তেল ও করোনা সঙ্কট মার্কিন ভূরাজনৈতিক পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে : আল-জাজিরা

Published: Mon, 15 Jun 2020 | Updated: Mon, 15 Jun 2020

হায়দার আলী খান, 
অর্থনীতির অধ্যাপক, জোসেফ কোরবেল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়।

অব্যাহত কোভিড-১৯ সঙ্কট বিভিন্নভাবে ভূরাজনীতিকে জটিল করে তুলেছে। তেল নিয়ে ভূরাজনীতি ঐ বিষয়গুলোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

তেলের ভয়ানক দরপতনে দুর্দশাগ্রস্ত বিশ্ব-অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনকে তীব্র করে তুলেছে। যারা রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেন এবং তহবিল দেন তারা দেশীয় মার্কিন এনার্জি কোম্পানিগুলোর সাথে একই কাতারবন্দী হয়েছেন যে সংস্থাগুলো হঠাৎ করে তেল ও গ্যাসের চাহিদা পড়ে যাওয়ার ফলে বড় ঝুঁকির মুখোমুখি রয়েছে। এই আকস্মিক বাজার মন্দা হোয়াইট পেট্রোলিয়ামকে দেউলিয়া হিসেবে নথিভুক্ত করতে বাধ্য করেছে এবং ইতোমধ্যে এমন সংবাদ রয়েছে যে চেসাপেক এনার্জিও এটি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরো অনেকে তাদের অনুসরণ করতে পারে।

এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনেকে শেল ডিপোজিটের ব্যয়বহুল হাড্রোলিক ফ্র‌্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে তেল উত্পাদন করে এবং ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ এর সঙ্কটের আগেই অনেক ঋণগ্রস্ত ছিল।

২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১৬টি শেল তেল কোম্পানি তাদের ব্যালান্সশিটের ঋণ নেওয়ার সক্ষমতার চেয়ে ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছিল। বর্তমানে, তাদের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন আগেই দেউলিয়ার মুখোমুখি। কোয়ার্টজ যেমন জানিয়েছে, ‘দেশের বৃহত্তম ১০০টি হাড্রলিক ফ্যাকচারিং অপারেশনের মধ্যে একটিও লাভের মুখ নাও দেখতে পারে’।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এই কোম্পানির মালিকরা নিজেদের বাঁচাতে ট্রাম্পের বর্ণবাদী "মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন" (এমএজিএ) ভিত্তিকে পরিপুষ্ট করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। আমেরিকান লেজিসলেটিভ এক্সচেঞ্জ কাউন্সিল (মূল ট্রাম্প সমর্থক কোচ পরিবার সমর্থিত) এবং মিশিগান ফ্রিডম ফান্ড (ট্রাম্প সমর্থক ডিভোস পরিবার সংশ্লিষ্ট) মার্কিন কংগ্রেসভবনের সামনে বন্দুকবাহী প্রতিবাদকে সমর্থন করেছে।

তারা স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অবিলম্বে পুনরায় সবকিছু খোলার দাবি করছে, যদিও হাজার হাজার মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকির মুখোমুখি হয়ে উঠছে এবং কোভিড -১৯-এ মৃতের সংখ্যা দেশব্যাপী ১ লাখের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

একদিকে স্বস্তিকা, নুসেস, এবং কনফেডারেটের পতাকাসহ ভারী অস্ত্র সজ্জিত সাদা বিক্ষোভকারীরা যখন বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে এই লড়াইয়ে অন্য ‘লিবারাল’ পক্ষও আমেরিকান নাগরিককে কোনো আশ্বাস বাণী শোনাচ্ছে না।

নব্য লিবারাল মূলধারার ডেমোক্র্যাটরা (যারা জন ডি রকফেলার এবং তাঁর স্ট্যান্ডার্ড তেলের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকারদের কাছে তাদের উৎস শনাক্ত করেছেন) বহুজাতিক তেল এবং পুঁজি কোম্পানিগুলোর আক্রমণের সামনের সাড়িতে রয়েছেন। তাদের দীর্ঘমেয়াদী মুনাফা রক্ষার জন্য তারা মহামারি লকডাউন থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার জন্য জন্য চাপ দিচ্ছেন।

তাদের অবস্থান সেরা চিকিত্সা বিজ্ঞানের দ্বারা সমর্থিত এবং এটিই ট্রাম্প এবং তাঁর সমর্থকদের আরো আতঙ্ক ছড়ানো এবং সত্য অস্বীকারের দিকে পরিচালিত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ লড়াই কোথায় চলছে?

যেহেতু এক্সনমোবিলের মতো  বড় বড় পকেটযুক্ত দৈত্যগুলো ছোট দেশীয় কোম্পানির তুলনায় দামের জন্য অপেক্ষা করাতে ভালোভাবে প্রস্তুত, তাই তারা তাদের ঘরোয়া প্রতিযোগিতা শুকিয়ে যাওয়ার এবং মরে যাওয়ার সময় অপেক্ষা করতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিউক্ল্যাসিকাল বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনো অযৌক্তিক সম্ভাবনা নয় যে, নব্য লিবারাল রাজনীতিবিদরা তাদের সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন এবং সম্ভবত রাশিয়ার সাথে বিস্তৃত আকারে সংঘাতে জড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সাবেক ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের মতো অনেকেই ঐ রাজনীতিবিদদের তালিকায় রয়েছে যারা নব্য কনজারভেটিভদের সাথে বিদেশনীতিতে একমত হয়েছিলেন। 

এভাবেই, তেলের দরপতন ইতোমধ্যে এই অস্থির ভূ-রাজনৈতিক জটিলতাকে আরো অস্থির করে তুলেছে। স্পষ্টতই, ঐতিহাসিক এই মহামারি চালিত জ্বালানি চাহিদা হ্রাস বর্তমান তেলের মূল্য সঙ্কটের মূলে রয়েছে। তবে ভাইরাসটিকেই কেবল দোষ দেয়া যায় না।

মার্চের গোড়ার দিকে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি তখনও ‘স্বাভাবিক’ গতিতে চলছিল, সৌদি আরব এবং রাশিয়া একটি মূল্য যুদ্ধ শুরু করেছিল যা কয়েক মিলিয়ন অতিরিক্ত ব্যারেল তেল দিয়ে বাজারকে প্লাবিত করেছিল। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, এক সময়ের নির্ভরযোগ্য মার্কিন অংশীদার সৌদি আরব ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন শেল তেল উৎপাদনকারীদের ব্যবসা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।

নিঃসন্দেহে, মার্কিন নেতৃত্বের মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হ্রাস (এমনকি সৌদি আরব এবং ইস্রায়েলের মতো তথাকথিত মিত্রদের সাথেও) ত্বরান্বিত হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং অযোগ্য ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে।

তবে আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সম্পর্কের পতনটি আসন্ন অধিকতর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার চিহ্ন হতে পারে। চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট  শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করার ফলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি স্বাভাবিকের চেয়ে আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠছে। প্রধান উপলব্ধ বিষয় হলো- যেটি বলা যেতে পারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার দ্বারা উপলব্ধ- মার্কিন আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই সঙ্কট থেকে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ার তেলের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে তার অর্থনীতির ক্ষেত্রে অন্য পথ দেখতে বাধ্য করেছিল যাতে (তেলের) কম দামের সাথে মোকাবিলা করার জন্য খুব ভালো আকারে রাখা যায়। এতে তেলের নিট আমদানিকারক চীন স্বল্প মূল্যের তেল ও গ্যাসের দাম থেকে পরিষ্কারভাবে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। তাছাড়া, জনগণের প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রটি অন্তত আংশিকভাবে- রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের একটি রূপে বিকশিত হয়েছে। সে কারণে চীন সরকার তার জাতীয় তেল কোম্পানিগুলোকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করে যা কৌশলগত গুরুত্ব হিসাবে বিবেচিত।

তেল নিয়ে সর্বশেষ দ্বন্দ্ব, করোনা মহামারির কারণে ঘটা স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সমন্বিতভাবে মার্কিন নেতৃত্বের অপ্রত্যাশিত আচরণের ফলে উদ্ভূত মার্কিন অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পতনকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।

চীনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, মার্কিন সেনাবাহিনীর কিছু বিভ্রান্তিকর, আক্রমণাত্মক আচরণ ইতিমধ্যে প্রদর্শিত হয়েছে। এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ চীন সাগরের একটি বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জ প্যারাসিল দ্বীপপুঞ্জের নিকটে অবতরণ করার জন্য গাইডেড-মিসাইল ধ্বংসকারী ইউএসএস ব্যারি প্রেরণ করেছিল। এর খুব অল্প সময় পরেই, মার্কিন বাহিনী একটি উস্কানিমূলক শক্তিপ্রদর্শনীতে দক্ষিণ চীন সাগরের উপরে দুটি বোমারু বিমান বি -১বি  উড়িয়েছিল।

আমি অদূর ভবিষ্যতে বড় সংঘাতের পূর্বাভাস দিচ্ছি না। ইরান ও তার আরব প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্র বিন্দু হরমুজ প্রণালীসহ অন্য যেকোনো উত্তেজনাকর অঞ্চল হোক না কেন, তা আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বিরোধ, পরিবর্তনময় জোটবদ্ধতা এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বিন্যাসের ভিত্তিতে বলা যায়, সহিংস আঞ্চলিক লড়াইয়ের ঝুঁকি খুব সম্ভবত বৃদ্ধি পাবে।

(এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থানটি অগত্যা প্রতিফলিত করে না।)

আলজাজিরা ডট কম থেকে অনুবাদকৃত। -ওয়ালী উল্লাহ

ও/ডব্লিউইউ