কেন শাঁখা, কীভাবে শাঁখা?

Published: Tue, 15 Sep 2020 | Updated: Tue, 15 Sep 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : বিবাহিত হিন্দু নারীরা বিয়ের চিহ্ন হিসেবে হাতে শাঁখার তৈরি বালা পরেন। শাঁখার ব্যবহার কেবল বালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিয়ে কিংবা পূজার সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই শঙ্খ বাজিয়ে উলুধ্বনি দেন।

শাঁখা তৈরির মূল উপকরণ হচ্ছে সমুদ্রের কয়েক ধরনের শঙ্খ বা শামুক। এ শামুকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তিতুপটি, রামেশ্বরি, ঝাঁজি, দোয়ানি, মতিছালামত, পাটি, গাড়বেশি, কাচ্চাম্বর, ধালা, জাডকি, কেলাকর, জামাইপাটি, এলপাকারপাটি, নাইয়াখাদ, খগা, সুরকিচোনা, তিতকৌড়ি, জাহাজী, গড়বাকি, সুরতি, দুয়ানাপটি ও আলাবিলা।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে থেকে এ অঞ্চলে শাঁখার ব্যবহার হয়ে আসছে। শাঁখার প্রচলন কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও। আসলে ভারতীয় উপমহাদেশেই এর ব্যবহার শুরু ও বিস্তার।

ধারণা করা হয়, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দক্ষিণ ভারতে উৎপত্তি ঘটেছিল এ শাঁখা শিল্পের। ১৯০৬ সালে সেখান থেকে কিছু শাঁখাশিল্পী, যারা শাঁখারি নামেই খ্যাত, তারা বাংলাদেশে এসে বসবাস শুরু করেন। তারা অবশ্য প্রথমে ঢাকার বিক্রমপুরে এ শিল্পের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করেন। কয়েক দিন পরে তারা বিক্রমপুর থেকে চলে আসেন শাঁখারীপট্টিতে, যা এখন শাঁখারীবাজার নামেই খ্যাত।

কবে থেকে এই শাঁখা শিল্প গড়ে উঠেছিল ঢাকার বুকে, এমন প্রশ্নের উত্তরে শাঁখারি রণজিৎ সুর বলেন, কবে এই শাঁখারীবাজারের গোড়াপত্তন হয়েছিল, সে তথ্য কারোরই জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, রাজধানী ঢাকার জন্মেরও বহু আগে জন্ম হয়েছিল শাঁখারীবাজারের এ শাঁখা শিল্পের।

ভারতে এর উৎপত্তি হলেও বাংলাদেশে এ শিল্প বেশ সুখ্যাতি লাভ করেছে। কথা হয়েছিল কয়েকজন শাঁখারির সঙ্গে। শাঁখা তৈরির উপকরণের কথা উল্লেখ করে বিদ্যুৎ কুমার নাগ জানান, শাঁখা তৈরির মূল উপকরণ হচ্ছে সমুদ্রের কয়েক ধরনের শঙ্খ বা শামুক। এ শামুকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- তিতুপটি, রামেশ্বরি, ঝাঁজি, দোয়ানি, মতিছালামত, পাটি, গাড়বেশি, কাচ্চাম্বর, ধালা, জাডকি, কেলাকর, জামাইপাটি, এলপাকারপাটি, নাইয়াখাদ, খগা, সুরকিচোনা, তিতকৌড়ি, জাহাজী, গড়বাকি, সুরতি, দুয়ানাপটি ও আলাবিলা। এই শঙ্খগুলো আনতে হয় শ্রীলংকার জাফনা ও ভারতের চেন্নাই থেকে। এদের মধ্যে তিতকৌড়ি সবচেয়ে দামি। প্রতিটি তিতকৌড়ি শঙ্খ আনতে হয় ৩ হাজার টাকায়। ১৯২০ সালে যার মূল্য পড়ত মাত্র ৩ টাকা। শাঁখা তৈরিতে শঙ্খ ছাড়াও করাত, তেপায়া, টুল, নুরান লাগে বলেও জানান তিনি।  

একটি শঙ্খ দিয়ে কয়টি শাঁখা বানানো যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ কুমার নাগ বলেন, একটি শঙ্খ দিয়ে মাঝারি আকারের চারটি এবং সরু ধরনের সর্বোচ্চ ১০টি শাঁখা বানানো যায়। শাঁখা তৈরি করতে শিল্পীকে মোট ১২টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।  

হাজার বছরের পুরনো শাঁখা শিল্প এখন অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত। শাঁখা তৈরির কাঁচামালের অতিরিক্ত মূল্য এবং করারোপের কারণেই এ শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

শাঁখারীবাজারে শাঁখা ব্যবসায়ের বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়ী শিব চরণ ধর বলেন, ‘শাঁখা তৈরিতে যে শঙ্খ ব্যবহার করা হয়, তা ভারতের সমুদ্রসীমায় জন্ম নিলেও আমাদের তা আমদানি করতে হয় শ্রীলংকা থেকে। তাও আবার চড়া মূল্যে। এ কারণে লাভের মুখ দেখি না বললেই চলে।’

তিনি বলেন, লাভের মুখ না দেখায় অনেক শাঁখা ব্যবসায়ীই এখন ব্যবসা হিসেবে অন্য কিছুকে বেছে নিচ্ছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুদান পেলে অথবা শাঁখা শিল্পকে কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হলে হয়তো হাজার বছরের এ শিল্প আবার আলোর মুখ দেখবে। 

ও/এসএ/