বাজেটের প্রত্যাশা-প্রাপ্তি এবং আমাদের উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

Published: Sun, 14 Jun 2020 | Updated: Sun, 14 Jun 2020

মামুন কবীর : ১১ জুন তারিখে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ আর অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ছিল বাজেট যেন জনস্বার্থের হয়। এখানে শিক্ষা-চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেবার পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য করতে হবে এবারের বাজেট।

মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের জন্য। যার মধ্যে কর ও রাজস্ব থেকে আয় হবে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। সাথে বৈদেশিক ঋণ ধরা হয়েছে ৮০ হাজার ১৭ কোটি আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের জন্য। তাহলে দেখা যাচ্ছে এই বাজেট স্বার্থক করার জন্য জনগণের পকেট থেকে নেওয়া হবে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। করোনা কালের এই দুর্দিনেও দেশ চালানোর জন্য এই পরিমাণ অর্থের যোগান দেবে এদেশের জনগণ।

ইতোমধ্যেই জনগণের পকেট কাটা শুরু হয়ে গেছে তাদের মোবাইল কল আর ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর। প্রতি ১০০ টাকায় ৩৩ টাকা ২৫ পয়সা কেটে নেওয়া হবে জনগণের নিকট থেকে। অথচ লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা করে নিচ্ছে যে মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের পকেটে হাত দিতে পারছে না এই সরকার। হিসাব অনুযায়ী বাজেট জুন মাসে ঘোষণা হলেও তা কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে। অথচ এখনই মোবাইলের টাকা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, এ বাজেট আসলে গরীবের কিংবা সাধারণ মানুষের স্বার্থের কতটা পরিপন্থী।

বাজেটে করোনা মোকাবেলায় খরচ রাখা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে দেশের ৮০ ভাগ মানুষ এই মুহূর্তে করোনা পজিটিভ হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এই যখন পরিস্থিতি তখন করোনা মোকাবেলায় আরো অনেক বেশি বরাদ্দ থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সকলের। অথচ মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলো এই সংকট মোকাবেলায়। মোট বাজেটের মাত্র ৭.২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, এটা আসলে ক্ষতে মলম লাগানোর মতো হয়েছে। তবে এর অধিকাংশই যাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এই খাতটি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয় না। এটি পরিচালনা করেন আমলারা। আর যে বাজেট বরাদ্দ হয় তা প্রকল্প আকারে মাঠে যেতে যেতে অর্থবছরের শেষ মাস এসে পড়ে। তখন আর বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এটাই প্রতিবছরের চিত্র। স্বাস্থ্য বিষয়ে অনভিজ্ঞ আমলাগণ আসলে বুঝতেই পারেন না যে কোথায় কিভাবে কত টাকা খরচ করা প্রয়োজন। এর সাথে যুক্ত হয় দুর্নীতি। সুশাসনের অভাবে অপচয় হয় একটা বিরাট অঙ্কের বাজেট।

করোনা কাল আর এর পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবেলা। আগামীর পৃথিবী খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সবচেয়ে শঙ্কিত। এবছর আমাদের বাজেটে আগামী অর্থ বছরের জন্য খাদ্য নিরাপত্তায় বাজেট রাখা হয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের বাজেটের খাদ্য নিরাপত্তার বরাদ্দের চেয়ে মাত্র ১ হাজার ৫ কোটি টাকা বেশি। অথচ আগামীর খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের জনগণকে বাঁচাতে আরো অনেক বেশি বরাদ্দের দাবি ছিল বিশেষজ্ঞদের নিকট থেকে।

এই বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ যা হলো ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। করোনাভাইরাস আমাদের অর্থনীতিকে যেভাবে আঘাত করেছে তাতে আগামীর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা আর খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষি খাতই সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। দেশ যদি কৃষি খাতে তার উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয় তবে আগামীর খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ কিছুটা হলেও মোকাবেলা করা সম্ভব। তাই এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি ছিল সংশ্লিষ্ট সকল মহলের । সরকার এবছর কৃষি খাতে ২ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ালেও তা আসলে চাহিদার চেয়ে অপ্রতুল। মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে কোভিড সময়কাল এবং কভিড পরবর্তী অর্থনীতির আর খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে যাবে বলেই মনে হয়।

এবারের বাজেটে যুব ও ক্রীড়া খাতে মোট বরাদ্দ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা যা বাজেটের মাত্র ০.২৬ শতাংশ। যুব কর্মসংস্থান তৈরি জন্য প্রশিক্ষণ এবং তাদের জন্য যে ঋণের বন্দোবস্ত তাও করা হবে এই বাজেট থেকে। আবার যুবকদের জন্য দেশব্যাপী ক্রীড়া সহায়তা তাও এই খাতের মধ্যে থেকেই খরচ করা হবে। তবে এর বড় একটা অংশ খরচ হবে আবার অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাই প্রশিক্ষণে বরাদ্দ কমানোও হয়েছে। এই অপ্রতুল বাজেটের মধ্যে দিয়ে তা কি করে সম্ভব হবে তাই এখন দেখার বিষয়। করোনাকালীন সময়ে প্রচুর যুবক তাদের কর্মসংস্থান হারাচ্ছে। প্রতিদিন বেকার হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষেরা। তাদের কর্মসংস্থান তৈরিতে এই বাজেট বরাদ্দ কি অপ্রতুল নয়? বিভিন্ন মহল থেকে বাজেটের ৫ শতাংশ যুব উন্নয়ন ‍ও কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দের দাবি ছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)’র সুপারিশ ছিল চারটি খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার। খাতগুলো হলো স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্ত বেষ্টনী আর কর্মসংস্থান। আগামীর অর্থনীতিতে এই খাতগুলোই কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই খাতগুলোই উপেক্ষিত হতে দেখা গেলো।

কোভিড ১৯ এর পূর্বেই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র হ্রাসের শ্লথগতি, আমদানি-রপ্তানি হ্রাস, ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রায় ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। আর করোনাভাইরাসের আক্রমণের ফলে এর মাত্রা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এসময়কালে এসে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর চাহিদায় এসেছে ব্যাপক ধরনের পরিবর্তন যার প্রভাব আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। বিআইডিএস বলছে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বেকার আর এর সাথে রয়েছে অর্ধ-শিক্ষিত বেকার এবং ছদ্মবেকারও। আবার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে বাংলাদেশে মোট বেকারের সংস্থা ৩ কোটি। বাংলাদেশ সরকারের বেকারের হিসাবের সাথে আইএলও এর হিসাবের ব্যাপক তারতম্য থাকলেও বিশেষজ্ঞগণ আইএলও এর হিসাবকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এই ব্যাপক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং কর্মসংস্থানের জন্য তাদেরকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে মাত্র ১ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকার বরাদ্দ কিভাবে ভূমিকা রাখবে আর এ বিষয়ে সরকারে পরিকল্পনা কি তাও কি সুস্পষ্ট এই বাজেট পরিকল্পনায়?

আমরা জানি আমাদের উন্নয়নের মূল চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসনের অভাব। দুর্নীতির করাল থাবা আমাদের আষ্টেপিষ্টে যেভাবে জড়িয়ে রয়েছে তাতে এই বাজেট পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে উঠে তাই দেখার বিষয়। আগামী দিনে এই বাজেটের মাধ্যমে কিভাবে সরকার করোনা মোকাবেলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কৃষি আর কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিভাবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে তা দেখতে হবে আমাদের। কিভাবে দুর্নীতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকার করোনাকালের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেই দিকেই দৃষ্টি থাকবে অর্থনীতিবিদসহ সচেতন মহলের।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

ও/এসএ/