অবৈধ বিদেশিদের থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারছে না সরকার

Published: Sun, 16 Feb 2020 | Updated: Sun, 16 Feb 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : বিপুলসংখ্যক বিদেশী নাগরিক এদেশে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই কাজ করছে। বর্তমানে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে এদেশে কর্মরত বিদেশীর সংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি। যারা ভ্রমণ ভিসায় এসে বিভিন্ন সংস্থায় কাজ করছে। আর বিদেশীরা তাদের আয়ের টাকা নিজ নিজ দেশে পাঠালেও সরকার তা থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। মূলত ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় তাদের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করতে হলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমতি নিতে হয়। তার বাইরে এনজিও ব্যুরো ও বেপজা বিদেশীদের কাজের অনুমতি দিয়ে থাকে।

বিদেশীদের হয়ে তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অনুমতি নেয়ার কাজটি করে থাকে। আর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন ছাড়া স্থানীয় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ সরাসরি বিদেশীদের চাকরিতে নিয়োগ দিলে তা হবে অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে সেজন্য জেল-জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। এনবিআর এবং বিডা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে সাড়ে ৯ হাজার বিদেশী নাগরিক আয়কর দেয়। অথচ বিডার তথ্যানুযায়ী গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার ৮৫৪ জন বিদেশীর ওয়ার্ক পারমিট ছিল। এনবিআর সংশ্লিষ্টদের দাবি-  সরকারের দুর্বল নজরদারি ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণেই বিদেশীদের আয়করের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তাছাড়া বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমেও গতি নেই। আর টাস্কফোর্সের অন্তর্ভুক্ত সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় গত তিন বছরেও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) ‘ডাটা ব্যাংক’-এর কার্যক্রম গতি পায়নি। এমনকি বিমানবন্দরগুলোতে বিদেশী কর্মীদের জন্য আয়কর বুথ চালুর কথা থাকলেও তাও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে খুব সহজেই বিদেশীরা ভ্রমণ ভিসায় এসে নানা কাজে যুক্ত হতে পারছে। 

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত এদেশে বিদেশী শ্রমিক ছিল প্রায় ২৪ হাজার। তার মধ্যে শিল্প অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ ১৪ হাজার ৯১ জনের মোট ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। আর বাণিজ্য অধিশাখায় নতুন এবং মেয়াদ বৃদ্ধিসহ মোট ৯ হাজার ৭৬৩ জনের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। যদিও ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে মোট ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশী নাগরিক কাজ করছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন ভারতের নাগরিক। তার মধ্যে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিদেশী কর্মী কর্মরত রয়েছে। তাদের মধ্যে ভারত ও শ্রীলংকার নাগরিকই বেশি। তাছাড়া সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক এনজিও, চামড়া শিল্প, চিকিৎসাসেবা এবং হোটেল ও রেস্তোরাঁয়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী কাজ করছে। যাদের বড় একটা অংশ ভ্রমণ ভিসায় এসেছে। তাদের কাজের কোনো অনুমতি নেই। অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ ভিসা নিয়ে অবস্থান করা বিদেশীরা প্রতি তিন মাস পরপর নিজ দেশে ফিরে যায়। তারপর দ্রুত নতুন পর্যটন ভিসা নিয়ে এসে একই বা একই ধরনের কাজে যোগদান করে।

সূত্র আরো জানায়, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) কর অঞ্চল ১১-এর অধীনে আয়কর দিয়েছে মোট সাড়ে ৯ হাজার বিদেশী কর্মী। তাদের সম্মিলিত আয়করের পরিমাণ ছিল ১৮১ কোটি টাকা। মোট আয়ের ৩০ শতাংশ আয়কর হিসেবে ওই সময় বিদেশী কর্মীদের মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০৩ কোটি টাকা। আর মাসিক গড় বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার টাকা বা ৬০০ ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশী কর্মীদের আয়কর ফাঁকি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এনবিআর অনেকদিন ধরেই কাজ করছে। কিন্তু কিছু বাধার কারণেই বিদেশী কর্মীরা বড় অংকের আয়কর ফাঁকি দিতে পারছে, যা রোধ করা যাচ্ছে না। 

এদিকে বিগত ২০১৬ সালে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিদেশীদের কর ফাঁকি অনুসন্ধানে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুলিশের এসবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেপজা, পাসপোর্ট অধিদপ্তর, এনজিও ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ওই টাস্কফোর্সের কাজ ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে কর ফাঁকিবাজ বিদেশীদের চিহ্নিত এবং কর্মরত বিদেশীদের ডাটাবেজ তৈরি করা। কিন্তু সরকারের ওসব সংস্থা বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে কাজ করলেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের বিষয়ে কোনো সমন্বয় ছিল না। তার ওপর সিআইসি ডাটা ব্যাংকের কার্যক্রম যখনই স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করে, তখনই বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসতে থাকে। ফলে ওই কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। ফলে এখনো এদেশে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যাই বের করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিতেও রয়েছে ভিন্ন তথ্য।

অন্যদিকে ডাটা ব্যাংকের অগ্রগতি বিষয়ে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল সংশ্লিষ্টরা জানান, যখনই ডাটা ব্যাংক নিয়ে তোড়জোর কাজ শুরু হয়, তখনই সংশ্লিষ্ট বিদেশী কর্মীসহ যারা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে তাদের দিক থেকে কিংবা যারা বাংলাদেশে তাদের নিয়োগ দিয়েছে তাদের দিক থেকে চাপ আসতে থাকে। তাছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিংবা দায়িত্বশীল জায়গা থেকেও চাপ আসে। ফলে ডাটা ব্যাংকের বিষয়গুলো নিয়ে সামনে এগোনো সম্ভব হয় না। এ ধরনের জটিলতা সামনে রেখেই সিআইসিকে কাজ করতে হয়। তবে বিদেশী কর্মীরা যাতে অর্থ পাচার ও রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে, সেজন্য এনবিআর চেয়ারম্যান এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করা বিদেশীদের তথ্য জোগাড় এবং অবৈধ বিদেশীদের নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নিতে বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে  চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঘাটতি কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে সম্প্রতি আবারো বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশী নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এনবিআরের ডাটা ব্যাংকে বিদেশী নাগরিকদের  দেশ, তারা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে তার নাম, কাজের ধরন, আয়সহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকবে। যাতে বিদেশীদের আয়ের ওপর আরোপিত কর স্বচ্ছতার সঙ্গে আদায় করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বিডার নির্বাহী সদস্য (ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) ও অতিরিক্ত সচিব নাভাস চন্দ্র মণ্ডল জানান, বিডা বিনিয়োগ রেজিস্ট্রেশন (প্রতিষ্ঠান), বিদেশীদের কাজের ওয়ার্ক পারমিট প্রদান, ভিসা প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ করে। আয়করের বিষয়টি দেখে রাজস্ব বিভাগ। যারা এখানে বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে বিডার সম্পর্ক। অবৈধভাবে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে বিডার কোনো সম্পর্ক নেই।  যারা বৈধভাবে এদেশে কাজ তারা ঠিকঠাক মতো আয়কর পরিশোধ করছে কিনা, তাদের আয়করের ক্লিয়ারেন্স আছে কিনা তা যথাযথ থাকলে বিডা পরবর্তী মেয়াদে কাজ করার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। এর বাইরে বিডার কোনো দায়িত্ব নেই।

ও/এসএ/