আমাদের শিশু অনলাইন ব্যবস্থায় শিক্ষা অর্জনে কতখানি প্রস্তুত?

Published: Sun, 06 Sep 2020 | Updated: Sun, 06 Sep 2020

মো. আশরাফুল আলম, গাইবান্ধা (বিশেষ সংবাদদাতা) : করোনা মহামারির কারনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের পছন্দ মত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজন অনুভব করলেও এখনও তৈরী হয়নি সার্বজনিন কোন নীতিমালা। যে যার মতো করে চেষ্টা করে যাচ্ছে পাঠদানের। 

ফলে কেউ কেউ অংশগ্রহণ করলেও শিক্ষা অর্জনের বাহিরে রয়ে যাচ্ছে শিশুদের একটি অংশ। ফলে শিশু শিক্ষার্থীর একটি অংশ দুর্বল মেধাবী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে। প্রয়োজন শিশুরে উপযুক্ত মাধ্যম আর দক্ষ উপস্থাপক সাথে সহজলভ্য ডিভাইস।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বলা যায় আগামী দিনের রাজনীতি,অর্থনীতি, সমাজনীতি, বৈদেশিকনীতি সহ নানামূখী উন্নয়নের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। দেশকে নিয়ে যাবে উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায়। বিশ্বের সাথে তাল যোগাতে ভূমিকা রাখবে অনন্য। 

কিন্ত সেই শিশুরা আজ প্রকৃতির নির্মম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন ক্ষেত্রে একরকম চ্যালেঞ্জের মুখে। পাঠশালায় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা অর্জন শিশুরে অন্যতম মাধ্যম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুখরিত পরিবেশে আর আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষকদের রম্যরসের গল্পের মাধ্যমে শিখতে পছন্দ করে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে আবার কেউ কেউ আগামী দিনে চিন্তা করছে। ইতিমধ্যে অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো পরিকল্পনা করে নিজ নিজ পছন্দমতো সামাজিক মিডিয়া মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

যেহেতু করোনা দীর্ঘকালীন মেয়াদে অবস্থান করতে পারে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে তাই শিক্ষা অব্যাহত রাখতে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি সমর্থনযোগ্য। কিন্তু এর একটি নিদ্দিষ্ট নীতিমালা এখনও তৈরী সম্ভব হয়নি। কবে হবে এটিও অজানা। 

এমতবস্থায় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে কি ঘটতে যাচ্ছে তাও আমাদের ভাবতে হবে। সবার জন্য একটি সার্বজনীন পরিকল্পনা থাকলে সেটা সকলের জন্যই মঙ্গল। করোনার কারনে শিশুদের যে ক্ষতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে তা আমরা হয়তো আজ বুঝতে পারছি না তবে এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদী এবং মারাত্নক। 

অন্যদিকে দেশের কোথাও কোথাও দীর্ঘ মেয়াদী বন্যায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপকরণ আসবাপত্র এবং স্কুলে গমনের রাস্তা অথবা মাঠের মাটি সড়ে গিয়ে বেশ খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় আগামী দিনে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবারও আশংকা দেখা দিয়েছে। ফলে শহর ও গ্রামীণ পর্যায়ের অভিভাবকগণ শিশুর শিক্ষা অর্জনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্নের মধ্যে রয়েছেন।  

ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে  কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে অথবা শ্রেণী কক্ষের নামে ফেইসবুক আইডি খুলে পাঠ আলোচনা ভিডিও আপলোড করে শিশুদের শিক্ষা দেবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একটি বিষয় ভাবনার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে যে, কিছু কিছু শিশু এবং তাদের অভিভাবক এখন পর্যন্ত এই অনলাইন বিষয়টি সম্পর্কে এখনও খুব বেশি ওয়াকিবহাল নয়। 

অনেক শিশুই এই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে ইচ্ছে পোষন করেন না অথবা বুঝেন না তাদের অবস্থা কি? বিকল্প কি ভাবা হয়েছে? যদি না হয় তবে তাদের ভবিষ্যৎ কি হবে প্রতিষ্ঠান সমূহ ভাবছেন কিনা জানা নেই। যদি তাদের জন্য বিকল্প ভাবনার খোরাক যোগানো না যায় তবে  অনলাইন শিক্ষার্থীদের সাথে সমতালে চলতে পারবে কিনা সন্দেহ। ফলে মেধাতেও দুর্বল হবার সম্ভাবনাও অনেক।

শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির আশা আকংখার বাস্তবায়ন এবং একটি  নতুন সমাজ গড়ে তোলার হাতিয়ার। তাই আজ সময় এসেছে প্রকৃতির নির্মম আচরনের সাথে যুদ্ধ করে খাপ খাওয়ানোর মতো করে ব্যবস্থাপনায় সকলকে এক কাতারে নিয়ে আসা। রাষ্ট্রীয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে এই উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে সকলকে। 

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফেইস বুক পেজ এ দেখা যায় শিক্ষকরা বিষয় ভিত্তিক বক্তব্য প্রদান করছেন। তবে সকলে এ বিষয়ে যেহেতু অভ্যস্থ নন তাই অনেক শিক্ষকের রয়েছে  উপস্থাপনায় ঘাটতি। আর উপস্থাপনায় ঘাটতি হলে শিক্ষার্থীর মনোযোগ কতটা ফলদায়ক হবে সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায়।

আমাদের কচি কাঁচা শিক্ষার্থীরা যদিও এর আগে এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি । তাই এই অনলাইন শিক্ষা সম্পর্কে তাদের ধারনাও ছিলনা। কথা হয় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক বল্লেন- হঠাৎ করে অনলাইন শিক্ষার সাথে শিশু শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারছেন না, আর কোন কোন শিক্ষকগণও খুব বেশি বোঝানোর চেষ্টা করেন না, সময় সংক্ষিপ্ততাও একটি বিষয়, ফলে শিক্ষার্থীদের দুর্বল শিক্ষা অর্জনের পথের দিকে নেমে যাচ্ছে। 

অনেক শিক্ষার্থীর বাবা মার হাতে উপযুক্ত ডিভাইস নেই, আবার অনেকের থাকলেও পরিচালনায় অভ্যাস নেই, আবার অনেকে সময় নিয়ে বসে থেকে তা করতে অনিহা অথবা কাজের চাপে প্রতিষ্ঠানের দেয়া সময়কে নিজেদের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন না। তাই শিক্ষার্থীর  উপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়ে যায়। এই ব্যবস্থাপনা শক্তিশালি করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আরও বেশি সহজীকরণ এবং উপযুক্ত ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

অনলাইন শিক্ষার ধারনার সম্পর্কে অনেকের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরনা রয়েছে। কেউ কেউ ভিডিও আপলোড দিয়ে রাখেন শিশুরা সময় মতো দেখবেন আবার কেউ কেউ তাদের পছন্দ অনুযায়ী নিদ্দিষ্ট সময়ে ক্লাশ নিয়ে থাকেন। আর এই মিশ্র পদ্ধতির কারনে শিক্ষার্থী তাদের মনের মধ্যে উদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না পাওয়া অথবা প্রশ্ন করবার সুযোগ থাকে না।

আবার যাদের প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই তাদের শিক্ষা অর্জনের যে প্রয়াশ তা নিম্নগামী হবে এবং ভবিষ্যতে ছিটকে পড়তে পারে শিক্ষা থেকে। 

কথা হলো ছোট সোনা মনি শ্রবন্তী মীম এর সাথে। কথা প্রসঙ্গে তাকে বলা হলো- তুমি স্কুলে যেতে না পেরে কিভাবে পড়া লেখা চালিয়ে যাচ্ছো। সে উত্তর দিল- আব্বু আম্মু অফিসে গেলে আমি ও আমার মামা মোবাইলে গেম খেলি। টিচার আসলে পড়ি। টিচার আসেন সন্ধাকালীন সময়ে অথব তখন শিশু ক্লান্ত হয়ে ঘুমের ঘোরে থাকে অথবা খেয়ে ঘুমোতে যাবার পায়তারা করে। 

এখানে লক্ষ্যনীয় যে অনেক পরিবারেই বাবা মা দুজনেই পেশাগত কারনে দিনের বেশিরভাগ সময়েই ঘরের বাহিরে থাকেন। যদি একটি ডিভাইস দিয়ে দেয়া হয় আর তাদের অনুপস্থিতি থাকে তবে শিক্ষা অর্জনের জায়গাতে ডিভাইসটি অন্য ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকে। এই অবস্থায় সে কতটুকু শিক্ষা অর্জন করবে আমাদের ভাবতে হবে। 

আব্দুল লতিফ মিয়া পেশায় বেসরকারি চাকুরিজীবি। জেলা শহরেই বাস করেন। ছেলে মেয়েকে ভাল স্কুলে লেখা পাড়া করতেই গ্রাম থেকে শহরে পারি জমিয়েছেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারনে সেই শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই। 

দুটি সন্তান দুজনেই একটি বেসরকারি স্কুলে পড়ে। তারা দুজনেই পেশাগত কারনে দিনের বেলায় বাড়িতে থাকেন না। যখন স্কুল খোলা ছিল তখন স্কুলে দিয়ে এসে নিশ্চিন্তে থাকতেন । বর্তমানে তাদের শিক্ষা অর্জনের বিষয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। কি হবে আগামী দিনে।   

আমরা জানি যে, জ্ঞানদানকারী এবং জ্ঞান আহরণকারীর মাধ্যকার সম্পর্ক সামনা সামনি হলে ভাল।  শিক্ষা অর্জনের অন্যতম বিষয় হলো পরিবেশ,পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষার পদ্ধতি। 

করোনা মহামারি অবস্থান যদি অনিশ্চিত হয় তবে আমাদেরকে বিকল্প পন্থায় সার্বজনীন পদ্ধতির পথ খুজতে হবে এখুনি। নইলে আমাদের ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের অন্যতম জনশক্তি বিশ্বের কাছে হেরে যাবার সম্ভাবনা  থেকে যাবে। 

আইআর /