যুদ্ধকথা : বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজার রহমান

Published: Mon, 07 Sep 2020 | Updated: Mon, 07 Sep 2020

আমি মো. আজিজার রহমান নীলফামারী মহকুমার জলঢাকা থানার কাঁঠালি ইউনিয়নের কাঁঠালি গ্রামে ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা মো. কাছিম উদ্দিন (কাছুয়া মামুদ) পেশায় একজন কৃষক ছিলেন এবং মাতা মোছা. আছিয়া বেগম একজন গৃহিণী ছিলেন। আমারা দুই ভাই বোন। আমার অবস্থান দ্বিতীয়।

প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর শালডাঙ্গা হাই স্কুলে ভর্তি হই। দিনাজপুর জেলার দেবীগঞ্জ থানার শালডাঙ্গা ইউনিয়নে এক ভগ্নিপতির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে থাকি। আমি নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান শুনতাম। ৭ মার্চের ভাষণ রেডিওতে শুনি। শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণে যুদ্ধের আগাম বার্তা পৌঁছে দেন। দেবীগঞ্জে এসে আমি ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। দেশের হালচাল প্রতিনিয়তই বিবিসি বাংলা খবর থেকে শুনতাম। ২৫ মার্চ রাতের বীভৎস চিত্রগুলো সম্পর্কে রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাই। মাথায় খুন চেপে বসে। দু’-একদিনের মধ্যেই চারদিকে ধরপাকড় শুরু হয়ে যায়। সেনাবাহিনী আর রাজাকার গুণ্ডাদের জ্বালাও-পোড়াও হত্যাযজ্ঞ দিনদিন বাড়তে থাকে।

এদিকে আমার এসএসসি পরীক্ষা। দেশ নাকি পরীক্ষা আগে এই কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল? অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যে করেই হোক যুদ্ধে যেতে হবে। এই নরপিশাচের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।

বাড়ির সবার জোরজবরদস্তিতে স্কুলে টেস্ট পরীক্ষার হল পর্যন্ত যাই এবং কোনরকম খাতায় নাম বসিয়ে টেবিলের উপর রেখে বের হয়ে আসি। এই অবস্থা দেখে স্যার বলল, কী খবর, আজিজ! বসতে না বসতেই প্রকৃতির ডাক? শরীর খারাপ করলো নাকি?  জ্বি স্যার, শরীর মন দু’টাই খারাপ। বের হয়ে আমার বন্ধু অলিয়ারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলি। যে করে হোক ভারতে যেতে হবে। সেখানে নাকি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে? আমাদের ট্রেনিং নিতে হবে এবং দেশের এই ক্রান্তিকালে যুদ্ধ করতে হবে। শত্রুমুক্ত স্বদেশ গড়তে হবে। অলিয়ার আমার কথায় রাজি হয়ে গেল।

বাড়ি এসে শুনতে পাই দিন-দুপুরে দেবিগঞ্জ থেকে যুবক ছেলে-মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং নদীর পারে নিয়ে জবাই করে পানিতে ফেলে দিচ্ছে। কী নরপিশাচ রে বাবা! গা কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমার এক বন্ধু নোয়াবু কবিতার ছন্দে বলল,

‘বাঁচতে হলে লড়তে হবে
ছাড়তে হবে এ দেশ,
বীরের বেশে ফিরতে হবে
গড়তে সোনার দেশ।’

তার কথা শুনে বাসার দিকে এগিয়ে আসি। বিকেলের দিকে শুনতে পাই নোয়াবুকে ধরে নিয়ে গেছে রাজাকার। একথা শোনামাত্রই আঙুল দিয়ে দু’কর্ণ চেপে ধরি। কী হচ্ছে দুনিয়ায়? অলিয়ারসহ ভারতের দিকে শুরু করি ম্যারাথন দৌড়। শালডাঙ্গা থেকে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দেওয়ানগঞ্জের বগদুলঝুলা দিয়ে প্রবেশ করি। সারারাত ধকল সহ্য করতে হয়েছে। সকালবেলা আট আনা দিয়ে একটা রুটি আর চার আনা দিয়ে এক কাপ দুধ দু’জনে ভাগ করে খাই। তারপরে ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাই। দেওয়ানগঞ্জ যুব শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন আফসার আলী আহমদ এমএনএ। সেখানে রিক্রুট করে আমাদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠায়।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূর্তি পাহাড়ে মূর্তি ক্যাম্প নামক (মুজিব ক্যাম্প)এ যাই। আমরা যারা যুদ্ধে যাবো তাদেরকে একত্রিত করা হয়। সেখানে ছিল দেবী চরণ (লক্ষ্মীচাব), যাদব (লক্ষ্মীচাব), নবীন চন্দ্র বর্মন (ঐ), মনোধর বর্মন (ঐ), মদন চন্দ্র বর্মন (ঐ), অরবিন্দ রায় (ঐ), সুনীল চন্দ্র মহন্ত (ঐ), দিনাজপুরের অলিয়ারসহ আরো অনেকে।

গাড়িতে উঠলাম। সারাদিন চলে গাড়িটি রাত্রিবেলা ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে আরো শত শত যোদ্ধা অপেক্ষা করছে। অনেকেই এসে জিজ্ঞেস করল, কে, কোথা থেকে আসা হলো? কোনো পরিচিত কেউ আছে কি না ইত্যাদি। 

আমরা জলঢাকা থেকে ৩২ জনের একটা গ্ৰুপ হলাম। বেশির ভাগ সহযোদ্ধা ছিল লক্ষ্মীচাবের। লক্ষ্মীচাব ইউনিয়ন আগে জলঢাকা থানার অধীনে ছিল এখন নীলফামারী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবাই মিলে ২১ দিন প্রশিক্ষণ নিলাম। আবার অনেকে ৩০ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিল। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের চানমারি নিয়ে যাওয়া হয়। পাহাড়ের ঢালু পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। কিছুদূর গিয়ে সবাই চানমারির প্রস্তুতি নেই। অনেকেই প্রথমদিকে টার্গেট করেও লক্ষ্যবস্তুতে হিট করতে পারেনি। কিন্তু আমার প্রথম ফায়ারে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা (নামটা মনে নেই) আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, তুম মুজাহিদ হায়। মুখটা লাল হয়ে গেছে রাগে। আমি তাকাতে পারছি না। আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে থাকে, কিছুই বুঝতে পারি না। কী হচ্ছে এসব? পাশে দেখি আফসার আলী আহমদ এমএনএ, আমিন বিএসসি এমএনএ, জনাব উকিল, আব্দুর রউফ এমএনএ, আজহারুল ইসলাম এমপিএ সকলে বসে আলোচনা করছেন। তাঁদেরকে দেখে দু’চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি ঝরতে লাগল। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, ‘রউফ ভাই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।’ আর কিছুই বলতে পারিনি।

রউফ ভাই ইশারা দিয়ে বললেন, উসকো কিয়া করতাথা?
: সাচ্চা মুজাহিদ হ্যায়।
: নেহি উসকা স্টুডেন্ট হ্যায়।
: নেহি উসকো মুজাহিদ হ্যায়, নো আনসার হ্যায়।
: মেরা ঘর কা ছেলে হ্যায়, ছোড়দো উসকো ।
তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। ওই সেনা কর্মকর্তা বললেন, উসকো টারগেট বিলকুল ঠিক হ্যায়, এ মুজাহিদ প্যাহেলা রাউন্ড মিনারকা লাগাতাথা। 

রউফ ভাই কিছু না বলে, আমাকে টেনে নিলেন। মনে মনে বললাম আর এরকম হবে না। টার্গেটে আঘাত করাটা কী আমার অপরাধ? আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্য। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। 

দু'একদিন পর আমরা পঞ্চগড়ের বোদা থানায় যাত্রা করি। সেখানকার রঙ্গিয়ানী হাটে খরচ করি যাতে ক্যাম্পে রান্না করে খাওয়া দাওয়া করা যায়। অপারেশনের জ‌ন্য প্রস্তুতি নেই। আমার বডি নম্বর হলো ১৫৭/২৮। দিনের বেলা রেকি করে এসে আমাদের সমস্ত খবরা-খবর জানানো হয়। রাত হলেই আমরা হামলা চালাই। ভুল্লীতে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর হানা দেই। আমাদের আক্রমণে মারা যায় দুইজন রাজাকার আর পাঁচজন-ছয়জন পাকসেনা। বাকিরা ভীত হয়ে কোনো রকম পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আমরা ক্যাম্প থেকে দুইজন মেয়েকে উদ্ধার করি বিবস্ত্র অবস্থায়। সমস্ত শরীরে নরপিশাচের খাবায় খানখান হয়ে আছে। নখের আঁচড় আর কামড় দিয়ে সমস্ত শরীরকে বিষিয়ে তুলেছে। সুন্দর মুখখানা ভয়ে-আতঙ্কে নীল বিষ হয়ে আছে। তাঁদের গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেই। সেদিন এই দৃশ্য দেখে আমার মাথায় খুন চেপে ধরে। হায়েনাদের ধরে ফালি ফালি করে কেটে আগুনে জ্বালিয়ে দেই। তবুও যেন রাগ থামতে চায় না। এখনো বলতে গেলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।

এরপরে অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নেই ঠাকুরগার উদ্দেশ্যে। দলের সবাই ধীরে ধীরে পজিশন নিয়ে যাই। ফায়ারিং করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই। পাকবাহিনীর সাথে মুখোমুখি গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে একের পর এক ধরাশায়ী হয়ে পড়তে থাকে পাকসেনা আর রাজাকার গুণ্ডারা। সেখানে আর টিকতে পারল না। পাকিস্তানি সেনাসদস্যরা পালাতে লাগল কাঞ্চন ব্রিজের দিকে। ব্রিজ পার হয়ে আমাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য গোলার আঘাতে ব্রিজটি ভেঙে দেয়। ঠাকুরগাঁও মুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা ফিরে আসি ক্যাম্পে। কোথাও কোনো পাকবাহিনী নেই। 

সকলে মিলে মিলিশিয়া ক্যাম্পে অবস্থান করি। এই ক্যাম্পেই কেউ আনসারে, কেউ পুলিশে, কেউ সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। অনেক দিন থেকে বাড়ির বাইরে আছি, মা-বাবাকে দেখার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে। মিলিশিয়া ক্যাম্প থেকে মেজর ছদর উদ্দিন আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যান। তিনি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। বেগম জিয়ার শাসনামলে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে মারা হয়।

যুদ্ধ শেষ হলেও আমার যুদ্ধ শেষ হয়নি। চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতাম। জনমানবশূন্য এলাকা, কোথাও কেউ নেই। কোথায় কী হয়েছে সেসব তথ্য সংগ্রহ করি। ঠাকুরগাঁওয়ের পশ্চিম পাশে একা একা হাঁটি। কোথাও কাউকে চোখে পড়ছে না। একটা গন্ধ। নাকে আসতেই থমকে দাঁড়াই। চোখ তুলে তাকাতে বীভৎস চিত্রটি দৃশ্যমান হয়। সেখান থেকে একদৌড়ে ফিরে আসি মেজর ছদর উদ্দিন সাহেবের কাছে। সব কিছু বলি এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধাসহ চলে যাই সেখানে। মানুষের লাশগুলো স্তুপে স্তুপে পড়ে আছে। কিছু লাশ থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হয়ে আসছে। সারি সারি পিঁপড়া লাইন ধরে লাশের ভিতরে প্রবেশ করেছে। মশা-মাছির উৎপাত বেড়ে গেছে।

মেজর ছদর উদ্দিন সাহেব বললেন, দ্রুত কবর দেয়ার ব্যবস্থা করো, এভাবে রাখলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। কোনো উপায়ন্তর না দেখে সকলে মিলে একটা পুকুর খনন করি। সেখানেই লাশগুলো শায়িত করে মাটি দেই। বর্তমানে সেখানে শহীদ মিনার তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকার।

পাকবাহিনীর সদস্যরা যে ডাকবাংলোতে থাকতো তার আশেপাশে কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু রুমের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি মদ আর সিগারেটের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সামনে এগোতেই একটা মেয়ের লাশ দেখতে পাই। মাথার চুলগুলো পিছন দিক থেকে ঢেকে রেখেছে। দু’জন মিলে এগিয়ে যাই। কাছে গিয়ে দেখি মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে রোয়াকে জমাট বেঁধে আছে। শরীরে কোন কাপড় নেই। 

ছেলে মানুষ মারা গেলে চিৎ হয়ে পড়ে থাকে কিন্তু মেয়ে মানুষ মারা গেলে নিজের লজ্জাস্থান ঢেকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। এটা সেদিনই প্রকাশ পেল আমার সামনে। তাঁকে নিজ হাতে কবর দিয়ে এসেছি। এখনো সে কবরটা আছে। এরপর ঠাকুরগাঁয়ের ইপিআর হেডকোয়াটারে অস্ত্র জমা দেই।

যোদ্ধাজীবন শেষ করে গ্রামে ফিরে আসি। অভাবের সংসারে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কাজের সন্ধান করতে হয়। কোথাও কোনো কাজ না পেয়ে রাগে-দুঃখে কৃষি কাজ করতে বাধ্য হই। টানাপোড়েনের সংসারে ১৯৭২ সালের শেষ দিকে বিয়ে করি। বর্তমানে আমি পাঁচ সন্তানের জনক। তারা হলো আফরুজা বেগম, টুলটুলি আক্তার, মিলনুর রহমান মিলন, মশিয়ার রহমান, সাহানাজ পারভিন।

অনুলিখন : হাসান সোহেল

ও/ডব্লিউইউ