স্মার্ট ফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার এবং ভয়াবহতা

Published: Wed, 05 Feb 2020 | Updated: Wed, 05 Feb 2020

মুহম্মদ সজীব প্রধান : স্মার্ট ফোন ছাড়া স্মার্ট হওয়া যায় না এমন মতবাদেই বিশ্বাসী তরুণ সমাজ। বিশ্বায়নের যুগে বিস্ময়করভাবে স্মার্ট ফোনের ব্যবহার স্থান দখল করেছে দিনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকায়। সকালে নাস্তার টেবিলে, অফিসে কাজের ফাঁকে, পড়ার টেবিলে বইয়ের আড়ালে এমনকি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্মার্ট ফোনের ব্যবহার যেন দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন স্মার্ট ফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার কতটা ভয়াবহ হতে পারে?

সম্প্রতি গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল এ্যাপ্লিকেশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বে বর্তমানে একক মোবাইল সংযোগ সংখ্যা ৪৯২ কোটি, যেখানে ৫০ শতাংশ সংযোগ স্মার্ট ফোনে যা চলতি বছরে ৬৬ শতাংশ হবে। অন্যদিকে ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩৪৭ কোটি। প্রকৃত অর্থে, জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং সে সঙ্গে সমহারে বাড়ছে হতাশা, কর্মবিমুখতা, মানসিক রোগ, মাদকাসক্তির পরিমাণ। দক্ষিণ কোরিয়ার রেডিওলজির অধ্যাপক ইয়ুং সুক তার এক গবেষণায় জানান, যেসব কিশোর-কিশোরী স্মার্ট ফোনে বেশি সময় কাটান তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে যা দেখে বোঝা যায় তাদের এ বিষয়ে আসক্তি রয়েছে এবং এর ফলে তাদের মাঝে হতাশা ও উদ্বেগ কাজ করে। অন্যদিকে, স্মার্ট ফোনে থাকা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টুইটার, হোয়াটস এ্যাপ, ইউটিউব এবং বিভিন্ন অনলাইন গেমস যা অতি সহজেই ব্যবহারকারীকে কাবু করতে সক্ষম।

ভার্চুয়াল জগতের প্রীতি ভালবাসা আর বন্ধুত্ব কিশোর-কিশোরীদের এত বেশি আবেগপ্রবণ ও রোমাঞ্চিত করে যে, বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বৃদ্ধি পায় এবং পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ছিন্ন হতে থাকে, ফলে তারা পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে না যা তাদের পারিবারিক, সামাজিক এমনকি ভবিষ্যত জীবনকে বিভীষিকাময় করে দেয় অথচ ছাত্রনং অধ্যয়নং তপঃ। অনলাইনে কেউ আবার পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে স্মার্টনেস ভেবে বাবার সামনে হাতে সিগারেট তুলতেও দ্বিধা করে না।

এক সময় মাদকাসক্তির দাবানলে হারিয়ে যায় বাবা-মার চির লালিত স্বপ্ন, মরীচিকার মতোই মিছে হয়ে যায় স্মার্ট ক্যারিয়ারের ভাবনা।

বর্তমানে অধিকাংশ তরুণ-তরুণী অনলাইন গেমসে আসক্ত তারা দিনের অধিকাংশ সময়ই এ ক্ষেত্রে ব্যয় করে যা তাদের খেলার মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে ফলে তাদের মাঝে নেতৃত্বগুণ, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা লোপ পাচ্ছে, যা নৈতিক ও সামাজিক জীবন-যাপন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়াও, এ গেমস কখনও কখনও মৃত্যু ফাঁদও হয়ে ওঠে। ব্লু হুইল গেমস এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

২০১৩ সালে রাশিয়াতে ১৩০ জন এবং রাশিয়ার বাইরে ৫০ জনের অপমৃত্যু হয় এ গেমসের কারণে। এ ছাড়াও ২০১৭ সালে অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা নামে অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রীর মৃত্যু বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বর্তমানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো অনেকেই আড্ডা, পার্টি কিংবা ভ্রমণে শখের বশে একাকী কিংবা প্রিয় মানুষের সঙ্গে সেলফি নিতে ভালবাসে। তবে আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন এক গবেষণায় মানসিক ব্যাধির সঙ্গে অতিরিক্ত সেলফি নেয়ার সম্পর্ক নিশ্চিত করেছে। গবেষকরা দাবি করছেন অতিরিক্ত নিজের ছবি তোলার প্রবণতা এবং তা সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইটে দেয়ার মানসিক সমস্যাটির নাম ‘সেলফিটিস’। আর এর কুফল সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জিন ওবাগি বলেছেন, মোবাইল ফোনের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণের ফলে উঘঅ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে ত্বক কুচকে যায় এবং চেহারা ক্রমাগত শ্রীহীন হতে থাকে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যবহারের ফলে সময় অপচয় ছাড়াও স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে আরও অনেক নেতিবাচক প্রভাব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমকে গভীর করার জন্য শরীর থেকে মেলাটোনিন নামক একপ্রকার হরমোনের নিঃসরণ ঘটে কিন্তু মোবাইল ফোন থেকে যে রেডিয়েশন নির্গত হয় তা ওই মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে ঘুমের দফারফা, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে এছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যবহারের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, এ্যানজাইনা, তীব্র মাথাধরাসহ দেখা দিতে পারে চোখ ও কানের বিভিন্ন সমস্যা। আমেরিকান ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, মোবাইল ফোনের নীল আলো রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, মোবাইল থেকে নির্গত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন ব্রেন টিউমারের সবচেয়ে বড় কারণ যা, বড়দের তুলনায় ছোটদের ক্ষেত্রে বেশি মারাত্মক কেননা শিশুদের খুলির বাইরের অংশ বড়দের তুলনায় পাতলা হয় ফলে রেডিয়েশনের প্রভাব তাদের মাথায় বেশি পড়ে। আর এভাবেই শিশুরা চরম হুমকির শিকার হচ্ছে, যা অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে, কেননা আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। এছাড়াও সম্প্রতি সুইডেনের একটি গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে, ২০ বছরের নিচে যেসব তরুণ স্মার্ট ফোনে আসক্ত তাদের ব্রেন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্যের তুলনায় ৫ গুণ বেশি। যা একটি তাজা প্রাণ ও ফুটফুটে ভবিষ্যতকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করার চরম হুমকি।

সত্যিকার অর্থে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি স্মার্ট ফোনের ভার্চুয়াল জগতে প্রতিনিয়ত হাজারো জীবন্ত স্বপ্নের অপমৃত্যু হচ্ছে। যে কিশোর-কিশোরী আগামী দিনের কর্ণধার তাদের অনেকেই মৃত্যুর পূর্বেই মৃতের মতো কাটাচ্ছে দিনের পর দিন। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে স্মার্ট ফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার যেমন যে কারও জীবনে অভিশাপ বয়ে আনে, ঠিক তেমনি স্মার্ট ফোনের স্মার্ট ব্যবহার পর্যাপ্ত সুফলও বয়ে আনতে পারে। তাই তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ঘড়ির কাটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে স্মার্ট ফোনের স্মার্ট ব্যবহারের বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ও/এসএ/