যুদ্ধকথা : বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল গফফার

Published: Wed, 26 Aug 2020 | Updated: Wed, 26 Aug 2020

আমি মো. আব্দুল গফফার নীলফামারীর জলঢাকা মহকুমার বালগ্রাম পোস্ট অফিসের অন্তর্গত পশ্চিম বালাগ্ৰাম গ্ৰামে ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ জন্ম গ্রহণ করি। পিতা মো. জামাল উদ্দিন পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। মাতা মোসাম্মাৎ গোলেমন নেছা গৃহিণী ছিলেন। আমরা চার ভাই চার বোন। আমি ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। চাচা আফছার আলী আহম্মেদ প্রাক্তণ এমএনএ। 

ব্রহ্মত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করি। ১৯৬৯ সালে জলঢাকা সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পাশ করে রংপুর কারমাইকেল কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হই। কলেজ হোস্টেলে থাকা অবস্থায় ‘মাসিক সন্ধানী’ পত্রিকা বের করি। সেনা শাসকের অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বাঙালি জনসাধারণকে আন্দোলন-সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করি। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় করতে থাকি এসব বিষয়ে।

ছোটবেলা থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। জলঢাকায় থাকাকালীন অবস্থায় ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জলঢাকা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণের সংগঠনে দায়িত্ব নিয়ে মাঠে-ময়দানে কাজ করতে থাকি। চারদিকে জুলুম-নিপীড়ন শুরু হয়ে গেলে জনগণের স্বার্থে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। ১৯৭০এর নির্বাচনেই আমাদের বাঙালির মুক্তির পথ, নির্বাচন আমাদের শাসন-শোষণ জুলুম নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র পথ -এ লক্ষ্যে বাঙালি জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করি। অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, শিল্প-কারখানা সবদিক থেকে রংপুর পিছিয়ে ছিল। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলার জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়ায়।। বাংলার মানুষ মুসলিম লীগের বলয়বৃত্ত ভেঙে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আর ছাত্রদের ১১ দফা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে মানুষকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন আমরা জয়লাভ করি।

নির্বাচনে জয়লাভের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাশাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতার মঞ্চে বসে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করলে তা ভুট্টো খানের চক্রান্তে বাতিল হয়ে যায়। এরূপ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যাসেম্বলিতে যোগদান থেকে বিরত থাকেন এবং ২ মার্চ সারাদেশে হরতালের ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সারাদেশে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। সারাদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে ।

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ জনতাকে সামনে রেখে এক সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন তিনি। সেদিন তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো।’ তিনি স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বাঙালি জনতাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে নিজ নিজ অঞ্চল থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ভুট্টো খানের সাথে ইয়াহিয়া খান পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা অঙ্কন করেন। সে অনুযায়ী ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহর শ্মশান করে দেয়। এরপর ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানে। দেশের প্রধান প্রধান শহরে অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। দিনে-দুপুরে যুবক ছেলেদের ধরে নিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না তারা। মা ও শিশুদের নিয়ে পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে রংপুর শহরে আর থাকতে না পেরে না চলে আসি জলঢাকায়। দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি, মনসুর আলী, মিজানুর চৌধুরী (সংসদ সদস্য), ফজলুল হক, দুলাল চৌধুরীসহ জলঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়ে হাতে হাত রেখে শপথ গ্রহণ করি। দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকতে এদেশে স্বৈরাচারী সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত রণাঙ্গণ ছাড়বো না বলে শপথ নেই। এরপর দিকবিদিক না দেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে ডিমলা দিয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার দেওয়ানগঞ্জ যাই। দেওয়ানগঞ্জ যুব শিবিরের দায়িত্বে ছিলেন আফসার আলী আহমদ (এমএনএ)। যুবশিবিরে রিক্রুট করে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। আমাদের মেডিকেল করানোর পর একটা গাড়ি আসলে সবাই তাতে ওঠার পর মুজিব ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে চলল।

আমরা প্রত্যেকে একা একা যেভাবে পারি যুদ্ধে যোগ দেই। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মূর্তি পাহাড়ে ক্যাম্প করা হয়েছে। বিএলএফ নামে একটি বিশেষ ক্যাম্প ছিল। বিএলএফ অর্থ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট যা মুজিব বাহিনী হিসেবে পরিচিতি। এ ক্যাম্পে ২৯ দিন প্রশিক্ষণ নেই। এসএলআর, এলএমজি, এলএমজি, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, মর্টার, গ্ৰেনেড, মাইন প্রভৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে জ্ঞান দান করা হয়। ক্যাম্প কর্মকর্তা আমাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইন্টেলিজেন্স এবং সিগন্যাল শাখায় পাঠায়। সেখানে আরো ২৯ দিন প্রশিক্ষণ নেই। বিভিন্ন সংকেতের মাধ্যমে সংবাদ আদান-প্রদান ব্যাপারটা দক্ষতার সাথে শিখে ফেলি। আমার প্রশিক্ষক ছিলেন ভগবান সিং। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও আমি চিঠির মাধ্যমে স্যারের সাথে যোগাযোগ রাখি। আমার বডি নাম্বার S/সিগ-২৫।

প্রশিক্ষণ শেষে মানিকগঞ্জের পাশে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বড়শশী বোদা থানায় ক্যাম্প স্থাপন করি। বর্তমানে শহিদুল ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়িটি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইন্টেলিজেন্স শাখায় কাজ করা অবস্থায় চিলাহাটি নামক স্থানে দিনের বেলায় রেকি করি। এক একদিন এক এক ধরনের বেশ নিয়ে বের হই। কখনো কৃষক, কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো হাঁটুরে হয়ে ঘুরে বেড়াই। একদিন সবকিছু দেখে এসে অপারেশনের প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি ভোররাত্রে মুক্তিরহাট নামক স্থানে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ করি এবং পাকসেনাদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হই। কোনো প্রকার জীবন নিয়ে দলবলসহ ক্যাম্পে ফিরে আসি। সেদিন সেখানে আমাদের দু’জন সসহযোদ্ধকে হারাই। 

এ সময় আমার সাথে ছিল মেজর গোলাম রব্বানী কোম্পানি কমান্ডার, দেবিগঞ্জ পঞ্চগড়ের জলিল ভূঁইয়া, লালমনিরহাটের শহীদুল্লাহ, রংপুর পীরগাছার আব্দুস সালাম এবং আমি সেকশন কমান্ডার হিসেবে কাজ করি। কখনও ভাউলাগঞ্জ-চিলাহাটির দিকে রেকি করতাম। এ কাজের জন্য মাঝেমধ্যে কারো বাড়িতে থাকতে হতো। আব্দুল জব্বারের বাড়িতে আমি থাকতাম। তিনি বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। তাঁর বাড়িতে থেকে দিনে খোঁজখবর নেই এবং এ রিপোর্টের ভিত্তিতে রাতের দিকে অপারেশন করি। রিপোর্টের ভিত্তিতে চিলাহাটি রেলব্রিজ অপারেশন করা হয়। সৈয়দপুর থেকে খান সেনারা রেলপথে রসদ ও সৈন্য সরবরাহ করতো। এজন্য রেলব্রিজটি ধ্বংস করা জরুরি হয়ে পড়ে। হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে একদল যোদ্ধা সেখানে উপস্থিত হয়ে অবস্থান নেয়। আমাদের সামান্য ভুলের জন্য সেদিন অপারেশন সফল হয়নি।  ওই যুদ্ধে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

এভাবে যুদ্ধ পরিচালনার কাজ করতে থাকি। শেষের দিকে এসে পাক বাহিনীর ক্যাম্প পেয়ে আক্রমণ করতে গিয়ে আমার দু’জন সহযোদ্ধাকে হারাই (এই মুহূর্তে তাদের নাম মনে পড়ছে না)। মুক্তিরহাটকে শত্রু মুক্ত করে সহযোদ্ধা দু’জনকে কবর দিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যাই। একের পর এক যুদ্ধ করতে থাকি আর সাফল্য অর্জন করি। সম্ভবত ১২ ডিসেম্বর জলঢাকা হানাদার মুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমরা সেক্টর কমান্ডারের কাছে অস্ত্র জমা দেই।

ফিরে আসি আপন গৃহে। আবার পাঠচর্চায় মনোনিবেশ করি। ১৯৭২ সালে এইচএসসি পরীক্ষা পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। সেখানে ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। রাকসুর আন্তঃসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। অধ্যায়নরত অবস্থায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে দেশের মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। আমাকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। এদিকে পরিবারের সবাই বলতে থাকে আমাকে মেরে ফেলা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল সেনাসদস্যরা নির্যাতন চালাতো আমার ওপর। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে মৃত্যুকূপ থেকে বেঁচে যাই।

১৯৭৫ সালে শামীমা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে জলঢাকা কলেজে গ্রন্থাগার হিসেবে নিয়োগ পাই। বর্তমানে আমি দুই সন্তানের জনক। মেয়ে শাকিলা খাতুন। ছেলে রসায়নবিদ মো. সাদিক-উল ইসলাম। আমার বর্তমান ঠিকানা নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার আঁচলের কলেজ পাড়া। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করি। ২০১৩ সালে জলঢাকা সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করে বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছি। 

অনুলিখন হাসান সোহেল

ও/ডব্লিউইউ