উন্নয়ন প্রকল্পে আর থোক বরাদ্দ দেবে না সরকার

Published: Mon, 16 Mar 2020 | Updated: Mon, 16 Mar 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : বিপুল টাকা নয়ছয়ের কারণে উন্নয়ন প্রকল্পে সরকার থোক বরাদ্দ দিতে আগ্রহী নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাগজ-কলমে থোক বরাদ্দের টাকা ব্যয় হচ্ছে দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও কেনাকাটা ধরেই ওই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তদন্তে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের যোগসাজশে থোক বরাদ্দের টাকা অনিয়মের প্রমাণ মেলেছে। 

ওই প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে ৭টি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্পেও ঘটছে এ ধরনের ঘটনা। এমন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রকল্পেই থোক বরাদ্দের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে পরিকল্পনামন্ত্রী সভাপতিত্বে সচিব কমিটির সভা হয়। ওই সভায় একাধিক সচিব বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পরিকল্পনামন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিব সভা থেকে কোনো প্রকল্পে থোক বরাদ্দ না রাখার অনুশাসন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ওই নিয়ম মানছে না। কোনো কোনো মন্ত্রণালয় থোক বরাদ্দ রেখে পিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছে। দুর্নীতি রোধে পিপিতে সব ধরনের পণ্যের মূল্য উল্লেখ করার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। 

কারণ সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই অসাধু সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছে। তাদের দৌরাত্ম্য কমাতে অথবা দুর্বল করতে পিপিতে সব ধরনের পণ্যের মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক ও পিপিআরে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র সম্পন্ন করার ওপর জোর দেয়া জরুরি। 
সূত্র জানায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি মাঠ পর্যায়ে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে। 

কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, থোক বরাদ্দ বন্ধ করা গেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য ওই দুটি বিভাগে কাজের সমন্বয় রাখা জরুরি। না হলে ওই মন্ত্রণালয়ের গতিশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে না। 

পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প নেয়ার আগে সমীক্ষা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা রাখার জন্য মন্ত্রণালয়কে আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে- মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় থোক বরাদ্দ না দেয়ার জন্য কঠোর অনুশাসনের ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়মিত প্রকল্প কার্যক্রম পরিদর্শন করা। তাছাড়া সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায়ও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়। 

এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সদস্যরা স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তার মধ্যে সাবের হোসেন চৌধুরী জানান, রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন বছর আগে উদ্বোধন করেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই হাসপাতালটির সব যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে। কারণ সেখানে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। আর হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি হচ্ছে। 

একটি সিন্ডিকেটের খপ্পরে গোটা স্বাস্থ্য খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলো জনগণকে কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্য সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। থোক বরাদ্দের নামে লুটপাট যাতে না হয়, সে ব্যাপারে তাই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিটির সদস্য বীরেন শিকদার জানান, মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম হয়েছে। 

কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন না থাকলেও প্রচলিত বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতামূলক দর না পাওয়ায় প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হচ্ছে। 

তাছাড়া সংসদ সদস্য আবিদা আনজুম মিতা জানান, কিছু সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তার যোগসাজশে কিছু ঠিকাদার স্বল্পমূল্যে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কিনে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করছে। ফলে অল্পদিনের মধ্যে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  কমিটির সদস্য বেগম রওশন আরা মান্নান জানান, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সিন্ডিকেটের কবলে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে। 

মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ দরপত্রই সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নির্দিষ্ট ঠিকাদাররা পেয়ে থাকে। থোক বরাদ্দের নামে অর্থ নেয়া হলেও তা যথাযথ কাজে ব্যয় করা হয় না।

কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সাবের হোসেন চৌধুরী, বীরেন শিকদার, আবিদা আনজুম মিতাসহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অংশ নেন।

আইআর /