ঠাকুরগাঁওয়ে বোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব শিশুর কাঁধে!

Published: Tue, 17 Mar 2020 | Updated: Tue, 17 Mar 2020

ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা : সবুজ। হাসি-খুশি ও আনন্দ-উল্লাসে বেড়ে ওঠার কথা ছিল তার। হাতে বই, খাতা, কলম, কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে থাকার কথা ছিল স্কুলে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা ছিল। কিন্তু সে হোটেল ওয়েটারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কাঁধে সংসারের অভাব-অনটনের বোঝা।

বয়স আর কতই হবে? খুব বেশি হলে ১১ বা ১২। অন্য সবার মতো তারও স্বপ্ন ছিল স্কুলে যাওয়ার, কিন্তু তাকে সংসারের খরচ যোগাতে কাজে নামতে হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সুরুচি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টে টেবিল, থালা-বাসন পরিস্কার করে সে। 

সবুজ জানায়, ‘তার বাবা অসুস্থ। তারা দুই ভাই-বোন, সে বড়। ছোট বোন লেখাপড়া করে। তার বাবা আগে কাজ করত। কিন্তু এখন অসুস্থ হওয়াতে সবুজকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। হোটেলে কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ এবং ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হচ্ছে। যদিও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়।’ তবে হোটেলে কাজ করে নিজে আয় করে তা দিয়ে সংসার চালানো ও বোনকে পড়াশোনা করানো খুব গর্বের বলে মনে করে সবুজ। সে বলে,‘ভালোই লাগে, প্রতিদিনে যা আয় করি, তা দিয়ে নিজে চলি, সংসারের খরচ করি, ছোট বোনের পড়ালেখার খরচও দেই; এটাই ভালো লাগে।’

হোটেলে কোন শিক্ষার্থী যখন খেতে আসে তখন কেমন লাগে জিজ্ঞাসা করলে সবুজ বলে, ‘দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। আমারও ইচ্ছা হয় ওদের মতো করে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার। কিন্তু আমার সেই স্বপ্ন দেখে লাভ কী? আমার তো আর পড়ালেখা করা হবে না। কারণ হোটেলে কাজ  করি, তা দিয়ে আবার সংসারও চালাই।’ কথা কথা বলতে বলতে সবুজের চোখ ছলছল করে ওঠে। 

সে আরও বলে, ‘স্কুলে যাওযার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। আমার এ স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না।’ তার মতো আরও অনেক শিশু তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। পড়ালেখার অধিকার তো দূরের কথা, সংসারের বোঝা টানতে হচ্ছে তাদের। ইচ্ছে থাকলেও স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না। স্বপ্নই হয়তো দেখে না তারা। 

আচ্ছা, তাদের অধিকার ও স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব কার? এ জেলার সচেতন মহল মনে করেন, ‘শিশুশ্রম বন্ধে আইন থাকলেও সবসময় আইন দিয়ে সবকিছুর সমাধান হয় না। সরকারের একার পক্ষে এই শিশুশ্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদেরকেও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে করে শিশুশ্রম বন্ধ হয়।’

উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৫-১৪ বছর বয়সী মোট শিশু জনসংখ্যার ১৯%, ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ২১.৯% এবং মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে তা ১৬.১%। অর্থনীতির খাত অনুযায়ী শিশুশ্রমিকদের বণ্টনের চিত্র হচ্ছে: কৃষি ৩৫%, শিল্প ৮%, পরিবহন ২%, অন্যান্য সেবা ১০% এবং গার্হস্থ্যকর্ম ১৫%। কিন্তু পরিবহন খাতে শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য ব্যাপক। অথাৎ যেখানে ০.১% মেয়ে শ্রমিক সেখানে ছেলে শ্রমিক হলো ৩%। তবে শিশুশ্রম নিয়োগের প্রায় ৯৫%-ই ঘটে অনানুষ্ঠানিক খাতে। এদের জন্য সাপ্তাহিক গড় কর্মঘণ্টা আনুমানিক ৪৫ এবং মাসিক বেতন ৫০০ টাকার নিচে। মেয়ে শিশুশ্রমিকের মাসিক বেতন ছেলে শিশুশ্রমিকের তুলনায় গড়ে প্রায় ১০০ টাকা কম। বাংলাদেশের আনুমানিক ২০% পরিবারে ৫-১৪ বছরের কর্মজীবী শিশু রয়েছে। এই সংখ্যা শহুরে পরিবারগুলির জন্য ১৭% এবং গ্রামীণ পরিবারের জন্য ২৩%।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ সমস্যা হলো শিশু শ্রম। বাংলাদেশ জাতীয় শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাজ করানো হলে তা শিশু শ্রমের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।

ও/ডব্লিউইউ