বন্ধ হয়ে গেছে চীননির্ভর চামড়া রপ্তানির বাজার

Published: Wed, 12 Feb 2020 | Updated: Wed, 12 Feb 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক: করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বন্ধ হয়ে গেছে চীন নির্ভর চামড়া রফতানি বাজার। ফলে মহাসঙ্কটে পড়েছে এদেশের চামড়া খাত এবার। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ট্যানারিগুলোতে চামড়ার মজুদ বেড়ে ৭০ লাখ বর্গফুটে পৌঁছেছে। যার রপ্তানিমূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। তাছাড়া আগে থেকেই সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদন না হওয়ায় ইউরোপের ক্রেতারা চামড়া কিনছে না। 

ইউরোপের বাজার বন্ধের পরে চীনের বাজারেই ৬৫ শতাংশ ফিনিশড চামড়া রপ্তানি হতো। এখন চীনে করোনা ভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে দেশের চামড়া খাত পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের শেষ ছয় মাস চীনের বাজার চালু থাকলে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি চামড়া রপ্তানি হতো। এখন এই চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়া পণ্য রফতানি টানা কমছে। বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৮৮ কোটি ৩১ লাখ ডলারের চামড়া পণ্য ও ২৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের পাদুকা মিলে মোট ১১৬ কোটি ১০ লাখ ডলারের রপ্তানি হয়। পরের বছরে তা বেড়ে ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছর চামড়া বর্ষ পণ্য ঘোষণা করেন। 

ওই বছর পাঁচ বিলিয়ন ডলারের চামড়াপণ্য রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এর পরে চামড়াশিল্প পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় রপ্তানি কমছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়াপণ্য রপ্তানি হয়। গত অর্থবছরে তা আরো কমে প্রায় ১০২ কোটি ডলারে নেমে আসে। 

আর চলতি অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই থেকে জানুয়ারি) ৫৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের চামড়া পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আর বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে চীনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে চামড়া রপ্তানি অর্ধেকের বেশি কমে যাবে। সেক্ষত্রে চামড়া খাত টিকে থাকতে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, বর্তমানে সাভারে চালু থাকা ১২৩টি ট্যানারির মধ্যে বেশিরভাগই চীনে চামড়া রপ্তানি করে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনে রপ্তানি বন্ধ থাকায় ট্যানারিগুলোতে ৭০ লাখ বর্গফুট চামড়া মজুদ হয়ে গেছে। কারণ চীনের ক্রেতারা ট্যানারি চামড়া পরিদর্শনে আসতে পারছে না। আর কবে আসবে তার নিশ্চয়তা নেই। ফলে ট্যানারিগুলোতে এখন উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। 

চামড়া শিপমেন্ট না হওয়ায় ট্যানারিগুলো আর্থিক  সঙ্কটে পড়ছে। তাতে ঋণের সুদ বাড়ছে। আর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে বেশিরভাগ ট্যানারি খেলাপি হয়ে পড়বে। এমনিতেই চামড়া খাতে পরিবেশ দূষণের দায়ে ভালো ক্রেতা হারাতে হয়েছে। এখন দুর্বল ক্রেতাদেরও হারাতে হচ্ছে। এ মহাসঙ্কট উত্তরণে সরকারের নীতিসহায়তা দরকার। যতদিনে পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি বিসিক শেষ করতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা চান।

এদিকে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে চামড়া খাতের উদ্যোক্তারা মহাসমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীনা ক্রেতারা অর্ডার দিয়ে গেছে। সে মোতাবেক ট্যানারি মালিকরা চামড়া প্রস্তুত করে বসে আছেন। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করতে পারছে না। অনেক ক্রেতা দেশে আসার কথা জানিয়েও আসছে না। তাছাড়া চীন ছাড়া অন্য বাজারের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বাজারেও রপ্তানি কমেছে। 

সার্বিকভাবে এখন চামড়া খাতে ধস নেমেছে। ফলে খারাপ অবস্থায় থাকা চামড়া খাত আরো খারাপ অবস্থায় পড়েছে। দেশের প্রায় সব ট্যানারিই চীনে চামড়া রপ্তানিনির্ভর। সবাই এখন চামড়া প্রস্তুত করে বিপাকে পড়েছে। চীনা নববর্ষের ছুটির পরে দেশটির ক্রেতাদের এদেশে আসার কথা ছিল। কিন্তু তারা আসতে পারেনি। উল্টো তারা রপ্তানি আদেশ দেয়া পণ্য নিতে পারছে না। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন জানান, পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদনের লক্ষ্যে শিল্প স্থানান্তর হলেও শেষ পর্যন্ত অপরিকল্পিতভাবেই হয়েছে। এ কারণে ইউরোপের বাজার হারাতে হয়েছে। তার পরে চামড়া খাতে রপ্তানির বড় বাজার ছিল চীন। 

একক দেশ হিসেবে চীনে ৬৫ শতাংশ চামড়া ও চামড়াপণ্য রপ্তানি হয়। এখন করোনা ভাইরাসের কারণে যেসব ঋণপত্র, রপ্তানি আদেশ ও পণ্য সরবরাহ আদেশ পাওয়ার কথা, তা আসেনি। যদিও চীন চামড়া পণ্যের দাম তেমন ভালো দেয়নি। তারপরও ইউরোপের বাজার বন্ধ হওয়ার পরে এ খাত বেঁচে থাকার ভরসা ছিল চীন। এখন করোনা ভাইরাসের কারণে ওই বাজার হারাতে হচ্ছে। তাতে ব্যবসায়ীরা আবারো মহাসঙ্কটে পড়েছে। 

ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১৫টি মাঝারি ট্যানারি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বেশিরভাগ ট্যানারি চালানোর মতো অবস্থা থাকবে না। এ অবস্থায় ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। তাতে বেশিরভাগ ট্যানারি মালিক খেলাপি হবে। আর একের পর এক এভাবে চামড়া খাত ধাক্কা খেলে টিকে থাকাই কঠিন হবে। সেজন্য এখনই সরকারের নীতি সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ফিনিশড লেদারের সিংহভাগ চীনে রপ্তানি হয়। কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে চীনে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। 

আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি চীনে কলকারখানা খোলার কথা। ওই ভাইরাসের প্রভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ চামড়া ও চামড়াপণ্য রপ্তানি কমে যাবে। তাছাড়া চামড়াপণ্য তৈরির নানা উপাদান চীন থেকে আসে। এখন আমদানি বন্ধ থাকায় চামড়াপণ্য উৎপাদনেও দেরি হচ্ছে।

আইআর /