ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (তৃতীয় অংশ)

Published: Thu, 26 Sep 2019 | Updated: Thu, 26 Sep 2019

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আমাদের প্রশিক্ষণ গেরিলা যুদ্ধের, কিন্তু লাগানো হলো নিয়মিত যুদ্ধে, অথচ এ যুদ্ধে আমরা সত্যি অনভিজ্ঞ। ফলে এ যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায়ই এফএফ যোদ্ধাদের প্রাণ হারাতে হতো। আমরা এফএফদের দিয়ে সীমান্ত যুদ্ধ করানোর ব্যপারে সমালোচনা শুরু করি। এবং কখনো কখনো যুদ্ধে যেতে অস্বীকারও করতে থাকি। একদিন আমাদের ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার ধারণা, কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেন যে, আমরা সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমাদের এই সমালোচনা একদিন বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে, তাই দ্রুত আমাদের দেশের ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ডিফেন্স থেকে ছাড় দিয়ে দেশের ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আমাদের দেশের ভিতরে ঢোকার ২৩ মুক্তিযোদ্ধাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ ২৩ জন হলাম- ১. কুয়াত-ইল ইসলাম, ২. গোলাম মোস্তাফা, ৩. মাহমুদুল আলম, ৪. আব্দুস সামাদ আনসারী, ৫. হাফিজুর রহমান, ৬. এমএ সাত্তার, ৭. শামসুল ইসলাম, ৮. খোরশেদ আলম, ৯. গোলাম সারোয়ার সিদ্দিকী, ১০. রেজাউল করিম, ১১. নুর মোহাম্মদ, ১২. জহুরুল হক রাজা, ১৩. ইদ্রিস আলী, ১৪. দেলোয়ার হোসেন, ১৫. আলতাফ হোসেন, ১৬. মোঃ মোস্তফা, ১৭. আব্দুর রাজ্জাক, ১৮. আলফাজ উদ্দিন, ১৯. মোঃ আলম, ২০. আব্দুর রহমান, ২১. আল-মাহমুদ, ২২. বরাত আলী ও ২৩. অনিল চন্দ্র সরকার।। নাম সম্বলিত তালিকায় স্বাক্ষর করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার এমপিএ ডা. মঈনুদ্দিন আহমেদ। আমরা যখন সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে ঢোকার অপেক্ষায় আছি তখন সোনা মসজিদের কাছে অপারেশনে গিয়ে শহীদ হন বাংলাদেশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নাজমুল।


আমরা ভারতের জলঙ্গী দিয়ে ডিগ্রির চর এলাকায় এসে জনগণের কাছে আশ্রয় নেই। দেখলাম ইতিমধ্যেই ওই এলাকার জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা রপ্ত করে ফেলেছে। গ্রামবাসী বিভিন্ন বাড়ি থেকে চালডাল তুলে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল, কে কোন বাড়িতে থাকবে তার থাকার ব্যবস্থাও তারাই করে দিল। পরের দিন ইলিশ ধরা জেলেদের সহযোগিতা নিয়ে পার হলাম পদ্মা নদী। ঠাঁই পেলাম রাজশাহীর নাটোরের মধ্যে। সেখানে একজন গাইড ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা নিয়ে চলে এলাম চলনবিল এলাকার অষ্টমণীষা মির্জাপুরে। এক গ্রামে আশ্রয়ে থাকার সময় এলাকার লোকজন অভিযোগ করলো যে, গেদু নামের জনৈক ‘মুক্তিযোদ্ধা’ মুক্তিযুদ্ধের দল চালানোর নামে জনগণের কাছে থেকে চাঁদা তুলছে। তার বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগও করলো কেউ কেউ। আমরা ভাবলাম, যদিও এটা আমাদের এলাকা নয়, তবুও এর একটা বিহিত করা দরকার। নইলে মুক্তিযুদ্ধের সমূহ ক্ষতি হবে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে আটক করা হলো। জনসমক্ষে বিচার করে জনগণকে সন্তুষ্ট করে সেখান থেকে বিদায় নিলাম আমরা। এরপর উল্লাপাড়ার নওকর গ্রাম হয়ে আমরা স্থায়ী আস্তানা গড়লাম আমাদের খামার উল্লাপাড়া-সড়াতৈল এলাকায়। 

আগেই বলেছি, আমাদের কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলাম। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯-‘৭০ ছাত্র সংসদ রাকসুর সহ-সাহিত্য সম্পাদক। তিনি এলাকায় এসে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তাব করলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য আমাদের একটা পত্রিকা দরকার। আমরা ভাবলাম, কুয়াত ভাই কবিতা-টবিতা লেখেন, সে বাতিক এ যুদ্ধের সময়ও যায় নি। এখন যুদ্ধের সময় আমরা পত্রিকা করবো কখন? কেউ কেউ দ্বিমত পোষন করলাম, কেউ বা বিরক্তির সঙ্গে নিশ্চুপ রইলাম। তিনি কোথা থেকে একটি প্রেসের খবর নিয়ে এলেন। দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমানের সহযোগিতায় লোক জোগাড় করলেন সে প্রেস আনার জন্য। এক রাতে আমরা সে প্রেস এনে বসিয়ে দিলাম বেলকুচি থানার দৌলতপুর স্কুলের কাছে। পরে দেখেছি, সে প্রেস থেকে অক্টোবরের শেষের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জুলফিকার মতিনের সম্পাদনায় ‘বাংলার মুখ’ নামের একটি পত্রিকা বের হতে। যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রেস থেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের হুশিয়ারী দিয়ে লিফলেটও ছাপা হতো। আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলার মুখ পত্রিকা ও লিফলেট বিলি করেছি। 

আমরা ওই এলাকার কয়েকটি গ্রামে ঘোরাফেরা করি। এতে স্বাধীনতা বিরোধীরা এলাকা ছেড়ে থানা সদরে আশ্রয় নেয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত রক্ষার উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন গ্রামে গ্রাম বৈঠক, ইউনিয়ন বৈঠক, পোস্টারিং, লিফলেটিং করতে থাকি। আমরা চেষ্টা করি জনগণের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য। এদিকে, উল্লাপাড়া স্টেশনের কাছে ছোনতলায় পাক-সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল, তারা অক্টোবরের শেষের দিকে সেখানকার বেশ কিছু যন্ত্রপাতির ক্ষতি করে চলে যায়, এতে আমাদের চলাচলের এলাকা আরো বেড়ে যায়। এ সময় খবর পাওয়া যায় যে, সলপের পাশের বেতকান্দি কামারপাড়ার পাশে অবস্থানরত রাজাকারেরা ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়েছে। খবর পাওয়া পর ওই রাজাকার দলকে ঘেরাও করে ৪০ জন রাজাকারকে ৪০টি থ্রিনটথ্রি রাইফেল সহ আত্মসমর্পন করানো হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে গণআদালত বসিয়ে বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। এতে আমাদের দলে ৪০টি রাইফেল জমা হয়। তখন স্থানীয় ভাবে রিক্রুট করা দল বড় করা হয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে বড় দল কাম্য নয়। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আমাদের দলে থাকা অন্য এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা চলে গিয়ে তাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করবে। এ সিদ্ধান্তের পর উল্লাপাড়ার বঙ্কিরহাটের আব্দুস সামাদ, উল্লাপাড়ার দেলোয়ার, উল্লাপাড়ার ঘাইটনার ইদ্রিস, কাজীপুরের মানিকপটলের আলতাব স্ব স্ব এলাকায় চলে যায়। 

আমাদের গেরিলা গ্রুপের মতোই আরো কয়েকটি গ্রæপ ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে মালিপাড়া পাক-বাহিনী ক্যাম্পে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারিখ নির্দ্ধারণ হয় ২৬ নভেম্বর। এ আক্রমনে যুক্ত হন আব্দুল হাই, আব্দুস সামাদ এবং আমরা সহ আরো কয়েকটি গ্রুপ। আমাদের যুদ্ধের কৌশল ছিল পাক-সেনাদের ওপর আক্রমন করে ভীত-সন্ত্রস্থ করে নিজেদের কোনও ক্ষতি হতে না দিয়ে ফিরে আসা। আমরা সেটাই করি। পরের দিন সকালে খবর আসে যে, পাক-সেনারা মালিপাড়া ক্যাম্প ছেড়ে সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে চলে গেছে। আমরা রাস্তায় তাদের আক্রমনের উদ্যোগ নেই, কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে তারা আগেই পার হয়ে চলে যায়। আমরা তখন মালিপাড়া গিয়ে সেখানে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেই। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে খবর পাওয়া যায় যে, নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক ধরে পাক-সেনাদের বিভিন্ন গ্রুপ ঢাকার দিকে চলে যাচ্ছে। আমরা তাদের ওপর আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেই। আমরা তালগাছীর মাকড়কোড় গ্রামের পাশে নগরবাড়ী-বগুড়া সড়কের নিরাপদ দূরে ট্রেন্স খুঁড়ে পজিশন নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ জনের একটি গ্রুপকে আসতে দেখা যায়। কাছাকাছি এলে তাদের ওপর গুলিও চালানো হয়। কিন্তু তারা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রাস্তার অপর পাড়ে নেমে পড়ে এবং ডাবল মার্চ করে সেখান থেকে চলে যেতে পারে। আমাদের অনভিজ্ঞতাই হয়তো তাদের বাঁচিয়ে দেয়। 


ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে বিজয়ের শুভক্ষণ। ১৬ ডিসেম্বর, আমরা সেদিন চরনবীপুর গ্রামে শেল্টার করে আছি, সে গ্রামেই আমরা খবর পাই যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা বিজয়োল্লাস করতে করতে শেল্টার থেকে বেড়িয়ে আসি। এবং প্রকাশ্যে এসে সেদিনের মতো ক্যাম্প করি চরনবীপুর স্কুল প্রাঙ্গণে। 

সকল মুক্তিযোদ্ধা প্রকাশ্যে চলে আসে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এলাকার প্রধান মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প হয়ে ওঠে এনায়েতপুর বেতিলে। আমরাও সেই ক্যাম্পে যোগ দেই। এর মধ্যে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের পর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের মহুকুমা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। ফিরে যাই কলেজে।  
[সমাপ্ত]

 

/এসিএন