একটা সফল অপারেশন করে ঢাকায় ঢুকে যাই

Published: Wed, 13 Nov 2019 | Updated: Thu, 30 Jan 2020

 বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ এনায়েতুল করিম খান

১৯৭১ সালে ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের বাসা লালবাগে। ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী পলাশী ফায়ার সার্ভিস, জগন্নাথ হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ ঢাকায় যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় সে ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ভয়ে আমরা পরদিন ২৬ মার্চ সকালে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে ওপারে জিঞ্জিরায় চলে যাই। দু’দিন থাকার পর আবার লালবাগের বাসায় চলে আসি। স্কুল বন্ধ, বাইরেও থমথমে অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে একদিন সকালে এলিফ্যান্ট রোড থেকে আমার ফুপাত ভাই মাসুম ইকবাল এলেন আমাদের বাসায়। গল্প করতে করতে মাসুম ভাই আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, চল আমরা যুদ্ধে যাই- আমরা যুদ্ধ না করলে তো দেশ স্বাধীন হবে না এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ হবে না। তার কথা শুনে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। আর তখন তো আমার বয়স মাত্র ১৬ বছর। তার কথা ও উৎসাহে রাজী হয়ে গেলাম। আর আমার রক্তের ভিতরেও কেমন ঢেউ খেলে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবো। কিন্তু কিভাবে যাবো- মাত্র দু’জন মানুষ। বাসা থেকেও আমাদেরকে যেতে দেওয়া হবে না। এটা আমরা জানি। তারপর সকালে একটা ছোট্ট চিঠি লিখে রেখে বাসা থেকে বেরিয়ে ‘রাজার’ রিকশা নিয়ে এলিফ্যান্ট রোডে আসি। আমাকে দেখে মাসুম ভাই খুশি হলেন।

আমরা যাত্রা করলাম কুমিল্লা বর্ডারের দিকে। কারণ ঢাকা থেকে কুমিল্লা দিয়ে ত্রিপুরা প্রবেশই সহজ মনে করেন মাসুম ভাই। সেদিন ৩১ মার্চ কিংবা ১ এপ্রিল। আমরা বাসে যাচ্ছি। বাস কুমিল্লা যাওয়ার আগেই পাক সেনাদের দু’টি চেক পোস্ট লক্ষ্য করলাম। একটি মেঘনা ঘাটের কাছে অন্যটি ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে। প্রথম চেকপোস্টে আমাদের বাস থামিয়ে পাক সেনারা একজন করে যাত্রীকে বাস থেকে নামায় এবং চেক করে আবার বাসে উঠতে দেয়। শুধু একজনকে অর্থাৎ মাসুম ভাইকে ওরা সন্দেহ করে দাঁড় করিয়ে রাখে। তাকে কিছুতে ছাড়বে না তারা। ছেড়ে দেওয়ার জন্য বাসচালকসহ করলেই অনুরোধ করে এবং মাসুম ভাই নিজেও বলেন, ‘কুমিল্লায় আমার বোনের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছি’। তাতেও কাজ হচ্ছে না। প্রায় ঘন্টা খানেক পর যখন বাস ধীরগতিতে কুমিল্লার দিকে যাচ্ছে তখন হঠাৎ করে মাসুম ভাইকে পাক সেনারা ছেড়ে দেয় এবং উনি বাসে এসে উঠেন।

বাস আমাদের কুমিল্লায় গিয়ে পৌঁছে দেয়। আমরা গোমতীর পাড়ে এক জায়গায় বাস থেকে নামি। আমাদের সঙ্গে নামেন সেখানকার স্থানীয় একটি পরিবার। ওদের সঙ্গে ওখানেই পারিচয় হয়। ওদেরকে বলি, আমরা অমুক গ্রামে যাব- এখান থেকে কিভাবে যায় যায়? ওরা বললেন, গোমতীতে তখন করফিউ চলছে। পাক আর্মিরা টহল দিচ্ছে, যে কোন সময় ফায়ার করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আমরা গোমতী পার হলাম। আমি সাঁতার জনতাম না- তাই স্থানীয় এক লোক কাছে থেকেই চারটি কলাগাছ কেটে নিয়ে এলেন। সেই কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানিয়ে আমরা পার হই। পার হয়ে সেখান থেকে গোকুল নগর নামক সীমান্তবর্তী একটি জায়গায় একটি বাড়িতে উঠি। ওই বাড়িটির এক অংশ ছিল ওপারে ত্রিপুরায়। আমরা ওখানে বিশ্রাম নিয়ে সীমান্ত পার হয়ে কাঁঠাল খেলে আগরতলা চলে যাই। আমরা সেদিনই সীমান্ত অতিক্রম করি।

আগরতলায় একটি ক্যাম্প তৈরী হয়েছিল। কুমিল্লা ত্রিপুরা বর্ডার দিয়ে যারা বাংলাদেশে থেকে যেতো তারা প্রথমে সেখানে গিয়ে উঠত। ক্যাম্পের দায়িত্বে যারা আছেন তারা এসব বাঙ্গালিকে বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং-এর জন্য পাঠান। আমরাও গিয়ে সেই ক্যাম্পে উঠি। ক্যাম্পে মাসুম ভাইয়ের পরিচিত একজনকে পাই এবং বলি আমরা যুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নিতে চাই। তারা আমাদের প্রথমে মেলাঘর নামক অন্য একটি মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে পাঠালেন। এখানে আমরা মেজর হায়দার, ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর দেখা পাই।

মেলাঘর ক্যাম্পে খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল ওসমানী প্রায়ই আসতেন। এই ক্যাম্পে থেকেই আমরা ট্রেনিং নেই। আমাদের কমান্ডো ট্রেনিং দেন মেজর হায়দার। কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার কারণ ঢাকা অপারেশনের জন্য। বিশেষত ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সকলেই কমান্ডো ট্রেনিং নেন। আমাদের আর্মি ট্রেনিং-এর ক্ষেত্র ছিল আগরতলার মেলাঘরের নিবিড় জঙ্গলে। দীর্ঘ ১ মাস ২০ দিন আমরা ট্রেনিং নেই।

কমান্ডো ট্রেনিং নেওয়ার পর আমাদের আরও একটি উচ্চ ট্রেনিং ও চানমারি করার জন্য পাঠানো হয় উদয়নগরের পালাটানায় (ইন্ডিয়ান আর্মিদের ক্যাম্পে)। মেলাঘর থেকে ট্রাকযোগে দূরত্ব ছিল ২ ঘন্টার পথ। এই ট্রেনিং দেন ইন্ডিয়ান আর্মিরা। খুব কঠিন ট্রেনিং ছিল এটি। এই ট্রেনিং শেষে আমরা ৪০ জনের গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করার জন্য আগস্ট মাসের ২ তারিখে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।

আমাদের গ্রুপে লিডার ছিলেন মোশাররফ হোসেন। তিনি কুমিল্লার, কিন্তু ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তার বাড়ি ছিল। আমাদের দায়িত্ব ছিল ঢাকায় প্রবেশ করা। আমাদের সঙ্গে রকেট লাঞ্চার, চাইনজ এলএমজি ১টি, বৃটিশ এলএমজি ২টি, স্টেনগান এবং এক্সপ্লোসিভ, এন্টি-ট্যাংক ও পার্সোনাল মাই, গ্রেনেড ও গুলি ইত্যাদি ছিল। আমাদের প্রথম অপারেশন কুমিল্লার দিঘীর পাড় এলাকাতে। তারপর ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে প্রবেশ করি। আমাদের আগেই বলে দেওয়া ছিল, কিভাবে যেতে হবে, কোথায় গিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান নিতে হবে, সব। এই সব নির্দেশ দেন ইন্ডিয়ান আর্মিরা। তারা বলেন, তোমরা ঢাকার নিকটে অবস্থান নেবে এবং এ্যাটাক করবে আর আমরা ওপর থেকে আক্রমণ করবো।

আমরা সেভাবেই একদিন রাতের বেলা বাংলাদেশে প্রবেশ করি। আমাদের সঙ্গে গাইড ছিল। তাকে অনুসরণ করে ঢাকার দিকে এগুতে থাকি। রাত ছাড়া আমরা মুভ করিনি। সীমান্ত থেকে কুমিল্লার ভিতর দিয়ে এসে ময়নামতি ক্যান্টমেন্টের পিছনে অবস্থান নিই। ধান ক্ষেতের আল ছাড়া রাস্তা দিয়ে কখনও মুভ করিনি। আর প্রয়োজন ছাড়া কখনো গোলা-বারুদ খরচ করতাম না। ইমারজেন্সি ছাড়া অপারেশন করা নিষেধ ছিল। আমাদের ৪০ জনের গ্রুপের মতো বড়-ছোট আরও অনেক গ্রুপ ছিল, যারা সকলেই ঢাকার দিকে এগুচ্ছিল। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের পাশ দিয়ে আমরা ঢাকার দিকে এগিয়ে যাই। সোনারগাঁও এর উদ্দেশ্যে আমরা এগুচ্ছি।

সোনাগাঁও থেকে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার আগে নদীতে পাক আর্মির টহল লক্ষ্য করি। আমরা এলার্ট হয়ে যাই। যদি গানবোট নিয়ে আমাদের দিকে আসে তাহেল আমরা ফায়ার করব নচেৎ নয়। মরণপণ লড়াই করবো। কিছুতেই ধরা দেব না।

যাক, আমরা চুপচাপ নদী পার হয়ে মুন্সিগঞ্জ দিয়ে ধলেশ্বরী পার হয়ে ধলেশ্বরীর পাড়ে অবস্থান নিই। বেশ ক’দিন এখানে থেকে ঢাকার দিকে আসতে থাকি। ইতোমধ্যে মাওয়া, জিঞ্জিরা এই এলাকার প্রায় পুরোটাই মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। আমাদের মতো অন্যান্য গ্রুপও ঢাকার পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অবস্থান নিয়েছে এবং সব গ্রুপের সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব ছিল বুড়িগঙ্গা পার হয়ে ঢাকার বৃহত্তর লালবাগ থানা এলকা দখল করা। আমরা সে অনুযায়ী জিঞ্জিরা থেকে ঢাকার দিকে আসতে থাকি এবং বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে আঁটি বাজারে অবস্থান নিই। এখান থেকে ঢাকার খবরা-খবর নেওয়ার জন্য আমাকে ঢাকার ভেতরে পাঠানো হয়। আমার সঙ্গে খোকন ছিল। সেদিন ১০ ডিসেম্বর। আমি বুড়িগঙ্গা পাড় হয়ে সদরঘাট দিয়ে কিছু রাস্তা হেঁটে কিছু রাস্তা স্কুটারে লালবাগে আমাদের বাসায় আসি। এবং আমি কোন আর্মস নিয়ে ঢুকিনি।

বাসায় থাকা নিরাপদ মনে করলেন না কেউ। তাই দাদীর সঙ্গে আমাকে লালবাগ থেকে এলিফ্যান্ট রোডে ফুপুর বাসায় যেতে হয়েছিল। আমি এলিফ্যান্ট রোডে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত থাকি। এবং সমস্ত খবরা-খবর সংগ্রহ করি। হঠাৎ করে ১৪ তারিখ এলিফ্যান্ট রোডের ওপর ইন্ডিয়ান যুদ্ধ বিমান থেকে পাকিস্তানি আর্মিদের উদ্দেশ্যে শেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে একটি বাসার কাজের মেয়ে ও দুই বাচ্চা মারা যায়। সেদিনই আমি ধানমন্ডিতে আমার আব্বার মামাত ভাইয়ের বাসায় চলে যাই। ঐ বাসায় একটি বাঙ্কারের মতো ঘর ছিল। আমি সেই বাঙ্কারে আশ্রয় নিই, এবং সেখানে থেকে যাই।

১৬ তারিখ ঢাকা শত্রুমুক্ত হলে ১৭ তারিখ ভোর বেলা আমি রওয়ানা হই আমাদের গ্রুপের উদ্দেশ্যে। আমার গ্রুপ বুড়িগঙ্গার ওপারে ১৪ তারিখে বছিলায় একটা সফল অপারেশন করে ১৪ জন পাকিস্তানি বন্দীসহ ঢাকায় ঢোকার পথে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিতে ১১জন শহীদ হন। আমি আমার গ্রুপকে খোলামোড়া ঘাটের এপারে কামরাঙ্গীর চরে তাদের বিদ্ধস্ত অবস্থায় পাই। আমি তাদেরকে কিছু সেবা দেই এবং রাজুর ভাই এর নির্দেশে পাক বন্দীসহ ঢাকার লালবাগে চলে আসি। এবং পাকবন্দীদেরকে পিলখানায় হস্তান্তর করে দেই। একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে সহযোদ্ধাদের মৃত্যুর শোক আমাকে এখনও আবেগ তাড়িত করে।