সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

Published: Sun, 21 Jun 2020 | Updated: Sun, 21 Jun 2020

সন্তোষ কুমার শীল

আমি সন্তোষ কুমার শীল ১৪ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করি। আমার বর্তমান পেশা শিক্ষকতা। সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মাড়োয়ারি পট্টি (মুজিব সড়ক)-এ বসবাসরত জীবনকৃষ্ণ শীল ও মাতা গৌরীরাণী শীলের সবার বড় সন্তান আমি। আমরা পাঁচ ভাই তিন বোন। বাবা মাড়োয়ারি পট্টি-বানিয়াপট্টির মোড়ে মুদি দোকান করে সংসার চালাতেন। আমি তখন জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি। এ সময়ে উত্তাল জোয়ার শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার। আমরা কিশোররাও স্বাধীনতার সে মিছিলে যোগ দিয়েছি। 

সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর হওয়ায় পাকবাহিনীর কোনো ক্যাম্প ছিল না। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে মহকুমায় অবস্থিত পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যুক্ত হয়ে পড়ে স্বাধীনতার সে মিছিলে।

২৫ মার্চ পাকসেনাদের বিভিন্ন স্থানে অত্যাচারের খবর চলে আসতে থাকে। এতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে শুরু করে সাধারণ মানুষ। তারা শহর ছেড়ে গ্রামে আত্মীয়-স্বজন বা মুখচেনা অনাত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে মিলিটারি আসার দু’তিন দিন আগে আমরাও সপরিবারে বাড়িঘরে তালা দিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠে শহর ছাড়ি, চলে যাই সদর থানারই এক গ্রাম সয়দাবাদে।

আমাদের বাড়িতে থেকে সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াশোনা করত আমার পিসতুতো ভাই রংপুরের শ্যামল কুমার শীল। সেও আমাদের সঙ্গে যায়। ২৭ এপ্রিল ভোররাতে ঈশ্বরদী ট্রেনযোগে মিলিটারিরা আসে সিরাজগঞ্জ শহরে। আমরা সয়দাবাদে বসেই দেখি, সিরাজগঞ্জ শহরে আগুন দিয়ে গণহত্যা শুরু করে। জানতে পারি, আমাদের বাড়িঘরও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর তিন/চার দিন পর তারা গ্রামে নামে। গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও বাড়িতে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সে বাড়িটি ওয়াপদা বাঁধের কাছে হওয়ায় সে আশ্রয়কে নিরাপদ মনে হয় না, মনে হয় সহজেই মিলিটারির গাড়ি চলে আসবে এখানেও।

সয়দাবাদের আশ্রয় ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে যাই যমুনার চরের মধ্যে। টাঙ্গাইলের সন্তোষের পূর্বে চারাবাড়ির পাশে কাবিলা গ্রামে বাস করতেন আমার পিসতুতো বোন-জামাই সত্যরঞ্জণ শীল। আমরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে উঠি। মাসখানেক সেখানে থাকি, কোনও কাজকর্ম নেই, এভাবে তো সংসার চলে না। তখন খবর পাওয়া যায় যে, টাঙ্গাইল শহরে পাকসেনারা কম দামি চাল-আটা বেচছে। উপায় না পেয়ে সাহস করে বাবা আমাদের শহরের চাল-আটা কিনে চরের মধ্যে বেশি দামে বেচার বুদ্ধি বের করেন।

আমরা কয়েক ভাই শহরে যেতাম। আমরা বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা লাইনে দাঁড়াতাম। হিন্দু বলে আলাদা একটা ভয় ছিল, আবার একটা সাহস ছিল যে, ওই শহরে আমাদের কেউ চেনে না। ধীরে ধীরে আমাদের সাহস বাড়ে। কয়েক ভাই মিলে চাল-আটা কিনতাম। সেসব চাল-আটা আবার এক জায়গায় করে চারাবাড়ির বাজারে বসে বেচতাম, এভাবেই আমাদের সংসার খরচ কোনও ভাবে জুটে যেত।

এদিকে, সিরাজগঞ্জ শহরের খোঁজ-খবর নিতে থাকি যে, বাড়িতে ফিরে যাওয়া যাবে কিনা? খবর পেতে থাকি যে, পাকসেনাদের ধরপাকড় কিছুটা কমে এসেছে। প্রায় চার মাস পর বাবা সিদ্ধান্ত নেন সিরাজগঞ্জ শহরে যাবার। বাবা, ঠাকুর মা আর আমাকে নিয়ে শহরে আসেন যাতে ঠাকুর মা আমাদের রান্না করে দিতে পারেন। আমাকে বাবা নিয়ে আসে কারণ, আমি যেন বাবার সঙ্গে থাকতে পারি, যেকোনো বিপদে-আপদে তাঁকে সহয়োগিতা করতে পারি। শহরে আসার পর মনে হলো, এ শহর আমাদের নয়, পাকসেনাদের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের দু’একটি বিল্ডিং ছাড়া সবই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে ভয়ে নিজেদের বাড়ির সামনে আসি। দেখি, আমাদের বাড়ি পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। 

আমাদের বাসার সামনে এসডিপিও অফিস। সে অফিসে দিব্বি কাজ করছেন নতুন আসা এসডিপিও, ডিউটি করছে বাঙালি পুলিশ। আমরা বাপ-বেটা আর ঠাকুর মা পোড়া টিনের মধ্যে থেকে কিছু টিন কুড়িয়ে এনে একটি ছাপরা তুলে ফেললাম কোনও রকমে দোকানদারী করার জন্য। ভিতরেও একটি ছাপরা তুলে থাকা শুরু করলাম আমরা তিন জন। আমাদের পাশের বিশ্বজিৎ দত্তদের বাড়ি দখল করে নিয়েছিল মফিজ তালুকদারের দারোয়ান রমজান বিহারি। সে আমাদের অভয় দিল যে, যেকোনো সমস্যা হলে সে দেখবে। তার দেওয়া সাহসেও আমরা কিছুটা সাহস পেলাম শহরে থাকার, যেমন জলে পড়লে খড়কুটা ধরে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। বিশ্বজিৎ দত্তদের ভিতরের বড় ঘরটি ছিল অক্ষত, সে ঘরে বিভিন্ন লুটের স্তুপ করে রাখা ছিল। 

এদিকে, কয়েকদিন পর দোকানের মালামাল আর পরিবারের খোঁজ-খবর নিতে টাংগাইল যাই। সেখানে অন্য ভাইয়েরা আগের মতো কিছু মালপত্র কিনে রেখেছে, এ ছাড়াও শহর থেকে আরো মালপত্র কিনে আনি দোকান চালানো জন্য। সে সময় সঙ্গে নিয়ে আসি আমার ছোট ভাই আশুতোষকে। সে বাবার সঙ্গে দোকানদারী করতে শুরু করে। আর আমি টাংগাইল থেকে মালপত্র এনে দিতে থাকি। অন্যদিকে আমার পিসতুতো ভাই শ্যামল চারাবাড়িতে পরিবারের দেখাশোনা ও মালামাল সংগ্রহ করতে থাকে দোকানের জন্য।

একদিন এসডিপিও অফিসে পাকিস্তান মিলিশিয়ার কয়েকজন জোয়ান আসে সাতটি গুলির পেটি নিয়ে। এসডিপিও অফিসে সে গুলির পেটি রেখে যাদের দিয়ে গুলি বহন করানো হয়েছিল তাদের বিদায় করা হয়। মিলিশিয়ারা কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে আবার গুলির পেটি নিয়ে যাবে কালীবাড়ির ক্যাম্পে। জিরানো শেষে আবার গুলির পেটি বহন করার জন্য লোক ধরা শুরু হয়। ৬ জনকে ধরার পর বাবাকেও বলা হয় যে, ঐ পেটি নিয়ে যেতে হবে। বাবা দোকান ছেড়ে বাড়ির ভিতরে আসেন শার্ট গায়ে দেওয়ার জন্য। এ কথা শুনে ঠাকুর মা আমি কান্নাকাটি করে বাবাকে ঠ্যাকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু বাবার ভাব, গেলে কী হবে? কালীবাড়ি গিয়ে পেটি নামিয়ে দিয়েই চলে আসবে। আমাদের কান্নাকাটির ফলে বাবার বের হতে একটু দেরি হয়। বাইরে এসে দেখি, এসডিপিও অফিসের কেরানি অন্য একজনকে ধরে গুলির পেটি পাঠিয়ে দিয়েছেন, ফলে বাবাকে আর যেতে হলো না। সেদিন খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

এদিকে, স্বাধীনতার চূড়ান্ত সময় চলে আসে। শৈলাবাড়ির যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ আমরা শুনতে পাই শহরে বসে। এ সময়ে তটস্থ হয়ে পড়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা। শোনা যেতে থাকে, যেকোনো সময় পাকসেনারা চলে যাবে শহর ছেড়ে। ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাই আমরা। পরে জানতে পারি, মাড়োয়ারি পট্টির অয়্যারলেস টাওয়ার উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিস্ফোরক দিয়ে।

এর আগে আমজাদ বিহারির খোঁজে আসে পাকসেনারা। তারা আমজাদ বিহারিকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য বলে। কিন্তু সে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যেতে রাজি হয় না। ঐ রাতে রেলগাড়িতে করে বিদায় নেয় সিরাজগঞ্জ থাকা পাকসেনারা। পরদিন সকালে লুটের মালপত্র রেখে ঘরে তালা দিয়ে স্ত্রী আর মেয়ে শরীফুনকে নিয়ে বিদায় নেয় অবাঙালি আমজাদ বিহারি। এর কিছুক্ষণ পর থেকেই গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে শহরে ঢুকে পড়তে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপ। জয় বাংলা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সিরাজগঞ্জ শহর।

অনুলিখন : সাইফুল ইসলাম

ও/ডব্লিউইউ