আনন্দহীন উৎসবই এনে দিতে পারে আশার আলো

Published: Wed, 20 May 2020 | Updated: Wed, 20 May 2020

ফিরোজ খান, বাকতা, ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ : রাতের শিশির ভেজা ঘাস দু'পা মারিয়ে হাটতেছিলাম তারা কেঁদে কেঁদে পা ভিজালো যেন তাদের কষ্ট না দেই, মৃদু হাসলাম ক্ষাণিক পর বললাম দেখ পৃথিবী যেখানে নির্বাক সেখানে তোমার জন্য আমি কি করতে পারি। সত্যিই পৃথিবী আজ নির্বাক অদৃশ্য অতি এক ক্ষুদ্র বস্তু নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর কাছে। 

নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর আক্রমণে মানুষ আজ নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে, পরিচিত হয়েছে নতুন শব্দের সাথে। নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর মহামারীতে বিশ্ব মানুষের কাছে সুপরিচিত একটি শব্দ তা হলো লক-ডাউন। এই শাব্দিক ব্যবহারে মানুষ আজ গৃহবন্দি। 

সাধারণ মানুষ কে লক-ডাউনে নামক শব্দটির সাথে পরিচিত করাতে গিয়ে মানবিক, নিজস্ব দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রের নির্দেশনা অনুযায়ী অনেকে মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহন করতে গিয়ে অনেকেই আবার চ্যালেঞ্জের কাছেই হার মানতে হচ্ছে। 

অনেকেই আবার সাজানো পৃথিবীর সাজানো জীবন ফেলে স্বাভাবিক মৃত্যুর বদলে সাজানো মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করতে হচ্ছে বাধ্য হয়েছে।  তবে আমাদের কিসের এতো অহংকার, দাম্ভিকতা, কিসের এতো গর্ব- স্বল্প সময়ের এই পৃথিবী থেকে শূন্য হাতেই তো পৌঁছে যাব মৃত্যুর দুয়ারে। আমাদের জীবনের প্রয়োজন কতটুকু, কতটুকু পেতে চাই  তা কি কখনো ভেবে দেখেছি আমরা। 

হ্যা বলছিলাম লক-ডাউন নিয়ে। লক-ডাউন হয়তো কয়েকদিন পরেই উঠিয়ে নেওয়া হবে। কেন উঠিয়ে নেওয়া হবে তা হয়তো আমরা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছি। যদি লক ডাউন না উঠে হয়তো হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পৃথিবী থেকে  মুক্ত হতে সময় লাগবে আরও প্রায় ৪-৫ বছর। 

তাছাড়া এখনো পর্যন্ত নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)  এর ভ্যাক্সিন/টিকা বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারে নাই। এখন কিন্তু আমরা সবাই বুঝতে পারছি লক ডাউন কেন রাখা হয়েছিল যাতে ভাইরাসটি ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে ছড়ায়। আর ততো দিনে হয়তো অচেনা এই ভাইরাসটি ভ্যাক্সিন/টিকা আবিষ্কার হয়ে যায়। 

কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য পৃথিবীর প্রায় ৭৫০ কোটি মানুষের হাতে এই ভ্যাক্সিন/টিকা পৌঁছাতে কম করে হলেও সময় লাগবে ৪-৫ বছর। তাই এই দীর্ঘ সময় লক ডাউন রাখা সম্ভব নয়, সেটা যতো উন্নত রাষ্ট্রই হোক না কেন। ইতোমধ্যে আমরা দেখতেও পাচ্ছি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী অনেক রাষ্ট্রই অর্থনৈতিক মন্দার কারণে লক ডাউন শিথিল করেছেন। 

তবে কি আমরা  এভাবেই অসহায়ের মতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবো। সত্যি করে বলতে কি এটা সম্পূর্ণ প্রকৃতির ব্যাপার। হয়তো প্রকৃতির দয়া তেই ভয়ানক ডাইনোসর এর মতো একদিন পৃথিবী থেকে এই নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর বিলুপ্ত ঘটাতে পারে। 

এখন তো আমাদের আর বুঝতে বাকি নাই প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার কাছে আমরা কতটা অসহায়। তবুও আমরা রাষ্ট্রের দেওয়া বিধিনিষেধ মানতে অবহেলা করছি। রাষ্ট্রের দেওয়া বিধিনিষেধ না মানা মানে মৃত্যুকে আরও সহজভাবে মেনে নেওয়া। যদিও জীবনের তাগিদে জীবীকার খুঁজ করছি আমরা। জীবিকার চাহিদা পূরনের জন্য রাষ্ট্র কিন্তু তার সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জীবিকা হীন মানুষের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার। 

সামনে আমাদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর, এই উৎবকে নিয়ে আমাদের কতই না পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নিয়তির কাছে সকল পরিকল্পনাই আজ ভেস্তে যাচ্ছে।

মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় কত অপূর্ণতা নিয়ে। আনন্দ বিহীন যদি একটি ঈদ কেটে যায় তবে আমাদের ক্ষতি কি। যদি স্রষ্টার কৃপায় বেঁচে যাই তবে হয়তো অনেক ঈদই আনন্দ উৎসবে কাটাতে পারব। কারণ প্রতিদিন আমরা নতুন নতুন আশা নিয়ে দিনের শুরুটা করি। সত্যি বলতে আমাদের জীবনটা খুব ছোট ও অনিশ্চিত ভ্রমণ। 

কিছু আশা পূর্ণ হবে, কিছু অপূর্ণ  রয়ে যাবে । আমাদের অনেক অপ্রাপ্তি, অনেক সমস্যা সবকিছু একদিন বিলীন হয়ে যাবে, আবার অনেক কিছুটা সমাধান হবে। আমরা তো আশার ওপর ভরসা করেই বাঁচি, তাই ভালো কিছুর আশায় থাকতেই পারি। আজকের এই দুর্দিন  আগামী বছর হয়তো আরও ব্যাপক আকারে যদি ধরা দিত। 

তাই এ ক্ষেত্রে দুঃসময়কে সাধুবাদ জানাতে হয় যে, সে অল্প থাকতে দেখা দিয়েছে। উল্টো হিসাব করলে অনেক নেতিবাচকের মধ্যেও আমরা ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছি । পৃথিবীতে যেখানে শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতা ছাড়া কিছু নেই, সেখানে হঠাৎ করেই জীবনের পরিবর্তন হয়েছে প্রকৃতির কারণে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব। 

আমাদের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি গুলো  প্রিয়জনদের নিয়ে। যখন আনন্দ ভাগ করি প্রিয়জন নিয়েই করি, যখন দুঃখে কাঁদি তাদের নিয়েই। সবকিছুর মূলে রয়েছে আমাদের পরিবার- পরিজন ও প্রিয় জন্মভূমি । এ ঈদে হয়তো যা পাওয়ার কথা ছিল, তা হয়তো পাব না আবার উল্টোটাও হয়েছে। হয়তো অনেক কিছু পাওয়ার ছিল না, তবু পেয়েছি।

যা যা পরিকল্পনা করেছিলাম, তা হয়তো আদৌ করা হবে না। অনেক কিছুই আমাদের পরিকল্পনা মাফিক হয় না। আনন্দ-বেদনার ঝড় হঠাৎ করে জীবনটাকে এলোমেলো করে দেয়। নোভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)  এর  মহামারিতে হয়তো হারিয়ে গেছে আমাদের প্রিয় কেউ, কেউ হারিয়েছেন মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান, ভাইবোন—এমন কোন না কোন প্রিয়জন। 

তাদের কাছের দুঃস্বপ্নের মতো স্মরনীয় হয়ে থাকবে মহামারীর এই সময়টা। আমরা মানুষ, আমাদের সহজে হার মানলে তো চলবে না। যে সূর্যের আলো পড়ে ঝলসে উঠে পৃথিবী, সে আলোও বাঁধার সম্মুখীন হয় মেঘ নামের দুঃখের সংঘর্ষে। ঘূর্ণিঝড়, তুষার ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়, বিধ্বস্ত মৌসুমের পর বসন্ত মৌসুমি রূপে নিজেকে বদলায়, ফুলে ফলে ভরে তোলে আঙিনা। আমরাও ঠিক তেমনি ভাবে এই মহামারি মোকাবেলা কাটিয়ে গড়ে তুলবো নতুন এক পৃথিবী ।

আমাদের শুধু প্রয়োজন একটু মনোবল আর দৃঢ় বিশ্বাস-আমরা পারব, আমাদের পারতে হবে। আমরাও সেজে উঠি ও উঠব কোন দুঃখ-ব্যথা-বেদনা পারবে না আমাদের পরাজিত করতে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, সে পারে মুছে দিতে জীবনের ঝড়গুলোকে, গাছের নতুন পাতার মতো রোগ শোক দুঃখগুলোকে ঝেড়ে ফেলে পারে নবজন্ম নিতে।

পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়, বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে সভ্যতাকে আরও সভ্য করতে। রোগ-শোক পরাজিত করতে সদাই চলছে নতুন গবেষণা। যদি প্রকৃতি আমাদের সহায় হয় তবে আমার প্রত্যাশা করতে পারি নতুন আশার আলোর।  সে পর্যন্ত সৃষ্টি কর্তা আমাদের কে ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা দান করুন। 

হোক না জীবনের আনন্দ হীন একটি ঈদ ক্ষতি নেইতো। বেচে থাকলে হয়তো আনন্দ ভাগাভাগির অনেক সময় রয়েছে। আসুন নিজে ঘরে থাকি, অন্যকে ঘরে রাখি।

আইআর /