শান্তিময় বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সম্প্রীতি

Published: Sun, 02 Feb 2020 | Updated: Sun, 02 Feb 2020

অনয় মুখার্জী : সম্প্রীতি শব্দের অর্থ সমপ্রীতি বা সহাবস্থান; যা মানব জাতির আদিকাল থেকেই বিরাজমান। মানব ইতিহাসের শুরুটা ধর্মজ্ঞানে পরিপূর্ণ না থাকলেও মানবসেবাকে ধর্ম বিবেচনা করা হতো বলে ধারণা করা হয়। আমাদের পূর্বপুরুষরা বংশপরম্পরায় যা লালনপালন করে আসছে। সৃষ্টিতত্ত্বে মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য নেই। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এটি সম্প্রীতির মূলমন্ত্র। সংস্কৃতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সম্প্রীতি একমাত্র শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা সকল অশুভ শক্তিকে একতাবদ্ধ হয়ে পরাজিত করেছে। আর এই মানুষে মানুষে একতাবদ্ধ হওয়ার অপর নাম সম্প্রীতি।

আমাদের নীতি-দর্শনে সম্প্রীতির যে বীজ বপন করা ছিল, তা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে নষ্ট করার প্রয়াস চালায় কিছু মানবতাবিরোধী শক্তি। হীন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। যার আসল উদ্দেশ্য প্রগতির পথ রুদ্ধ করা, সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা। এতে হীন স্বার্থান্বেষীরা লাভবান হয় বটে কিন্তু জাতির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ ব্যাহত হয়। রাজনীতি ও সমাজনীতিতে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিভক্তিকরণের মাধ্যমেই জন্ম হয় সাম্প্রদায়িকতার। শুরু হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল গোত্র-বর্ণ ও জাতির ওপর সবল গোত্র-বর্ণ ও জাতির আধিপত্যের লড়াই। যার মাধ্যমে বিনষ্ট হয় মানুষের সভ্য, সুস্থ ও শান্তিময় জীবন। সাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতার বিপক্ষে উপ্ত এক বিষবৃক্ষ। ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা এক নয়। পৃথিবীর সকল ধর্মের মূল কথা প্রেম, শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতি। ধর্মের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক প্রগাঢ়। কারণ, প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতা বিদ্যমান। স্বাধীনতা, সৃষ্টিশীলতা, জ্ঞান, সততা, প্রেম, বন্ধুত্ব, করুণা, পরার্থপরতা ও আপন আদর্শ অনুযায়ী বাঁচার সাহস এসবকেই মানুষ মূল্যবান মনে করে। আর এই সমষ্টিগত গুণের ধারকই সমাজে মূল্যবান হয়ে ওঠে। কিন্তু সকলের জন্য দরকার পরিপূর্ণ শিক্ষা ও ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূলভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা-ধর্মনিরপেক্ষতা। মহান মুক্তিযুদ্ধ যার নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার ধারক ও বাহক। তিনি বাঙালী জাতির কণ্ঠস্বর, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বে এদেশের হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান, বাঙালী-অবাঙালী সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেন। ওঁর নির্দেশে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতির অন্যতম মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যুক্ত করা হয়। জাতির জনক তার এক ভাষণে বলেছিলেন ‘প্রথমত আমি মানুষ, দ্বিতীয়ত আমি বাঙালী, তৃতীয়ত আমি মুসলমান’। তার এই ভাষণ বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়-তিনি কত বড় অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। তার সৃষ্টিশীলতা, জ্ঞান, সততা, প্রেম, পরার্থপরতা, বন্ধুত্ব ও আপন আদর্শ অনুযায়ী চলার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের সকল ধর্মের অবস্থান ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ও শান্তিময়। তার নেতৃত্বে প্রতিটি ধর্মের মানুষ স্ব স্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন ও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারতেন। পৃথিবীর কাছে তিনি বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্প্রীতির দেশ হিসেবে। তিনি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অনেকটাই গুছিয়ে আনছিলেন ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক, হীন স্বার্থান্বেষী এক অপশক্তি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বিদেশে থাকার কারণে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান তার দুই কন্যা। আর এই নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানের পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি। ক্ষমতায় এসেই শুরু করে ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি, জাগিয়ে তোলে সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতি। তারই ধারাবাহিকতায় জেনারেলদের সামরিক শাসনের আমলে সংবিধানে যোগ হয় রাষ্ট্রধর্ম। শুরু হয় ধর্মে ধর্মে বিভেদ, ধ্বংস হয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সম্প্রীতির বন্ধন। 

দীর্ঘ সংগ্রামের পর জনতার রায়ে ক্ষমতায় আসেন জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় এসেই তিনি সকল ধর্মের সম-অধিকারের জন্য কাজ করতে থাকেন। পিতার মতো তিনি জানতেন আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের উন্নয়ন না হলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি সংবিধানে নিশ্চিত করেন সকল ধর্মের সমঅধিকার। সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার জন্য তিনি বলেন ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। তিনি সকল ধর্মকে এক পতাকার নিচে সবাইকে আনার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে, শনৈঃশনৈ উন্নত থেকে উন্নতর দেশে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মানুষের জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে শান্তির উৎস। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার ব্যাপক বিকাশ দরকার। মনে রাখতে হবে, সাম্প্রদায়িক সুসম্পর্ক বজায় না রেখে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জাতীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তাই অপরিহার্য।

লেখক : সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

ও/এসএ/