সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু

Published: Sat, 27 Jun 2020 | Updated: Sat, 27 Jun 2020

রফিকুল ইসলাম তালুকদার দুল্লু আমার নাম। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে পিতা জালালউদ্দিন তালুকদার ও মাতা সফুরা খাতুনের ঘরে ১৯৫৪ সালে আমার জন্ম। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ছিলেন। আমার মেজো চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার তখন মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমিও আওয়ামী লীগের সমর্থক।

সত্তর সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার কাজীপুর-সিরাজগঞ্জ আসন থেকে এমএনএ নির্বাচিত হন। এক সময় শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরীহ মানুষের ওপর পাকসেনারা হামলা চালায়। তখন সবকিছুই এলেমেলো হয়ে যেতে থাকে। চাচা মোতাহার হোসেন তালুকদার চলে যান ভারতে। 

সিরাজগঞ্জে পাকসেনারা আসার আগমুহূর্তে চাচার পরিবার শহরের বাড়িঘর ফেলে চলে আসে আমাদের গ্রামে। বড় চাচার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম তালুকদার মিন্টু ভাইও সপরিবারে গ্রামে চলে আসেন। আমার বড় ভাই সাইফুল ইসলাম পাবনায় পড়াশোনা করতেন। তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। মিন্টু ভাই নিয়ে এসেছিলেন বেশ কয়েকটি রাইফেল। 

একদিন আমার আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদার তিনি রাইফেল হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ফায়ার হয়ে যায়। মিন্টু ভাই এসে তাঁকে অনেক ধমকাধমকি করেন। একদিন পাকসেনারা বাগবাটীতে এসে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। পুড়িয়ে দেয় শত শত বাড়িঘর। বাগবাটী গণহত্যার দু’তিনদিন পরই মেজো চাচার পরিবার ও তাঁর আনা রাইফেলগুলো নিয়ে মিন্টু ভাই ভারতে যাওয়ার জন্য রৌমারীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। এরপর আমার ভাই সাইফুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ গ্রামের অনেক তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারত চলে যান।

এদিকে, বাগবাটী গণহত্যার পর আমাদের গ্রামের মানুষের ধারণা হয় যে, এ গ্রাম যেহেতু এমএনএ মোতহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম, তাই এ গ্রামেও এসে তাণ্ডব চালাবে পাকসেনারা। ফলে গ্রামের মানুষ অন্যান্য গ্রামে বিশেষ করে সড়াতৈল গ্রামে রাতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। দিনের বেলায় তারা ফিরে এসে বাড়িতে থাকত। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে আত্মীয় বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। এর মধ্যে একদিন বাহুকা গ্রামের বাসিন্দা পুলিশে কর্মরত সোলায়মান আসেন রাইফেলের খোঁজে। কিন্তু রাইফেল না পেয়ে তিনিও চলে যান ভারতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।

ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকসেনাদের যুদ্ধও সংঘটিত হতে থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহসও বাড়তে থাকে। কিন্তু মোতাহার হোসেন তালুকদারের গ্রাম বলে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামে সাধারণত আশ্রয় নিতে আসত না। এর মধ্যে গান্ধাইলের বড়ইতলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয় পাকসেনাদের। পরের দিন ঐ মুক্তিযোদ্ধারা আসেন আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিতে। তাদের আশ্রয় দেওয়া হয় বিভিন্ন বাড়িতে। পাকসেনারা এ গ্রামে হামলা চালালে যেন প্রতিরোধ করা যায় এজন্য মুক্তিযোদ্ধারা বাঙ্কার খুঁড়তে শুরু করে। 

এ সময় এক মুক্তিযোদ্ধা আমার চাচাতো ভাই দুলাল তালুকদার দুলু ভাইকে বাঙ্কার খুঁড়তে বলেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার বয়স দুলু ভাইয়ের চেয়ে কম, কিন্তু তিনি দুলু ভাইকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। এতে তিনি ক্ষেপে যান ঐ মুক্তিযোদ্ধার ওপরে। তিনি হচ্ছেন মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাড়ির ছেলে। তার ওপরে তাঁর ছোটভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার এহেন বেয়াদবি তিনি মানবেন কেন? তাঁদের মধ্যকার এ ঝগড়া প্রায় মারামারিতে রূপ নেয়। পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা ও গ্রামের মানুষ এসে এ বিরোধ মিটিয়ে দেয়। তখন ঐ মুক্তিযোদ্ধা দুলু ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চান। 

ওদিকে আবার এক মুক্তিযোদ্ধা তাঁর রাইফেল পরিষ্কার করতে গিয়ে ফায়ার হয়ে যায়। তখন পাশের বাড়ির জাবারী খাঁ তাঁর বাইর-বাড়িতে ধান মলন দিচ্ছিলেন। ঐ গুলি গিয়ে তাঁর গরুর শরীরে লাগলে গরুটি আহত হয়। সাথে সাথেই গরুটি জবাই করে কম দামে মাংস বেচা হয়। পরের দিন মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রাম থেকে চলে যায়। এদিন গ্রামের বেশ কয়েকজন তরুণ যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য দল খুঁজছিল তাঁরা ঐ মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যোগ দেয়।

গ্রামে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ফলে সিরাজগঞ্জ শহরে পাকসেনারা থাকলেও গ্রামে স্বাধীনতা বিরোধীদের তৎপরতা কমে যায়, গ্রামের মানুষেরও সাহস বাড়তে থাকে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধের পর সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। তখন সবার চিন্তা আমাদের গ্রাম থেকে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছে তাঁদের কী অবস্থা! তাঁরা সবাই বেঁচে আছে তো? ১৬ ডিসেম্বর পাকসেনারা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি আমরা। প্রতিটি গ্রাম থেকে মিছিল বের হয়ে, জয় বাংলা স্লোগানে স্লোগানে মাতিয়ে তোলে সাধারণ মানুষ।

গ্রামের আশেপাশেই যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তাঁদের খোঁজ সহজেই পাওয়া যায়। তাঁরা বেঁচে আছে, ভালো আছে। বড় চাচার ছেলে জহুরুল ইসলাম, মিন্টু ভাই ডিসেম্বরের শুরুতেই তাঁদের দলবল নিয়ে এলাকায় চলে এসেছিলেন। মেজো চাচার ছেলে ফিরোজ তালুকদার চলে এলেন দেশ মুক্ত হওয়ার দু’দিন পরে। তাঁর কাছে খবর পাওয়া গেল যে, আমার ভাই সাইফুল ইসলাম বগুড়ায় আছেন, ভালো আছেন। তিনিও ফিরে আসবেন সহসাই। তার দুদিন পর আমার বড় ভাই ফিরে এলেন বগুড়া থেকে। স্বস্তি ফিরে আসে আমাদের পরিবারে। 

কিন্তু তখনও আরেক চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান তালুকদারসহ হযরত আলী খাজা, হারুণর রশীদ, নজরুল ইসলাম ননীসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসেননি। তাঁরা কোথায় আছেন তাও জানা যাচ্ছিল না। মান্নান তালুকদার ফিরে এলেন প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরে। তিনি জানালেন যে, তাঁরা ছিলেন সিলেট অঞ্চলে। গ্রামের অন্যরা যাঁরা এখনো ফেরেননি, তাঁরা সবাই আছেন সিলেটে। দ্রুতই বাড়ি ফিরে আসবেন তাঁরাও। তাঁর খবরে গ্রামের সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলামু

ও/ডব্লিউইউ