করোনায় কৌতুকাভিনেতা কাইশ্যার জীবনাবসান

Published: Tue, 31 Mar 2020 | Updated: Tue, 31 Mar 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : ‘জীবনডা বেদনার’, ‘মূলার জুস খান’, ‘কুত্তা ভাগ্য’ কিংবা ‘বদনা গ্যাং’- কথাগুলো এই প্রজন্মের অতি পরিচিত। ইউটিউবে ‘কাইশ্যা’ লিখে সার্চ দিলেই চলে আসবে অসংখ্য ভিডিও। মজার ব্যাপার হলো, অধিকাংশ ভিউয়ার্স কাইশ্যার মূল পরিচয় এমনকি তার আসল নাম পর্যন্ত জানেন না। তিনি এ দেশে ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিত। 

বিশ্বজুড়ে তার রয়েছে অসংখ্য ভক্ত। প্রকৃতপক্ষে তিনি জাপানিজ কৌতুক অভিনেতা। আসল নাম কেন শিমুরা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি জনপ্রিয় এই অভিনেতা মারা গেছেন। কেন শিমুরার জন্ম ১৯৫০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, জাপানের টোকিওতে। বাবা কলেজের অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকেই কঠোর পারিবারিক অনুশাসনে বেড়ে উঠেছেন। 

মাধ্যমিক স্কুলে পড়াকালীন তার পিতৃবিয়োগ ঘটে। আর্থিক দৈন্যে পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। জীবিকার প্রয়োজনে রক ব্যান্ড এবং কমেডি গ্রুপ দ্য ডিফটার্স-এ যোগ দেন। জাপানে প্রথম দিকে যেসব ট্রাভেল গ্রুপ ছিল সেগুলোর অন্যতম ছিল ‘বিটলস’। এই গ্রুপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শোবিজে ক্যারিয়ার শুরু করেন। 

সেটি ছিল ১৯৭০ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। কেন শিমুরা আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, প্রথম দিকে ‘হাচিজিদায়ো জেনিঞ্জুগো’ অর্থাৎ ‘এখন ৮টা বাজে, চারপাশে জড়ো হও’ শো-তে পার্ট টাইম অভিনয় করলেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, প্রথম দিকে আমেরিকান কৌতুক অভিনেতা জেরি লুইস দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। 

পরে ধীরে ধীরে তার একক সত্তার বিকাশ ঘটে। শিমুরার ‘বকটানো-সাম’-এর অভিনয় জাপানি কৌতুকাভিনেতাদের মধ্যে অস্বাভাবিক জনপ্রিয় ছিল। ৬৫ বছর বয়সে লেখা আত্মজীবনীতে কেন শিমুরা আরো লিখেছেন, ক্যারিয়ারের শুরুতেই যখন তিনি কমেডিয়ান হিসেবে খ্যাতি পান তখনই সিদ্ধান্ত নেন, তার জীবনের ব্রত হবে মানুষকে হাসিয়ে বিনোদন দেয়া। 

কাজটি তিনি খুব ভালোভাবেই করেছেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বেশ কিছু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন শিমুরা। ‘গড অফ’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন তিনি। ক্যারিয়ার শুরু করেন মাসাশি তাসিরো, নবোয়াসি কাওয়ানোসহ বেশ কয়েকজন শক্তিমান এবং তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার সঙ্গে। 

ফলে তার প্রতিষ্ঠা পেতে সময় লাগেনি। কেন শিমুরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন সেই ১৯৭৪ সালেই। যখন তিনি বিখ্যাত কৌতুক দল দ্য ডিফটার্সে চ্যা আরায়ের পরিবর্তে অভিনয় করার সুযোগ পান। সুযোগটিকে তিনি এতটাই ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন যে, পরবর্তী সময়ে ওই চরিত্রে তিনি নিয়মিত হয়ে যান। 

তখনই মূলত তিনি কীভাবে  দর্শকদের হাসানো যায় সেই কৌশল রপ্ত করে ফেলেন। সেই সময়ের কয়েকটি স্মরণীয় কাজের মধ্যে ‘গোঁফ নাচ’ অন্যতম। ১৯৭৭ সালে কেন শিমুরা টেলিভিশন প্রোগ্রাম ‘ডরিফু ডাইবাকুশো’-তে অংশ নেন। এর বাংলা অর্থ হাসিতে ফেটে পড়া। অনুষ্ঠানটি ছিল দেড় ঘণ্টাব্যাপী। এটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

তিনি এমন সব চরিত্রে অভিনয় করতেন যেন সমসাময়িক সমাজের বর্তমান অভিভাবক। অথবা সেদেশে বাস করা নির্বোধ রাজা যিনি তাদের পূর্ব পূরুষদের হয়ে কথা বলছেন। ফলে তিনি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন সমসাময়িক রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ, পরিবারের প্রধান বা স্কুল প্রধানের ভূমিকা। তার আরেকটি জনপ্রিয় শো ‘হেনা ওজি-সান’। 

যেখানে তিনি ষোড়শীদের সঙ্গে বৃদ্ধ মানুষের অভিনয় করতেন। ১৯৮০-এর দশকের জনপ্রিয় বিভিন্ন শো-তে ‘বাকা টোনোসামা’ (বোকার প্রভু) এবং ‘হেনা ওজিসান’ (অদ্ভুত চাচা)-এর মতো ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রগুলোর জন্য তিনি আগের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে যান। সেসময় এটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, ‘বাকা টোনোসামা’ বছরে প্রায় তিনবার প্রচার করতে হয়েছিল। 

এতে শিমুরা হলেন বোকার প্রভু, যিনি শাসন করতে চান না এবং কেবল মজা করার কথা ভাবেন। চরিত্রটিতে তাকে একটি সাদা মুখ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। অত্যন্ত ঘন ভ্রু এবং মাথার উপরে থাকে চুলের বড় ঝুটি। তার আরেকটি জনপ্রিয় শো ‘শিমুরা কেন ন দাইজবুদা’। এই অনুষ্ঠানটি ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত প্রচার হয়েছে। 

এর মাধ্যমেই তিনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ারের শীর্ষে উঠে যান। ফলে তার কিছু শিষ্যও জুটে যায়। শিষ্যরা তার কাছ থেকে নতুন কৌশল শেখা শুরু করে। শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাসাশি তাশিরো, ইয়োকো ইশিনো, তূরী বাজাতে পারদর্শী নবুয়শি কুয়ানো এবং নোরিকো মাৎসুমোটো। 

কেন শিমুরা অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে পপপোয়া (১৯৯৯), হাজিম ইয়োশিওকা লোরাক্স (২০১২), দ্য লোরাক্স, ইয়ো-কাই ওয়াচ (২০১৪), মাস্টার নায়দা (ভয়েস) এবং ইয়েল (২০২০) প্রভৃতি। গত ২০ মার্চ কেন শিমুরা সামান্য সর্দি-জ¦র নিয়ে হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য যান। 

২৩ মার্চ নিশ্চিত হন যে, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যদিও চিকিৎসক তাকে সঙ্কটজনক অবস্থায় আছেন মনে করেননি। এরপর প্রায় ৭ দিনের মাথায় ২৯ মার্চ তিনি টোকিওর শিনজুকুতে একটি হাসপাতালে মারা যান। 

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। জাপানে শিমুরাই বিনোদন জগতের প্রথম ব্যক্তি যিনি করোনার কাছে পরাজিত হলেন। একইসঙ্গে শেষ হলো একজন কৌতুকাভিনেতার গৌরবজনক জীবন।

আইআর /