সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

Published: Mon, 16 Mar 2020 | Updated: Mon, 16 Mar 2020

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছে। খুঁজে ফিরেছে নিরাপদ আশ্রয়, স্বজনরা স্বপ্ন দেখেছে দেশ যেন হানাদার মুক্ত হয়; যারাই এ স্বপ্ন নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে আমি তাদেরই একজন। 

আমি হাসান আনোয়ার, জন্ম- ১৯৫৩ সালের ১৮ জুলাই। পিতা- করম আলী শেখ, ছোটখাট ব্যবসা করতেন। মাতা- লাবনী বেওয়া গৃহিনী। গ্রাম- দিয়ারধানগড়া, সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকা। পড়াশোনা তেমন না করতে পারায় ১৯৬৮ সালে বাবা আমাকে সন্ধ্যা স্টোরে ইলেকট্রিক কাজ শিখতে দেন। কিন্তু একটি ছোট দুর্ঘটনার কারণে বাবা সেখান থেকেও ছাড়িয়ে নিয়ে পাঠিয়ে দেন খুলনায়। সেখানে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করি মোহসীন জুট মিলে।

সিরাজগঞ্জ থাকতেই আমি মোজাফ্ফর ন্যাপ সমর্থক, খুলনা গিয়ে সহজেই সম্পৃক্ত হই সে দলের সঙ্গে। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে যোগাযোগ গড়ে ওঠে খুলনার প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা আশরাফ আলী ভাইয়ের সঙ্গেও। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন, বন্ধ হয়ে যায় মিলকারখানা। মোহসীন জুট মিল খুলনা শহর থেকে দূরে হওয়ায় আমরা মিল এলাকায় প্রতিদিন মিছিল করি, শ্লোগান তুলি স্বাধীনতার পক্ষে। 

এ সময় খুলনায় বিহারী বাঙালি ‘রায়ট’ শুরু হয়। আমরা সে খবর পেতাম মিলে থেকেই। এর মধ্যেই ২৫ মার্চ ঢাকাসহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকাগুলোতে নিরীহ বাঙালিদের ওপর হামলা চালায় পাকবাহিনী। এতে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ। এ পরিস্থিতিতে বিদেশ-বিভূঁইয়ে পড়ে থাকা ঠিক নয় বলে মনে হয়, আমরা সিরাজগঞ্জের লোকজন খুলনা ছেড়ে রওনা হই বাড়ির দিকে।

২৭ মার্চ আমরা সিরাজগঞ্জের ১৪ জন রওনা দেই নিজ এলাকার দিকে। দীর্ঘ হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের আসতে হয় নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে। পথে পথে পাকবাহিনীর নির্যাতনের চিহ্ন, কোনও কোনও গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে লাশ পড়ে আছে, বিশেষ করে যশোর নওয়াপাড়ায় অনেকগুলো লাশ আমরা দেখতে পাই। আবার পাকসেনাদের প্রতিরোধের চিহ্নও চোখে পড়েছে সহজেই। এমন দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের চলার পথে সাধারণ মানুষ যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তা অতূলনীয়। 

পথের মানুষকে ডেকে নিয়ে ডাল-ভাত খাওয়ানো, রাতে আশ্রয় দেওয়া, পরের দিন কোন পথে যেতে হবে তা দেখিয়ে দেওয়া- এভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছে সাধারণ মানুষ। মোট ছয় দিন হেঁটে হেঁটে সিরাজগঞ্জ চলে আসি আমরা, তখনো মুক্ত সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন আর বাঙালিদের প্রতিরোধ চেষ্টার স্মৃতি নিয়ে ফিরে এসে শুনতে থাকি নানা গুজব। শোনা যায়, অমুক জায়গায় বিহারীরা নির্বিচারে হত্যা করছে বাঙালিদের, সর্বস্ব হারিয়ে এলাকায় ফিরে আসছে তারা। 

বাঙালিদের অনেকেই বিহারীদের ওপর মারমুখী হয়ে উঠতে থাকে, ফলে খুলনার মতোই বাঙালি-বিহারী ‘রায়টের’ আভাস পাওয়া যায়। ভীতসন্ত্রস্থ মানুষ শহর ছাড়তে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপস্থিতিতে একদম শেষ মূহুর্তে কিছু উগ্র মানুষ বিহারীদের হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করে। সেদিনই আমরা পরিবারের সবাই শহর ছেড়ে চলে যাই শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামে। সেখানে আমাদের আশ্রয় দেয় এক অনাত্মীয় পরামত্মীয় হয়ে। পরের দিন সে গ্রামে থেকেই জ্বলতে দেখি সিরাজগঞ্জ। গোলাগুলির শব্দও পাওয়ায় যায়।

নানা গুজব গুঞ্জণ শুনতে শুনতে কয়েক দিন পর শহরের পরিস্থিতি বুঝতে, নিজেদের বাড়িঘরের অবস্থা দেখতে চলে আসি সিরাজগঞ্জে। গ্রামের ঢোকার সময় দেখা হয় গ্রামের মাহমুদ নামের একজনের সাথে। সে শহর থেকে কিছু লুটের মাল নিয়ে যাচ্ছিল। সে জানালো, মিলিটারি আসার আগে থেকে শহরে লুটপাট শুরু হয়। যে যেখান থেকে পারছে, মালামাল লুটে নিচ্ছে। শহরে যাওয়া যাবে কিনা এ প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো, মাথায় সাদা পট্টি লাগাতে হবে, তাহলে পাকবাহিনী মনে করবে যে তুমি বিহারী, তাহলে ওরা তোমাকে কিছু বলবে না। 

খুলনায় থাকার সময় বেশ ভালোই উর্দু রপ্ত করেছিলাম, সে সাহসে মাহমুদের সহযোগিতায় মাথায় পট্টি বেঁধে নিলাম, আল্লা ভরসা করে রওনা হলাম শহরের দিকে। রেললাইন পার হতেই দেখলাম, সেখানে (বর্তমান উপজেলা তহশিল অফিস) পড়ে আছে এক বাঙালির গুলিবিদ্ধ লাশ। ভয়ে ভয়ে রওনা হলাম সিরাজী সড়ক ধরে, মোক্তারপাড়ার মোড় পার হওয়ার সময় দেখি দুই সেনাসদস্য আসছে এদিকেই। ওদের দেখেও না দেখার ভান করে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু ওরা এসে ধরে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, মাকান কিধার? আমিও বলি, ইস শহরমে। ‘যায়েগা কিধার?’ ‘ইধার।’ ওরা আর কিছু বলে না। 

কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখতে পাই জিন্নাহ রোডের (বর্তমান এসএস রোড) মোড়ে পড়ে আছে আরো একটি লাশ। বড় বাজারের কাছাকাছি যেতেই দেখলাম, বড় পুলের দিক থেকে একটি জিপ গাড়ি এগিয়ে আসছে। তখন ঘুরে রওনা হলাম বড় পোস্ট অফিস ধরে। কাপুড়িয়া পট্টির মাঝামাঝি এসে ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলাম বাড়ির পাশের গলি দিয়ে হাঁটা দিলাম রেললাইনের দিকে। লাইনে ওঠার আগেই দেখলাম, একটু বাক্স পড়ে আছে, কিন্তু তা অনেক ওজনের জিনিষপত্রে ঠাঁসা। ওটা রেখে চলে এলাম গ্রামের পীর সাহেবের বাড়ির সামনে। সেখানে পীর সাহেবের বেশ কিছু মুরীদ- যাদের কয়েক জন স্থানীয় হলেও বেশীর ভাগই বাইরের লোক। তাদের জানালাম বাক্সের কথা। ওরা বাক্সটি এনে খুলে দেখলো, তা গুলিতে ঠাঁসা। সেদিনই ফিরে এলাম চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামে।

শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনের পর তাদের কথায় কেউ কেউ শহরে আসতে শুরু করে। আমাদের গ্রামে অন্যের বাড়িতে থাকার চেয়ে নিজের বাড়ি শহরতলীতে ফিরে আসি। একদিন গ্রামের আব্দুল বারীর বাবা সবদের আলীকে ধরে নিয়ে যায় সোলেমান বিহারীর ভাইসহ দুই বিহারী। আবু তাহেরের চাচা ফেদু মুন্সীকেও ধরে নেয় বিহারীরাই। আরেক দিন আমার মামা ফটিক আলী শেখ, আমালু শেখ ও রাখালকে ধরে নিয়ে যায় আবুল মেম্বার, সাত্তার মেম্বারসহ পীরের মুরীদেরা। পরের দিন মামাকে খুঁজতে যাই জেলখানার ঘাটে। দেখতে পাই মামার মামার লাশ পড়ে আছে নদীর কুলে। কিন্তু সে লাশ ছুঁয়ে দেখার সাহস পাই না। এ সময় মিলিশিয়া এসে ধমকাধমকি করায় চোখের পানি ফেলে চলে আসি সেখান থেকে।

আমি জানি যে, আমাদের দল মোজাফ্ফর ন্যাপ স্বাধীনতার পক্ষে, তাই ভিতরে ভিতরে দলের নেতাদের খোঁজ করতে থাকি। খবর পাই যে, আমাদের নেতা রেজাউল করিম সূর্য ও জাহেদুল ইসলাম রন্টু আছেন রন্টু ভাইদের গ্রামের বাড়ি কামারখন্দ থানার চৌদুয়ার গ্রামে। খবর পেয়ে আমি, একরাম, সালাম ও লাল চলে যাই সে গ্রামে। দেখা হয় সূর্য ভাই আর রন্টু ভাইয়ের সঙ্গে। তারা ধমকাধমকি করলেন। বললেন যে, ‘বিশ্বসেরা’ পাকিস্তান সেনাবাহিনী সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতা অসম্ভব ব্যপার।’ নেতাদের কথায় হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি শহরে। 

এদিকে, কষ্টেসৃষ্টে শহরে থেকেই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রার খবর পাচ্ছিলাম। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বড় ধরণের যুদ্ধের আশংকা করি। সিরাজগঞ্জ শহরকে ঘিরে, তখন আবারো চলে যাই চন্ডিদাসগাঁতীর সেই অনাত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে। সেখান থেকেই খবর পাই সিরাজগঞ্জ শহর মুক্ত হওয়ার।

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম