চলার পর একটি গ্রেনেড এসে পড়লো আমার পাশেই। নিয়ম অনূযায়ী তা হাতে নিয়ে ছুঁড়েও দিলাম, কিন্তু তা বেশী দূরে পাঠানো সম্ভব হলো না, পাশেই পড়ে তা বিস্ফোরিত হলো। তার টুকরো এসে লাগলো গায়ে, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। আলমপুরের খালেক ছিল পাশেই, সে ক্রলিং করে এসে ওর গায়ের চাদর দিয়ে বেঁধে দিল আমার ক্ষতস্থান। আর দু’তিন এসে আমার সেবাশু¯্রষা করতে শুরু করলো। আমাকে ধরাধরি করে সরিয়ে নেওয়া হলো রণাঙ্গণ থেকে। নিয়ে যাওয়া হলো টুকরা ছোনগাছা এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বাড়িতে। এক চিকিৎসকও পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গেই। তিনি আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন। এর পরই নিয়ে যাওয়া হলো ভুড়ভুড়িয়া জাবেদ ডাক্তারের বাড়িতে। সেখানে দেখলাম, আমার মতোই আহত আরো কয়েক জনকে আনা হয়েছে। এর মধ্যে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম চৌধুরীকেও দেখতে পেলাম। তিনিও আহত হয়ে শুয়ে আছেন। তার মানে এটাই মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গণের হাসপাতাল। এক বেলা সেখানে রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাজগাঁতী মন্টু বাবুর বাড়িতে। এলাকার লোকজন ভেঙ্গে পড়ছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে।

ইতিমধ্যেই গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে, পাক-বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে গেছে। সিরাজগঞ্জ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। পালিয়ে গেছে পাকিস্তানি প্রশাসনে যুক্ত থাকা লোকজনও। ১৪ ডিসেম্বর দুপুরের মধ্যেই এক ট্রাকে আমাদের মতো আহতদের তুলে নিয়ে আসা হলো সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে। দ্রুত চালু করা হলো সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল, আলাউদ্দিন ভাই আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দিলেন সে হাসপাতালে। বাড়ি আর এলাকা থেকে লোকজন আসতে শুরু করলো আমাকে দেখতে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা কম, কারণ পাকিস্তান থাকা কালে যারা চাকুরি করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে হাসপাতালে আর বাড়িতে চিকিৎসা প্রায় সমানই। তাই দু’দিন পরই বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক আমাকে নিতে এলেন, হাসপাতাল থেকে রিলিজের সময় উপস্থিত হলেন আলাউদ্দিন ভাই। তিনি বললেন, বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নাও, ঔষুধ পথ্য খাও, যে কোনও সময়েই কিন্তু ডাক পড়তে পারে, তখনই চলে আসার জন্য প্রস্তুত থেকো। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়িতে ফেরার পর প্রতিদিনই মানুষের ভিড়। আত্মীয়-স্বজন আসছে, গ্রামের মানুষ, পাশ্ববর্তী গ্রামের মানুষ আসছে আমাকে মানে মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে, যেন আমি রূপকথার নায়ক হয়ে উঠেছি সাধারণের কাছে।

(সমাপ্ত)

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক

Published: Wed, 26 Jun 2019 | Updated: Wed, 26 Jun 2019

যুদ্ধস্মৃতি

শ ম শহীদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা

যখন নতুনের ডাক আসে তখন জাতি অস্থির হয়ে ওঠে সে ডাকে সাড়া দিতে। জাতির এ অস্থির সময়ে যুব সমাজ কিছু একটা করে দেখাতে চায়। আর সে করণীয় সম্পর্কে জানতে, খুঁজতে সেও অস্থির হয়। খুঁজে বেড়ায় কখন কোথায় গেলে সে একটা কাজে লাগতে পারবে। সে তখন হন্যে হয়ে বন্ধু-স্বজন খুঁজে ফেরে লোকালয়ে, বনবাদারে, দেশ-বিদেশে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমিও তরুণ, আমিও সে অস্থিরতায় ভুগেছি, পাগলের মতো খুঁজে ফিরেছি বন্ধু-স্বজনকে। যখন খুঁজে পেয়েছি, তখন আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেছি শত্রু হননে।

আমি শ ম শহীদুল ইসলাম। জন্ম: ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখে। আমার বাবার নাম এসকে আব্দুল মজিদ তালুকদার, তিনি হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম ছাকিতননেসা, তিনি গৃহিণী। আমরা ৫ ভাই ১ বোন, ভাইবোনদের মধ্যে আমি পঞ্চম। এক বড় ভাই বিজি প্রেসে চাকুরি করতেন। আমার বাড়ি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার সদর থানার বহুলী ইউনিয়নের ছাব্বিশা গ্রামে। আমাদের গ্রাম বা তার আশপাশের গ্রামে কোনও হাই স্কুল ছিল না, তাই ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উঠে সিরাজগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। আমার বড় ভাই আব্দুস সাত্তার তালুকদার একই স্কুলে আমার ওপরের ক্লাসে পড়তেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। আমি তার অনুসারী হয়ে উঠি, কিন্তু আমি লেখালেখি করতে  চাইতাম, হতে চাইতাম লেখক-সাংবাদিক। একারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে কম যুক্ত হতাম। যারা লেখালেখি করতেন অথবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা। এই সব লিখিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ডা. মতিয়ার রহমান, কমল গুণ, সানায়ুল্ল্যাহ শেখ, এমএ রউফ পাতা, খম আখতার, আযকার-উল হক প্রমুখের সঙ্গে আড্ডা দিতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতাম। আর উত্তেজনাপূর্ণ মিছিল হলে তাতে অংশ নিতাম। 
১৯৬৯ সালে এসএসসি পাশ করে সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই, লেখালেখির সুযোগ আরো বেড়ে যায়, নিয়মিত কবিতা লিখি, সাহিত্যের আড্ডায় যাই, একটি সাপ্তাহিকে নিয়মিত সংবাদ পাঠাই। যোগাযোগ রাখি ছাত্রলীগের সঙ্গে। মধ্যে সত্তুরের নির্বাচন আসে, এলাকার তরুণদের সঙ্গে নিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে ভোট চেয়ে বেড়াই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে, এটা যেন আমার কাছে বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। আমাদের আসনে নির্বাচনে সহজ বিজয় ঘটে আওয়ামী লীগের এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার ও এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলীর। বিজয় ঘটে সারাদেশেই, এ বিজয় জনগণের বিজয়, বাঙালির বিজয়। আমরা নিশ্চিত হই যে, এবার পাকিস্তানকে বাঙালিদের পক্ষে শাসন করবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগ। আমি খোশ মেজাজে আবার সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনায় আবারো ক্ষেপে যায় বাঙালিরা। এদিন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করা হয়। এ ঘোষনায় আমরা যারা পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তারা চমকে উঠি। সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করে। আচমকা এ মিছিলে আমরাও শহরের মধ্যে থেকে শামিল হই। ছোট্ট মিছিল কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠে বিশাল। মিছিলের প্রধান শ্লোগান হয়ে ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আর বাঙালির অপরিহার্য শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ আরো বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। এ মিছিল ঘুরিয়ে দেয় দেশের রাজনীতির চাকা। 

বাঙালিরা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকে। প্রতিদিনই ঘটতে থাকে নতুন নতুন ঘটনা। অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, প্রতিদিন অসহযোগ আন্দোলনের নতুন নতুন ঘোষনা আমাদের বিশ্বাস করতে বলে যে আমরা স্বাধীন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষন দেন, যা আমাদের শোনার সুযোগ হয় পরের দিন সকালে। সে ভাষনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমরা বুঝে গেলাম যে, বঙ্গবন্ধু এ কথার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিলেন। পরের দিনই গ্রামের আনসার সদস্য আজিজার রহমান বল্লা ভাই আমাদের নিয়ে তালুকদার বাড়ির পুকুর পাড়ে লাঠিসোটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। 

এদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শেখ মোঃ আলাউদ্দিন (ধীতপুর-বহুলী} অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে ফিরে এলেন এলাকায়। তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই আমাদের সঙ্গে সখ্যতা, তিনি সংঘটিত করলেন আমাদের। বহুলী হাটখোলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন তিনি। আনসার সদস্য ডা. ময়দানসহ আরো দু’তিন জন সেখানে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নিলেন। আমরা ছাব্বিশা গ্রামের অন্তত ১৫ জন তরুণ সে প্রশিক্ষণে নাম লেখালাম। বহুলী ইউনিয়ন এলাকার শতাধিক তরুণ নাম লেখালো সে প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ নেই আর মনে মনে শপথ নেই যে, বাংলাদেশকে শত্রু মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। 

২৬ মার্চ সকাল থেকে খবর প্রচার হতে লাগলো যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন, সে ব্যপারে দু’টো খবরই প্রচার হতে লাগলো। কেউ বলে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, কেউ বা বলে, তিনি জনগণের মধ্যে আত্মগোপন করে আছেন। ঘটনা যাই ঘটুক, দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তা বোঝা যেতে লাগলো। ঝড়ের আগের মূহুর্তের মতো দেশটা থমথমে হয়ে পড়তে লাগলো। দু’তিন দিনের মধ্যে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন সহ্য করে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহর থেকে গ্রামে চলে আসতে শুরু করে বাঙালিরা। তারা রাস্তায় যেতে যেতে পথে পথে বলতে থাকে পাকিস্তানিদের নির্যাতনে খবর। আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় সে সব মানুষের মিছিল থেকে শুনতে থাকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার কথা। এতে বাঙালিদের ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়।

আলাউদ্দিন ভাই কয়েক জনকে নিয়ে চলে যান বাঘাবাড়িতে, পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন বলে। নানা কারণে আমি সেখানে যেতে ব্যর্থ হই। কিন্তু এলাকার নির্যাতীত মানুষের কাফেলাকে আশ্রয়, খাওয়া দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকি। গ্রামের তরুণেরা সবাই একাট্টা হই, এগ্রাম সেগ্রামে ঘুরে বেড়াই, বলতে থাকি, স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? আরো বলতে থাকি যে ছাত্র-তরুণেরা এবার যে কোনও মূল্যে দেশকে স্বাধীন করবেই। ওদিকে, ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহরে এসে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা যাকে যেখানে পায় তাকেই হত্যা করতে শুরু করে। বাড়িঘরে আগুন দিতে থাকে কোনও বাছবিচার ছাড়াই। প্রথম দিনেই বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সেখানে হত্যা করে বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ৩৯ জন বাঙালিকে। তার আগেই বাঘাবাড়ি থেকে পিছিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধারা। ফিরে আসেন ছাত্রনেতা আলাউদ্দিন ভাইও। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তাকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ে। আমাদের গ্রামের সাইফুল, হামিদ, মজিদ, তাহের, সাইদসহ আরো কয়েক জন তাকে খুঁজে ফিরি হন্যে হয়ে । তিনি তখন প্রকাশ্যে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তিনিই নন, সকল ছাত্রনেতাই তখন পলাতক। আমরা বহুলীর ছাত্র তরুণেরা ছাত্রলীগ নেতা আলাউদ্দিন ভাইয়ের ওপরেই নির্ভরশীল। তাকে না পেলে আমরা নেতৃত্বহীণ। অবশেষে ধীতপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর তাকে খুঁজে পাই পাশ্ববর্তী মুনশুমী গ্রামে। বহুলীসহ অন্যান্য আশপাশের ইউনিয়নের তরুণেরা তার সঙ্গে দেখা করি। তিনি জানান, তার পরিকল্পনার কথা। তিনি জানান, এসডিও শামসুদ্দিন কাজীপুরের দিকে দেখা করার কথা বলেছিলেন, তাকে এখনো খুঁজে পাইনি। এখনতো আমাদের পিছু হটে আসতে হয়েছে, একটু গুছিয়ে নিতে হবে। তোমরা যারা ছাত্রলীগ করেছ তারা কেউ বাড়িতে থাকবে না, সাবধানে আশপাশের এলাকায়ই থাকবে। আমাকেও এক/দেড় মাস পালিয়ে থাকতে হবে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে আমাদের যুদ্ধ ছাড়া কোনও পথ নেই মনে রেখ। শোনা যাচ্ছে, ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আমি সব খোঁজ খবর নিয়ে ফিরবো, তোমরা কেউ এলাকা ছাড়বে না, আবার ধরাও পড়বে না। এসব বলে আমাদের সবাইকে বিদায় করলেন।

আমি, সাইফুল, সাইদ আর মজিদ প্রায় এক সঙ্গেই পালিয়ে পালিয়ে থাকি। দিনে বের হই না বললেই চলে। রাতে প্রয়োজন মনে করলে নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হয়। আশাহতাশায় দোলায়িত হয়ে সময় কাটতে থাকে। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোই হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়। প্রায় দুই মাস পরে জুলাই মাসের প্রথম দিকে খবর পাই যে, আলাউদ্দিন ভাই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এলাকায় ফিরেছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে তিনি ঘোরাফেরা করছেন। আমি, সাত্তার ভাই, সাইদ, হামিদ আর সাইফুল রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে তাকে পেয়ে যাই এক গ্রামে। স্বস্থি ফিরে আসে আমাদের মধ্যে। হয়তো তিনি আমাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠাবেন অথবা কোনও ব্যবস্থা করবেন। আলাউদ্দিন ভাই জানান, তিনি মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণসহ কয়েকজনকে নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এখন দল গোছাবেন, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবেন, অন্যদের প্রশিক্ষণে পাঠাবেন। যতদিন প্রশিক্ষণে পাঠাতে না পারছেন, ততদিন স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে দল চালাতে হবে। আমরা হয়ে পড়ি তার দলভূক্ত। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা জীবন। 

অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ছিল না, আবার যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগও ছিল না, আমরা যখন শেল্টারে থাকতাম, তখন সহযোদ্ধাদের কাছে থেকে থ্রিনটথ্রি রাইফেল খোলাজোড়া, টার্গেট ঠিক করা এসব শিখে নেই। আমাদের বলা হয়, সুযোগ পেলেই তোমাদের ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। মাঝে এক/দুই বার তালিকাও করা হয় যে, কাকে কাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। 

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত দিনে বের হতাম না বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। গভীর রাতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সহযোগিতায় দল বেঁধে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চলে যেতাম। প্রতি ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপ এক এক বাড়িতে একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা  হতো। সে ঘরটিই হয়তো ওই গৃহস্থবাড়ির মূল ঘর। এমনি একদিন এক বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, পরে জানতে পারি যে ওই ঘরে কিছুক্ষণ আগেই এক নারী তার সন্তান প্রসব করেছেন। আমরা চলে আসায় প্রসূতি আর তার নবজাতককে অন্য ঘরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভেবে পাইনা যে, মুক্তিযোদ্ধাদের কত গুরুত্ব দেওয়া হলে এ কাজটি সম্ভব! এভাবেই সাধরণ মানুষ গুরুত্ব দিতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের। জনগণ এ সব  করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আমাদের নিয়ে রাখা হতো বাড়ির ভিতরের সবচেয়ে নিরাপদ ঘরে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাড়িতে গেলে তাদের খুব কষ্ট হতো, কিন্তু তারা তা হাসি মুখেই মেনে নিতেন। আরো দেখেছি, আশেপাশের মানুষ যদি জানতে পারতেন যে, কোনও বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছে, তাহলে তারা আমাদের দেখতে আসতো যেন মুক্তিযোদ্ধারা রূপকথার রাজপুত্তুর। আমার সহযোদ্ধাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন, আব্দুস সাত্তার, সাইদ, সাইফুল, তাহের, মান্নান, মজিদ, আনোয়ার, হামিদ, আব্দুল জলিল, আজিজ, আবুল কালাম, সাবেক সেনাসদস্য সানাউল্লাহ প্রমুখ। এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন সংগঠক ছিলেন, তারাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন। কোন কোন বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেবে তা এরাই ঠিক করে দিতেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সূবর্ণগাঁতীর বাদশা ভাই। তিনি সুপরিচিত ছিলেন রায়গঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। দিনের বেলায় বিভিন্ন গ্রামে যেতেন, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে আশার বাণী শোনাতেন। রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ভাগ করে থাকার ব্যবস্থা করতেন।
(চলবে)
 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক